বাসে চবি ছাত্রীকে যৌন হয়রানি: হেলপারকে দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি


চবি প্রতিনিধি: চলন্ত বাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করার ঘটনায় জড়িত হেলপারকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে এ দাবি এসেছে। এ সময় তারা ছয় দফা দাবি পেশ করেন।

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী বলেন, সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে বড় ধরনের দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছে আমাদের ছাত্রীটি। সে যদি মোবাইল দিয়ে হেলপারকে আঘাত করে পালিয়ে না যেতো তাহলে এই ঘটনা আরও বড় হতে পারতো।

তিনি বলেন, আজকে এই ইস্যুতে সবাই যেভাবে প্রতিবাদ ও জেগে উঠেছে সেভাবে প্রত্যেককে যে কোন অপরাধ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। কারও সঙ্গে এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটলে তা না লুকিয়ে প্রশাসনকে অবগত করতে হবে। এ বিষয়ে সবাই প্রতিবাদ করায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা বিআরটিসিকে বলেছি ছাত্রীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করতে এবং হাটহাজারী রুটে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বাত্বক চেষ্টা করছে লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে।

অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর আলাউদ্দীন মজুমদার বলেন, বাসে শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পুলিশ ও প্রশাসন যেভাবে বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে এসেছে ঠিক সেভাবে এ ঘটনায় জড়িত বাকিদের দ্রুত গ্রেফতার ও তাদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি আমরা।

তিনি বলেন, আমরা এ ঘটনা থেকে তিনটি শিক্ষা পেয়েছি। প্রথমত একজন নারীকে সাহসী হতে হয়। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় একজন নারী বা শিক্ষার্থী যদি সাহস প্রদর্শন করে তবে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত আমরা দেখিয়েছি কোন সহিংসতা ছাড়াই সমস্যা সমাধান কিংবা দাবি আদায় সম্ভব।

তিনি বলেন, চলন্ত বাসে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটার পর অনেকে চেয়েছিলো অবরোধ কিংবা গাড়ি ভাংচুর করতে। কিন্তু আমরা তা না করে আইনি প্রক্রিয়ায় এর সমাধানের চেষ্টা করেছি। এবং আমরা সে পথে যথেষ্ট সফল হয়েছি। তৃতীয়ত আমাদের প্রত্যেককে নিজেদের অসহায় ভাবা উচিত না। আমরা কেউ একা বা অসহায় না। আমাদের চারপাশে অনেকেই আছে আমাদের সাথে। তাই যেকোন অপরাধ বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

মানববন্ধনে অন্যান্য বক্তারা বলেন, যেভাবে গাড়ির চালককে গ্রেফতার করা হয়েছে আমরা চাই ঠিক সেভাবে হেলপারকেও অতি তাড়াতাড়ি গ্রেপ্তার করা হবে। এবং জড়িত সবাইকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। যাতে আর কেউ এমন অপরাধের চিন্তাও না করতে পারে।

তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত চালক ও হেলপারসহ বাসের ড্রাইভার-হেলপারদের কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা উচিত। যাতে তারা যৌন নির্যাতনের মনমানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, সকল ড্রাইভার-হেলপারদের নিজস্ব ড্রেসআপের ব্যবস্থা করা উচিত। যদি তাদের ড্রেসআপের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তারা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে কিছুটা সচেতন হতে পারে।

এ সময় মানবন্ধনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য আলাদা বাস, শাটল ট্রেনের বগি বৃদ্ধি ও ৩ নং রুটে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির ও দাবি জানান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরের স্টেশন রোড এলাকায় বাসের হেলপার ও চালকের ‘যৌন হয়রানি’ থেকে বাঁচতে চলন্ত বাস থেকে লাফ দেন বলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেলে নগরের কোতোয়ালী থানায় নারী ও শিশুনির্যাতন আইনে ওই ছাত্রী নিজে বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

এর আগে শুক্রবার দুপুরে ‘লাফ দিয়ে বাস-সহকারির যৌন হয়রানি থেকে বাঁচলেন চবি ছাত্রী’ শিরোনামে একুশে পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন স্বউদ্যোগে একুশে পত্রিকার সহযোগিতায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ওসি মহসীন ভুক্তভোগী ছাত্রীর শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অপরাধীদের গ্রেফতার ও শাস্তির আশ্বাস দিলে ভুক্তভোগী ছাত্রীটি তার বাবা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে কোতোয়ালী থানায় হাজির হন। এবং পুলিশের সহযোগিতায় অজ্ঞাত বাসটির হেলপার ও চালককে আসামি করে মামলা করেন।

প্রসঙ্গত, চবির অর্থনীতি প্রথম বর্ষের ওই ছাত্রী বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে ক্লাস শেষ করে আনুমানিক ৩ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ১ নং গেইট হতে ৩ নং বাসে ওঠেন। বাসটি নগরের রিয়াজুদ্দিন বাজার এলাকায় পৌঁছালে ভুক্তভোগী ছাড়া সকল যাত্রী একে একে নেমে গেলে তিনি একা হয়ে যান। এসময় হঠাৎই বাসটি তার রুট পাল্টে স্টেশন রোডের দিকে চলতে শুরু করে।

তখন ভুক্তভোগী মেয়েটি নিরাপত্তার স্বার্থে বাস ড্রাইভারকে বাস থামাতে বললে হঠাৎই বাসের হেলপার তার দিকে ধেয়ে যায় এবং তার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে। সেসময় দম বন্ধ হয়ে আসলে মেয়েটি আত্মরক্ষার্থে তার হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে হেলপারটিকে আঘাত করে চলন্ত বাস থেকেই লাফ দেয়। পরে এক রিক্সাওয়ালার সহযোগিতায় শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে বাসায় ফিরেন। ঘটনার সময় বাসের ড্রাইভারটিও ‘মেয়েটাকে ধর ধর’ বলে হেলপারকে উৎসাহ জোগায়।

মামলা দায়েরের পর শুক্রবার রাতেই পুলিশ বাসটিকে জব্দ করে এবং চালক বিপ্লব দেবনাথকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে শনিবার চালকের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে চট্টগ্রামের একটি আদালত।