কারাগারে গিয়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে ওরা

ctg jailচট্টগ্রাম: ১৬ বছরের তরুণ ইলিয়াছ খান (ছদ্মনাম)। গত ২২ মে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়েরকৃত একটি মামলায় গ্রেফতার হন এই তরুণ। তার ঠাঁই হয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। এরপর ২ জুন ইলিয়াছ জামিনে মুক্তি পান। তার দাবি, কারাগারে ১১ দিন বন্দি থাকাকালীন সময়ে সে ইয়াবা ও গাঁজা সেবন করতে শিখেছে। মাদকের পেছনে তার ব্যয় হয়েছে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা। মামলার নির্ধারিত দিন বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজিরা দিতে আসেন ইলিয়াছ। আদালতপাড়ায় বসে নিজের মাদকসেবী হয়ে উঠার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন এই তরুণ।

তার তথ্য মতে, কারাগারে যাওয়া সচ্ছল পরিবারের তরুণ-যুবকদের টার্গেট করে প্রলোভনে ফেলে মাদকাসক্ত বানিয়ে ফেলছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। কারাগারের প্রতিটি ওয়ার্ডেই চলছে মাদক বেচাকেনা। অভিযোগ উঠেছে, মাদক বেচাকেনা নির্বিঘœ রাখার জন্য কারা কর্মকর্তাদেরকেও ম্যানেজ করে ফেলা হয়েছে; ফলে তারা সবকিছু দেখা ও জানার পরও নিশ্চুপ থাকছেন।

চট্টগ্রাম নগরের বন্দর থানায় শিশু আইনে দায়েরকৃত একটি মামলার আসামি ইলিয়াছের বাবা সরকারি স্বায়ত্বশাসিত একটি প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নগরের বন্দর এলাকায় পরিবারের সাথে বসবাস করেন ইলিয়াছ।

তিনি বলেন, ‘কারাগারে নেওয়ার পর কারা হাসপাতালে ভর্তি হই। এরপর থেকেই হাসপাতালে থাকা দিদার নামের এক ব্যক্তি, আমাকে ইয়াবার প্রতি আসক্ত করার চেষ্টা করতে থাকেন। দিদার ভাই বলতেন, ইয়াবা খেলে আনন্দ লাগে, টেনশনমুক্ত থাকা যায়। সময় ভালো কাটবে।’

কারাগারে যাওয়ার তৃতীয় দিনের মাথায় ইয়াবার স্বাদ নেন ইলিয়াছ। বলেন, ‘দিদার ভাই আমাকে নিয়ে যান যমুনা ভবনের ৩য় তলায়। ওই তলায় একটি দোকান আছে; তার পাশের সিটের নিচে ইয়াবা ও গাঁজা থাকে। সেখান থেকে ফ্রি-তে এক পিস ইয়াবা নিয়ে চলে যাই একই তলার ডান পাশের বাথরুমের উপরে সানশেডে; এটার উপর বসে ইয়াবা সেবন করেছিলাম। সেদিন আমার পাশে আরো দুইজন ছিল; তারাও প্রথমবারের মত ইয়াবা সেবন করতে অন্য ওয়ার্ড থেকে এসেছিল।’

প্রথমবার ইয়াবা সেবন করার পরদিন ফের সেবনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল ইলিয়াছ। এরপর কারা হাসপাতালে থাকা দিদার, তাকে নিয়ে যায় যমুনা ওয়ার্ডের ৩য় তলার এক ব্যক্তির কাছে। ওইদিনের ঘটনার বর্ননা দিয়ে ইলিয়াছ বলেন, ‘যমুনা ওয়ার্ডের ৩য় তলায় খাটো করে দাঁড়িওয়ালা এক লোকের কাছে আমাকে নিয়ে যায় দিদার। কিন্তু তখন আমার কাছে নগদ টাকা না থাকায়, ইয়াবা দেবেন না বলে জানান তিনি। পরে আমার পিসি কার্ড (কারাগারে টাকা লেনদেনের ব্যক্তিগত হিসাব) জমা দেওয়ার শর্তে তিনি ইয়াবা দেন।’

কারাগারে ১১ দিন থাকাকালীন ইয়াবা ও গাঁজার পেছনে ১২ হাজার টাকার বেশী খরচ করেছেন বলেও জানান ইলিয়াছ। তিনি বলেন, পিসি কার্ডে এক হাজার টাকা থাকলে তারা ৯শ টাকা হিসেব করতো; আর বাইরে থেকে কারারক্ষির মাধ্যমে এক হাজার দিলে, ভেতরে ৮শ টাকা পেতাম আমি। পিসি কার্ডের ৩ হাজার টাকা আর নগদ ৯ হাজার টাকার বেশী খরচ করেছিলাম মাদকের জন্য। প্রতি পিস ইয়াবার জন্য ১৫০, ২০০, ৩০০ টাকা নিয়েছে; একেক সময় একেক দাম। এক পুঁটলি গাঁজা কোন সময় ৫০, কখনো ১০০, আবার কখনো ২৫০ টাকাও নিয়েছে। আব্বু-আম্মু দেখতে আসলে তাদেরকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কেঁদে কেঁদে বলতাম, কয়েদিদের জন্য টাকা দিতে হবে; নয়তো তারা মারবে। এতে আমার চাহিদামত কারাগারে টাকা সরবরাহ করতো আব্বু।’

এদিকে গত ২ জুন জামিনে মুক্ত হন ইলিয়াছ। এরপর ফের খুঁজতে থাকেন মরণনেশা ইয়াবা। সেসময়ের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইয়াবা ছাড়া আমি থাকতে পারছিলাম না। বন্ধুদের সাথে বিষয়টা শেয়ার করি; একজন বললো ছোটপুলের ওইখানে ইয়াবা পাওয়া যাবে। কারাগার থেকে মুক্তির ৬ দিন পর ছোটপুল থেকে ইয়াবা কিনে সেবন করেছি। এরপর আরো কয়েকবার ইয়াবা সেবন করি। অকারণে বারবার টাকা চাওয়ায় ও আমার আচরণ দেখে আব্বু বিষয়টি বুঝে যায়।’

ইয়াবা সেবনে পরিবারের বাধা ও টাকা না পাওয়ায় পরে নিজের হাতে নিজে আঘাত করে চামড়া ছিঁড়ে ফেলে ইলিয়াছ। শুকিয়ে উঠা এসব ক্ষতস্থান দেখিয়ে ইলিয়াছ বলেন, ‘একপর্যায়ে মেহেদীবাগ এলাকার বেসরকারী মাদকনিরাময় কেন্দ্র ‘দীপ্তি’তে নিয়ে যাওয়া হয় আমাকে। সেখানে দুই মাস চিকিৎসা চলে। প্রাতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে দুই মাসে ৩০ হাজার দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি বাবদ দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। এখন আমি বুঝতে পারছি, আমি বড় ভুল করেছিলাম। ভুল শুধরে এখন অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি আমি।’

কারাগারে গিয়ে তরুণদের মাদকাসক্ত হয়ে উঠা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির বলেন, ‘মাদক বেচা-বিক্রি কেউ করে থাকলে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। কারাগারে এসে মাদক সেবন শুরু করা ওই ছেলে ও তার বাবাকে নিয়ে আপনি (প্রতিবেদক) আমার অফিসে আসুন। দোষীদের সনাক্ত করে সবার বিরুদ্ধেই আমি ব্যবস্থা নেব। কাউকেই ছাড়বো না।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কারাগারে থাকা অনেকেই আমাকে জানিয়েছে, সেখানে টাকা দিলেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টা খুব দুঃখজনক। কারা কর্মকর্তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে এ অবস্থার সৃষ্টি হত না।
*** চট্টগ্রাম কারাগারে মাদক ব্যবসার মূলে হামকা নুর আলম!
*** চট্টগ্রাম কারাগারে চলছে বন্দি বেচা-কেনার ‘নিষ্ঠুর’ বাণিজ্য!
*** ‘জামিনআদেশ’ ঘিরে চট্টগ্রাম কারাগারে প্রকাশ্যে ঘুষবাণিজ্য