চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের জন্য ২ হাজার ২ শত ২৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বাজেট ঘোষনা করেছে। এ প্রস্তাবিত বাজেটে হোল্ডিং কর সহ কোন খাতে কোন ধরনের কর বৃদ্ধি করা ছাড়াই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য নান্দনিক চট্টগ্রাম নগরী প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করা হয়। এতে চট্টগ্রামবাসীর সর্Ÿোচ্চ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ, পরিচ্ছন্ন ,আলোকিত, উন্নত যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বান্ধব, ক্লিন ও গ্রিন সিটির স্বপ্ন বাস্তবায়নকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কে বি আবদুচ ছত্তার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সাধারণ সভায় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাজেট ঘোষনা করেন। সভায় একই সাথে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের ৫ শত ৯২ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকার সংশোধিত বাজেটও অনুমোদন দেয়া হয়।
বাজেটে নিজস্ব উৎস কর ও অভিকর থেকে ২৪২ কোটি ৪৬ লক্ষ ৫২ হাজার টাকা, হাল ও অভিকর ৫৫০ কোটি ৮৯ লক্ষ ৪৮ হাজার, অন্যান্য কর থেকে ২২২ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা, ফিস আদায় বাবদ ৬১ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা, জরিমানা বাবদ ৩০ লক্ষ টাকা, সম্পদ হতে অর্জিত ভাড়া ও আয় ৭২ কেটি ১২ লক্ষ টাকা, সুদ বাবদ ৫ কোটি টাকা, বিবিধ আয় থেকে ১৮ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা, ভর্তুকি বাবদ আয় ২৪ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা অর্থাৎ নিজস্ব উৎস থেকে প্রাপ্তি ১ হাজার ১ শত ৯৭ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা। এ ছাড়াও ত্রাণ সাহায্য ২০ লক্ষ টাকা, উন্নয়ন অনুদান ৯ শত ৮৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৪২ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা সহ সর্বমোট ১ হাজার ২৮ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা দেখানো হয়েছে।
বাজেট বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় চট্টগ্রামকে গ্রিন ও ক্লিন সিটিতে পরিণত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, নগরীর ছাত্রীদের এবং কর্মজীবী মহিলাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিশেষ রুটে ২০টি এসি বাস চালুকরণ. জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৫ সালে প্রস্তাবিত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান এর যুগোপযোগী বাস্তবায়ন, নগরীর যানজট নিরসনে বাস-ট্রাক টার্মিনাল স্থাপন, কালুরঘাটে গার্মেন্ট পল্লি স্থাপন, অত্যাধুনিক ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নগরভবন নির্মাণ করা হবে।
মেয়র বলেন, পর্যটনের উন্নয়ন, সাইক্লোন সেন্টার-সহ স্কুল নির্মাণ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপন, বাকলিয়া স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস কমপ্লেক্স হিসেবে উন্নয়ন, জাইকার সহায়তার অত্যাধুনিক সলিড ওয়েষ্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন, নগরীতে বিদ্যমান অব্যবহৃত পাহাড়সমূহকে পরিকল্পিত উন্নয়নের আওতায় নিয়ে সেখানে বিনোদন ও পর্যটন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আবাসন সুবিধা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, ২৬টি খাল খনন এবং প্রয়োজনীয় পাম্প হাউস-সহ স্লুইস গেইট নির্মাণ, কর্পোরেশনের সাগরিকা স্টোর এলাকার সামগ্রিক মাস্টার প্ল্যান তৈরি ও সেখানে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ, আগ্রাবাদ ডেবা, পাহাড়তলী জোড়া দিঘি, বেলুয়ার দিঘি ও আসকার দিঘি ইত্যাদির সংরক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য বৃহদাকার পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ করা, নগরীতে বিদ্যমান খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানমূহের সংরক্ষণ, পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিবাসীদের জন্য বহুতল ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে।
মেয়র বলেন, নগরীর পতেঙ্গা হতে ফৌজদারহাট পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত উন্নয়ন, বিশেষ রুটে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালুকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সেল গঠন (পর্যাপ্ত লোকবল ও সরঞ্জমাদি-সহ), পাহাড়ের পাদদেশে সুবিধাজনক স্থানে জলাধার স্থাপন, চট্টগ্রামের সদরঘাট হতে সুবিধাজনক রুটসমূহে নৌপরিবহণ চালুকরণ, ইনার রিং রোড নির্মাণ, নগরীতে প্রয়োজনীয় ফ্লাইওভার নির্মাণ, নতুন অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট স্থাপন, প্রিমিয়ার ড্রিঙ্কিং ওয়াটার প্ল্যান্টের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
তিনি বলেন, হালিশহর টিজি ও আরেফিন নগর টিজি তে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন, সিএনজি-প্ল্যান্টে ২ টি নতুন কম্প্রেসার মেশিন স্থাপন, দামপাড়ায় ১ টি নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপন, নগরীর সকল সড়ক বাতি এলইডি বাতিতে রূপান্তর, সাগরিকাস্থ টিউব-লাইট ফ্যাক্টরিকে এল.ই.ডি. বাতি ফ্যাক্টরিতে রূপান্তর করা হবে।
বাজেট বক্তব্যে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ১৯৮৮ সালের সরকার অনুমোদিত একটি জনবল কাঠামো রয়েছে। সে জনবল কাঠামোতে বিভিন্ন পদের সংখ্যা ৩১৮০ টি। ফলে ১৯৮৮ সালের জনবল কাঠামোতে অনুমোদিত জনবল দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বসবাসকারী ৬০ লক্ষ লোকের যথাযথ নাগরিক সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে বিভিন্ন সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করে কর্পোরেশনের বিশাল কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে। নাগরিকদের সেবা চাহিদা পূর্বের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনে ৭৪৯১ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। ইতোপূর্বে অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত কর্মচারীগণ তাদের বেতনের ২০% হারে সর্বনি¤œ ১৫০০ টাকা উৎসবভাতা প্রাপ্ত হতেন। ইতোমধ্যে সরকার স্থায়ী কর্মচারীদের মূল বেতনের ২০% হারে বাংলা নববর্ষ বা বৈশাখি ভাতা ঘোষণা করা হলে, সাধারণ সভার অনুমোদনক্রমে স্থায়ী কর্মচারীদের ন্যায় অস্থায়ী কর্মচারীদেরকেও ২০% হারে বাংলা নববর্ষ ভাতাকে উৎসাহভাতা হিসাবে প্রদান করা হচ্ছে। অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতনভাতা ২৭% হতে ৩৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
মেয়র বলেন, ডোর টু ডোর গমন করে বিন এর মাধ্যমে ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখার জন্য আরও ২ হাজার জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন পরিচ্ছন্ন বিভাগ প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের মধ্যে মহানগরীকে সার্বিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মশক ও দূষণমুক্ত রাখা কর্পোরেশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ নগরীকে গ্রিন ও ক্লিন সিটিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বিভাগের কাজের মান আরো উন্নত ও গতিশীল করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন কাজে বিগত এক বছরে ৭টি ডাম্প ট্রাক, ৩০টি নতুন আবর্জনাবাহী টেম্পু যুক্ত হয়েছে।
বাজেট পেশ উপলক্ষে বিশেষ সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এ বিশেষ সাধারণ সভায় বাজেট প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। পরে ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের বাজেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাজী কাজী মো. শফিউল আলম। সাংবাদিক ও কাউন্সিলরদের উপস্থিতিতে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের বাজেট বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার পক্ষে আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করেন অর্থ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর শফিউল আলম।
প্রধান হিসাবরক্ষন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলোয়াত করা হয়। এ সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সচিব, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সহ বিভাগীয় ও শাখা প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন।
