চট্টগ্রাম: পুলিশের প্রতি নানা নির্দেশনা দিয়েছেন চট্টগ্রামের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মোঃ মশিয়ার রহমান ও তার অধীনে থাকা অন্য ম্যাজিস্ট্রেটরা। শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সম্মেলনকক্ষে এ বৈঠক হয়েছে।
চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মোঃ মশিয়ার রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে অন্য ম্যাজিস্ট্রেটরাও উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নূরেআলম মিনার নেতৃত্বে জেলার সব থানার ওসিরা এ বৈঠকে অংশ নেন।
এছাড়া সিভিল সার্জন ডাঃ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুর রশিদ, র্যাব-৭ ও পুলিশ সুপার রেলওয়ে-এর প্রতিনিধি, চমেক হাসপাতালের পরিচালকের প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারি এবং জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন পুরাতন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তকার্য সম্পন্ন করতে তাগিদ দেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
ত্রুটিমুক্ত প্রতিবেদন দাখিল, যথাসময়ে মামলার সাক্ষী উপস্থাপন, গ্রেফতারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক হতে বলেন তিনি।
বিচার সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান সম্পর্কে বৈঠকে আলোকপাত করা হয়।
বৈঠকে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আদালতে দাখিলী নালিশী আবেদন প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে উক্ত নালিশী আবেদন এফআইআর হিসেবে গণ্য করার জন্য বলা হয়। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা থাকার পরও তিনি পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপোষ কিংবা সাক্ষ্য প্রমাণের অভাব দেখিয়ে এফআইআর হিসেবে গণ্য করা সম্ভব হলো না- মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
সংশ্লিষ্ট থানার ওসির এরূপ কাজ আইন বর্হিভূত বলে উল্লেখ করে তা পুরোপুরি পরিহারের কড়া নির্দেশ দেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মোঃ মশিয়ার রহমান।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সিআর আমলী ফাইলে পুলিশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করেন না। ফলে দেখা যায় যে, কোন নির্দিষ্ট সিআর মামলা আমলী ফাইলে খারিজের পরে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এটা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত এবং অনভিপ্রেত।
আদালত কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিআর মামলায় প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উপস্থিত থানার ওসিদের নির্দেশ দেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইতোপূর্বে বহুবার নির্দেশনা দেওয়া সত্বেও এখনও তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ পুলিশ প্রতিবেদনের সাথে নির্ধারিত ফরমে এজাহারকারীকে নোটিশ প্রদান করতঃ তা আদালতে দাখিল করেন না। পুলিশ প্রতিবেদনে এখনও কোন আসামি কি অপরাধ করেছেন আইনের ধারাসহ তা আলাদাভাবে উল্লেখ না করে গতানুগতিক পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, মাদক মামলাগুলোতে চার্জশীটে আলামত হিসেবে প্রাপ্ত মালামালের কলামে মাদকের সঠিক পরিমাণ অর্ন্তভূক্ত করা হচ্ছে না। চার্জশীটে মাদকের পরিমাণ উল্লেখ করার নির্দেশ দেন এই বিচারক।
সিআরপিসি এর ৫৪ ধারায় কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্টদেরকে তাগিদ দেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মোঃ মশিয়ার রহমান।
বিচারিক কাজের জন্য চাওয়া ডাক্তারি সনদসমূহ অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সভায় উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। সভায় ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ বলেন, অনেক সময় দেখা যায় এফআইআর ফরমে উল্লেখিত ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান এবং আসামির নামের সাথে এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান এবং আসামির নামের মিল পাওয়া যায় না। গাড়ি দূর্ঘটনা মামলায় গাড়ির মালিকের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলেও অভিযুক্ত চালকের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
তারা আরো বলেন, কিছু কিছু মামলায় আসামির রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করে পুনরায় রিমান্ড প্রার্থনা করা হয়। অস্ত্র মামলায় রিমান্ডে নেওয়া আসামির দেখানো মতে অস্ত্র উদ্ধারের পর নতুন করে অস্ত্র মামলা রুজু করা হচ্ছে।
এতে অহেতুক মামলার আধিক্য ঘটছে উল্লেখ করে তা পরিহারের জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের প্রতি আহ্বান জানান ম্যাজিস্ট্রেটরা।
সভায় ম্যাজিস্ট্রেটরা বলেন, অনেক চার্জশিটে সাক্ষীদের ত্রুটিযুক্ত নাম-ঠিকানা পরিলক্ষিত হয় এবং এতে উক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণকালে জটিলতার সৃষ্টি হয়; যার সুবিধা আসামিপক্ষ পেয়ে থাকেন। শুধু আসামির পিতার নাম উল্লেখ না থাকার কারণে অনেক পুলিশ রিপোর্টে তাকে Not Sent Up করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাকে এসব বিষয়ে অধিকতর যত্মবান হওয়ার জন্য এবং ঠুনকো অজুহাতে আসামিকে Not Sent Up করা থেকে বিরত থাকার জন্য সভায় পরামর্শ দেওয়া হয়।
সভায় ম্যাজিস্ট্রেরা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরকে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হওয়ার জন্য পরামর্শ দেন।
তারা উল্লেখ করেন যে, অনেকক্ষেত্রে পুলিশ মামলার জব্দকৃত আলামত নিজেরাই জিম্মায় দিয়ে দিচ্ছেন। এ বিষয়টি আইন বহির্ভূত বিধায় তা হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। আসামীকে গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপনের যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে, তা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয় উক্ত সভায়।
