চট্টগ্রাম কারা মেডিকেল অপরাধীদের বিলাসী ঠিকানা

ctg jailমামুনুল হক চৌধুরী : টাকা দিলে সুস্থ বন্দিও ভর্তি হতে পারছেন চট্টগ্রাম কারাগারের মেডিকেল ওয়ার্ডে। আর টাকা না দিলে অসুস্থ বন্দি রোগীও আশ্রয় পান না মেডিকেল ওয়ার্ডে। এর প্রেক্ষিতে কারাগার সংশ্লিষ্টরা বলে থাকেন; ‘টাকা দিলে মেডিকেল মিলে’!

সংশ্লিষ্টরা বলছেন- ‘টাকা বাতাসে উড়ে’; উক্তিটির যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যাবে চট্টগ্রাম কারাগারে। কারাভ্যন্তরের ‘মেডিকেল ওয়ার্ড’কে ঘিরে চলছে হরেক রকমের অনিয়ম-দুর্নীতি! কারাগারের মেডিকেল ওয়ার্ডের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা ব্যবহার করে ‘টাকা কামানোর’ মহোৎসবে মেতে উঠেছে অসাধু কারা কর্মকর্তারা। আধুনিক যুগে মধ্যযুগীয় বর্বরতার দেখা মিলতে পারে চট্টগ্রাম কারাগারে।

অভিযোগ রয়েছে- মেডিকেল ওয়ার্ডকে ঘিরে অমানবিক, নিষ্ঠুর ও মানবতাবিরোধী উপায়ে বন্দিদের কাছ থেকে টাকা আদায় চলছে।

কারাগারের ‘মেডিকেল ওয়ার্ড’ অপরাধীদের বিলাসী জীবনযাপনের বিশেষ স্থান হয়ে উঠেছে। সুস্থ হয়েও ‘টাকার বিনিময়ে’ মেডিকেলের বেড বিছানার বিশেষ সুবিধায় থাকছেন অপরাধী বন্দিরা। অন্যদিকে টাকা ছাড়া মেডিকেল ওয়ার্ডে থাকতে পারেন না গুরুতর অসুস্থ বন্দিও।

অভিযোগ উঠেছে, ‘মেডিকেলের বেড বিছানার বিশেষ সুবিধা’ অপরাধীদের কাছে ইজারা দিয়ে মাসে কয়েক লাখ টাকা পকেটে ভরছে কারাগারের অসাধু কর্মকর্তারা। দাগী ও প্রভাবশালী কারাবন্দিরা কারাগারের ভেতর মেডিক্যাল ওয়ার্ডে থেকে আয়েশী বন্দি জীবন পার করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারাগারের মেডিকেল ওয়ার্ডে ভর্তির সময় এককালীন সর্বনিম্ম ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। সাপ্তাহিক খাবার বাবদ দিতে হয় ১ হাজার টাকা। প্রতিটি বেডের মাসিক সর্বনিম্ন চার্জ তিন হাজার টাকা।

সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হওয়া একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, মেডিকেলের প্রতিটি কক্ষে ৬টি বেডে ১২জন থাকেন। নিচে থাকেন ৪ জন। ২০টি রুমের প্রতিটিতে ৬টি করে বেডে ১২০টি বেড আছে। তবে মানসিক ওয়ার্ড নামে পরিচিত ৭ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে ২টি কক্ষ। এ দুই কক্ষে সর্বমোট ৩২জন থাকেন বিছানা পেতে।

তবে কয়েকটি ভিআইপি ওয়ার্ডে ভর্তির জন্য এককালীন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেয়া হয়। সাপ্তাহে নেয়া হয় দেড় হাজার টাকা। মাসিক বেড চার্জ ৫ হাজার টাকা। মেডিকেল ১৯ ওয়ার্ড ভিআইপি ওয়ার্ড হিসেবে পরিচিত। ওই ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ করে ভোলা, বিপ্লব ও বাবু।

জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে যেদিন যান- সেদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রতিটি রুমে ৬টি বেডে ৬ জন প্রকৃত রোগীকে রাখা হয়। দেওয়া হয় উন্নত বিছানা ও ছাদর।

বেড-বিছানা-ফ্লোর ‘ইজারা’ বানিজ্য!
অনুসন্ধানে জানা গেছে- কারাগারের অভ্যন্তরের মেডিকেল ওয়ার্ডের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা ‘ইজারা’ দিয়ে বৎসরে কোটি টাকার অবৈধ আয় করে অসাধু কারা কর্মকর্তারা।

বন্দি রোগীর ওষুধ, ডায়েট চুরি!
কারাগারের ‘মেডিকেল’ কারা কর্তৃপক্ষের জন্য বিশাল একটি লুটপাট খাত। বছরে মেডিক্যাল ভর্তি রোগী, তাদের ওষুধ, খাবারসহ ব্যবস্থাপনা খাতে একটি বিশাল সরকারি বরাদ্দ থাকে। ষোল আনা তা ব্যয়ও দেখায় কারাগার কর্তৃপক্ষ।

অথচ কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা কোন রোগীর জন্যও তারা একটি দুই টাকার প্যারাসিটেমল জাতীয় ওষুধ পর্যন্ত দেয় না। বন্দী রোগীর সব ওষুধ তাদের স্বজনদের মাধ্যমে বাইরে থেকে আনিয়ে নেয়। রোগীর জন্য বরাদ্দ সরকারি ডায়েট অনুযায়ী খাবার ডিম, কলা, দুধ, রুটি ইত্যাদি কোনো বন্দি অসুস্থ রোগী পেয়েছিল এমন নজির নেই বললেই চলে। সবটাই চলে লুটপাট।

মেডিকেলকে কেন্দ্র করে সরকারি সব বরাদ্দ কারা কর্তৃপক্ষ পুরোটাই লুটপাট করে। আবার সেই মেডিকেলের বেড বিছানা, এমনকি ফ্লোরও ইজারা দিয়ে বৎসরে কয়েক কোটি টাকা পকেটে নেয় তারা। এই ‘ইজারা’ দিয়ে তারা ওই মেডিকেল সংক্রান্তে সরকারি বরাদ্দের কয়েকগুন টাকা আয় করে কারা কর্তৃপক্ষ।

‘মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্য’
বিভিন্ন সময়ে আদালত কারাবন্দির সুস্থতা ও অসুস্থতা সম্পর্কে প্রতিবেদন তলব করে। ওই প্রতিবেদন মেডিকেল সার্টিফিকেট হিসেবে পরিচিত। কারা কর্তৃপক্ষকে দাবি মতো টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে পারলে চাহিদা মতো ওই মেডিকেল সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। ম্যানেজ করতে পারলে সুস্থও অসুস্থ হয়ে যায়, অন্যথায় প্রকৃত অসুস্থও অসুস্থতার সার্টিফিকেট পায় না।

উন্নত চিকিৎসা বাণিজ্য!
মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর রোগীকে জিম্মি করেও তারা বাণিজ্য করে। তাদের দাবি মতো টাকা দিলে গুরুতর রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করায়। নয়তো ওই রোগীর রোগ সংক্রান্তে কারাগারের মেডিকেলে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না বলে স্বজনদের জানিয়ে দেয় তারা।

বন্দিদের খাবার চুরি করে কারা কর্তৃপক্ষ!
জেলার বিভিন্ন আদালতে মামলার হাজিরা দিতে কারাগার থেকে আদালতে আসে প্রতিদিন কয়েকশ কারাবন্দি। তাদের জন্য দুপুরের লাঞ্চ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয় না।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির একুশেপত্রিকাডটকমকে বলেন, ‘এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে সব অভিযোগ ঠিক না। কখনো কখনো আমাদের অজান্তে এ ধরনের অনিয়ম ঘটতে পারে। একজন সন্ত্রাসী যদি অসুস্থ হয়, কারাগারের মেডিকেলে থেকে সেবা গ্রহণ করার অধিকার তার আছে। তবে কে থাকবে, কে থাকবে না বিষয়টি সম্পূর্ণ‘টেকনিক্যাল’। মেডিকেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারই ঠিক করেন এটি।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হিসেবে মেডিক্যালের দেখাশুনা করেন এবং সময়ে সময়ে তিনি এটি পরিদর্শনও করেন। কোনো অনিয়ম দেখলে তার ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আছে। প্রয়োজনে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।’

এরপর চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক চাপে পড়ে, আত্মীয় ও পরিচিতজনদের তদবিরে বা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এধরনের সুযোগ ডাক্তাররা দেয় বলে অভিযোগ আমরাও পাই। এক্ষেত্রে দেখা যায়, সুস্থ নয় এমন ব্যক্তিদেরকেও দায়িত্বরত ডাক্তাররা কাগজে কলমে গুরুতর অসুস্থ দেখায়।’

তিনি বলেন, ‘কারাগারের মেডিকেল ওয়ার্ড সরাসরি আমার নিয়ন্ত্রণে না। কারাগার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এটি দেখাশুনা করার জন্য একটি টিম আছে। আমি ওই টিমের একজন মাত্র।’

‘অবৈধভাবে বন্দিদের থাকার সুযোগ দেওয়া ছাড়াও অনেক ধরনের অনিয়মের খবর আমার কাছে আসে। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও বিভিন্ন কারণে কিছু করতে পারি না।’- বলেন সিভিল সার্জন।

*** চট্টগ্রাম কারাগারে চলছে বন্দি বেচা-কেনার ‘নিষ্ঠুর’ বাণিজ্য!
*** ‘জামিনআদেশ’ ঘিরে চট্টগ্রাম কারাগারে প্রকাশ্যে ঘুষবাণিজ্য
*** চট্টগ্রাম কারাগারে মাদক ব্যবসার মূলে হামকা নুর আলম!
*** কারাগারে গিয়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে ওরা