মামুনুল হক চৌধুরী : ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে বন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীতে এএসআই পদে যোগ দেন আবুল বশর চৌধুরী। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসরে যান বন্দরের নিরাপত্তা পরিদর্শক হিসেবে। ৩৪ বছর চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত থেকে নগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর, পটিয়া পৌর সদরে জমি, একাধিক বাড়ি, দোকানসহ শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন এই ব্যক্তি। সম্প্র্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই তথ্য।
জানা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনের কাছে ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর চাকরিকালে অবৈধ উপার্জনের কথা অকপটে স্বীকার করেন আবুল বশর চৌধুরী। সে সময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩ লাখ টাকা জমা দিয়ে সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন থেকে ‘মার্জনাপত্র’ সংগ্রহ করেন তিনি। পরে তা উচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হলে আবুল বশরের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধানে জ্ঞাত আয়ের সাথে অসংগতিপূর্ণ ৫৫ লাখ ১০ হাজার ১২৬ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদের তথ্য উঠে আসে। ফলে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামান বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডবলমুরিং থানায় একটি মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তার স্থাবর ও অস্থাবর অবৈধ সম্পদের তালিকাসহ গত ৩০ আগষ্টস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক এম. এইচ রহমত উল্লাহ।
দুদক সূত্রে জানা যায়, বন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগদানের পর আবুল বশর চৌধুরী নিজ নামে পটিয়া থানার গোবিন্দরখিল মৌজায় ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে ৬ শতক, ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ১.৭৫ শতক ও আগস্টে সাড়ে ৫ শতক, ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০ শতক, ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে ২৬ শতক ও জুলাই মাসে ৮ শতক, ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে ২০ শতক, ১৯৮৫ সালের মার্চে ২০ শতক, ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাড়ে ১১ শতক, ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে ২৪ শতক, ১৯৮৬ সালের আগস্টে ৬.২৫ শতক, ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগ্রাবাদে ৮ শতক, ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে পটিয়ার গৌবিন্দরখিল মৌজায় ১.৩৭ শতক ও স্ত্রীর নামে ১.৩৮ শতক, ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে একই মৌজায় প্রয়াত স্ত্রী মমতাজ বেগমের নামে ৭ শতক, ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে গৌবিন্দরখিল মৌজায় নিজ নামে ৬ শতক, সেপ্টেম্বরে তার নিজ নামে ৪ শতক ও স্ত্রীর নামে ২০ শতক, একই মাসে হালিশহরে তার স্ত্রীর নামে ৫ শতক, ২০০০ সালের মে মাসে পটিয়ার গৌবিন্দরখিলে স্ত্রীর নামে ২০ শতক, ২০০২ সালের জুনে তার নিজ নামে পটিয়ার সুচক্রদন্ডি মৌজায় ২৭ শতক, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে তার ছেলের নামে সুচক্রদন্ডিতে ৭ শতক, ২০০২ সালের ছেলের নামে সুচক্রদন্ডি মৌজায় ছেলের নামে ৭ শতক, ২০০১ সালের আগস্টে সুচক্রদন্ডি মৌজায় স্ত্রীর নামে ২০ শতক, ২০০৩ সালের মে মাসে তার নিজ নামে সুচক্রদন্ডি মৌজায় ১২ শতক, ২০০৩ সালে সেপ্টেম্বরে গোবিন্দরখিল মৌজায় তার নিজ নামে ৫.৫০ শতক, একই মাসে আগ্রাবাদে তার স্ত্রীর নামে ১১৩.৩০ বর্গফুটের দোকান ঘর, ২০০৫ সালে জুনে গোবিন্দরখিল মৌজায় তার স্ত্রীর নামে ৩ শতক ও নভেম্বরে নিজ নামে একই মৌজায় ৩ শতক, ২০০৬ সালের আগস্টে তার স্ত্রীর নামে গৌবিন্দরখিল মৌজায় ৩৮ শতক ক্রয় করেন।
এছাড়াও গৌবিন্দরখিল মৌজায় তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ২ শতক জায়গায় ৭৫০ বর্গফুটের দুই তলা বিশিষ্ট দালান নির্মাণ করেন। ৩০টি দলিলে তৎসময়ে ৪১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৩ টাকায় এসব সম্পদ ক্রয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি কর ফাঁকি ও অর্থের উৎস প্রশ্নবিদ্ধ হবে বিধায় দলিলে ক্রয়মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম উল্লেখ করেছেন আবুল বশর। বর্তমানে তার এসব সম্পদের বাজারমূল্য শত কোটি টাকা। স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি আবুল বশরের নগদ টাকাসহ ২১ লাখ ৪৭ হাজার ১৪১ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন একুশেপত্রিকাডটকমকে বলেন, ‘আবুল বশর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি একটি মামলা দায়ের করে দুদক। গত ৩০ আগস্ট তার স্থাবর, অস্থাবর অবৈধ সম্পদের তালিকাসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে পলাতক আবুল বশর চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ তার অবৈধ সম্পদ জব্দের জন্য ক্রোকি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারির সুপারিশ করেছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মামলার ‘পলাতক’ আসামী হয়েও আবুল বশর চৌধুরী অংশগ্রহণ করছেন পটিয়া পৌর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা ও সমাবেশে।
এদিকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও এব্যাপারে আবুল বশর চৌধুরীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
*** ডিসি অফিসের প্রধান সহকারী ইউনুছের ‘ধনকুবের’ কাহিনী
*** পিয়নের পরিচয় ‘কোটিপতি রুবেল’!
*** সেই কোটিপতি পিয়ন রুবেলকে বদলী
*** অভিশপ্ত হয়ে উঠেছে ষোলশহর ভূমি অফিস!
*** চট্টগ্রাম কারা মেডিকেল অপরাধীদের বিলাসী ঠিকানা
*** ১৫ হাজার বেতনে ২৫ লাখ টাকার গাড়ি !
*** ‘ভুয়া’ দলিল তৈরীর হোতা পিয়ন লিয়াকত!
