তরুণ-তরুণীকে ডেকে প্রয়োজনে চা খাওয়াতে বললেন বিভাগীয় কমিশনার!

চট্টগ্রাম : পুকুরঘাটে আড্ডারত তরুণ-তরুণীকে ডেকে চা খাওয়ানোর জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) পরামর্শ দিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান। বললেন, মাদক, ইয়াবা-আসক্ত না হয়ে, জঙ্গিবাদে না জড়িয়ে কোনো তরুণ-তরুণী যদি তোমার অফিসের সামনে নান্দনিক পুকুরঘাটে বসে প্রেমালাপ করতে আসে প্রয়োজনে তুমি তাদের ডেকে চা খাওয়াবে।

শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঝটিকা সফরে ইউএনও মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানকে তিনি এই পরামর্শ দেন।

একই সাথে নান্দনিক ও সৃষ্টিশীল অবয়ব তৈরির জন্য ইউএনও কার্যালয় এবং কার্যালয় থেকে পুকুর বরাবর সড়ক বানানোর নির্দেশ দেন বিভাগীয় কমিশনার। এজন্য একমাসের সময়সীমা বেধে দিয়ে প্রয়োজনে সেই অর্থের সংস্থান তিনি নিজে করবেন বলেও জানান।

এর আগে সকাল ১১ টায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সিন্ডিকেট মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর উপস্থিতিতে মিটিংটি হয়ে ওঠে ফলপ্রসূ, প্রাণবন্ত। লিয়েনে পড়াশোনার জন্য বছরের পর বছর বিদেশে বিভূঁইয়ে অবস্থান করছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষক। দুই বছরের ছুটি নিয়ে চারবছর, চার বছরের ছুটি নিয়ে আট বছর- এমন শিক্ষকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

এ প্রসঙ্গে সিন্ডিকেট মিটিংয়ে জোরালো বক্তব্য দেন বিভাগীয় কমিশনার। বলেন, যেসব শিক্ষক নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও বিদেশে থেকে ফিরছেন না, তাদের চাকরি থাকার দরকার কী? এই সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া উচিত জানিয়ে সেই পদগুলোতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার উপর তাগিদ দেন বিভাগীয় কমিশনার।

সিন্ডিকেট মিটিং শেষ করে পাশেই রাঙ্গুনিয়া ইউএনও কার্যালয়ে ঝটিকা সফরে যান বিভাগীয় কমিশনার। ইউএনও কার্যালয়ে পৌঁছলে বিভাগীয় কমিশনারকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুল হাসান ও এসি ল্যান্ড পূর্বিতা চাকমা। এসময় বিভাগীয় কমিশনারের সাথে উপস্থিত ছিলেন একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কমিশনার, নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু, রাউজানের এসি ল্যান্ড এহসান মুরাদ, বিভাগীয় কমিশনারের পিএস মো. এনামুল হাসান।

ইউএনও কার্যালয়ে মিনিট দশেক অবস্থানকালে বিভাগীয় কমিশনার ইউএনও অফিসে বুকসেল্ফ সংযোজন করে সেখানে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, ‘শেখ হাসিনা : সিলেক্টেড সেইংস’ ও ‘শেখ হাসিনা : নির্বাচিত উক্তি’সহ বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো রাখার নির্দেশনা দেন।

তিনি বলেন, ইউএনও কার্যালয়ের জানালার এই পাশটা জ্যাম করে রাখার কোনো মানে হয় না। জানালা থাকবে উন্মুক্ত, যেখান থেকে পুকুর, পুকুরঘাট দেখা যাবে। দিগন্ত বিস্তৃত পথে চোখ গেলে মন প্রফুল্ল থাকে, মন প্রফুল্ল থাকলে কাজে প্রাণচাঞ্চল্য থাকে।

অফিস থেকে বেরিয়েই নতুন ইউএনও অফিসের ডিজাইন, অবকাঠামো দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিভাগীয় কমিশনার। জানতে চান কোন ইঞ্জিনিয়ার এর নকশা করেছেন। এরপর নিচে নেমেই আরেকদফা অসন্তোষ প্রকাশ করেন অপরিস্কার উপজেলা শহীদ মিনার ও সেখানে পাখির বিষ্টার পাশাপাশি ইউএনও অফিসের সামনে একটি বড় জায়গা পরিত্যক্ত দেখে। বিভাগীয় কমিশনার শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় জোর দেন এবং পরিত্যক্ত জায়গাটির কীভাবে সদ্ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শ দেন। একইসাথে ইউএনও কার্যালয় থেকে পুকুর পর্যন্ত সোজাসুজি রাস্তা করে পুকুরে একটি চোখধাঁধানো ঘাটলা বানানোর কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার।

এসময় তিনি বলেন, ৫ হাজার বছর আগে মহাভারতে তিনটা বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। জলাশয়, উপসনালয় ও মাঠ। জলাশয়ে পুতপবিত্র হবে, উপসনালয়ে প্রার্থনা করবে আর মাঠে হবে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা। আজকের দিনে জলাশয় ভরাট হয়ে যায়, উপাসনালয় ঘিরে বাণিজ্য হয়, মাঠ হয়ে যায় বেদখল। কাজেই এই পুকুরটি এমনভাবে রাখতে হবে এই যে শিশু-কিশোররা গোসল করছে তা যেন আরও নির্বিঘ্ন হয়। মাছের জন্য যত্রতত্র খাবার ছিটিয়ে পুকুরের পানি যেন গোসল-অনুপযোগী করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে পুকুরের লিজ বাতিল করার কথাও বলেন কমিশনার।

এসময় তিনি নান্দনিক পুকুরঘাট নির্মাণে জোর দেন। বলেন, এমন একটা ঘাট করো যেটি লোকজন দেখতে আসবে, পড়ন্ত বিকেলে এসে আড্ডা দেবে, সময় কাটাবে। স্থানীয় ১০টা লোক এসে বসবে, তরুণ-তরুণীরা এসে সময় কাটাবে। ইয়াবা-আসক্ত না হয়ে, বিপথে না গিয়ে কেউ যদি এখানে প্রেম করতে আসে তোমার অসুবিধা আছে? ইউএনও’র কাছে জানতে চান কমিশনার। না স্যার-ইউএনও’র এমন জবাবের পর কমিশনার বলেন, একই তরুণ-তরুণী যদি পরপর কয়েকবার আসে তাহলে তাদেরকে তোমার অফিসে ডেকে প্রযোজনে চা খাওয়াবে, উৎসাহ জোগাবে।

এরপর শেখ রাসেল এভিয়ারি পার্কের দিকে ছুটে চলে বিভাগীয় কমিশনারের গাড়িবহর। কাপ্তাই প্রবেশমুখে, রাঙ্গুনিয়ার নিশ্চিন্তাপুর সীমানায় ৫২০ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ক্যাবল কারটি এই সরকারের একটি নান্দনিক অর্জন। স্থানীয় সাংসদ ড. হাছান মাহমুদের রুচিশলী ও চিন্তাপ্রসূত ফল এটি। পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে বনবিভাগের জায়গার উপর তিনি এটি নির্মাণ করেন।

এদিকে, বিভাগীয় কমিশনার পার্কে গিয়ে পৌঁছলে পার্ক কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। এরপর তিনি সোজা ক্যাবল কারে চড়ে শূন্যে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেন থরে থরে সাজানো সবুজ-মিতালি। সারি সারি পাহাড় আর বিস্তীর্ণ শস্যভাণ্ডার গুমাইবিল দেখে মুগ্ধ হন। বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য সত্যিই অ্যাডভাঞ্চারাস ব্যাপার এটি। এসময় তার মুখে স্থানীয় সাংসদের রুচিবোধের প্রশংসা ফুটে ওঠে।

বলেন, রাঙ্গুনিয়ার মানুষের ক্যাবল কার নির্মাণের দাবি নিশ্চয় ছিল না, তিনিও হয়তো এমন স্থাপনা করবেন কাউকে কথা দেননি। হাছান মাহমুদ সাহেবের নান্দনিক চিন্তার এই গল্পটির প্রচার হলে, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে পর্যটকে ঠাঁসা হবে এই জনপদ। ক্যাবল কার থেকে নেমে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে সবুজ-প্রকৃতির সৌন্দর্য পরখ করতে করতে জিজ্ঞেস করছিলেন এই নান্দনিকতা তৈরিতে কত টাকা ব্যয় হলো।

ইউএনও’র জবাব, ‘সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।’ অসম্ভব, অত হবে না- কমিশনারের এমন দৃঢ়তায় পাশের একজন বললেন, দুই দফায় ২০ করে ৪০ কোটি টাকার কাজ সম্পাদনের পর সম্প্রতি নতুন করে ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

ইউএনও’র আওতাধীন এলাকায় দেশ-আলোচিত একটি প্রকল্পের নির্মাণব্যয় ইউএনও’র জানা না থাকার বিষয়টি কিছুটা বেখাপ্পা ঠেকলো উপস্থিতজনদের।

নিচে নেমে এভিয়ারির অফিসকক্ষে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ রাখতে কিছু সময় বসলেন বিভাগীয় কমিশনার। ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসি, এসিএফ, রেঞ্জারসহ সংশ্লিষ্টরাও ঘিরে বসেছেন বিভাগীয় কমিশনারকে।

‘ইমতিয়াজ- আপনি ওসি, অনেক ক্ষমতা, তাই না!’

সংকোচ-ভয়ে আড়ষ্ট ওসি বললেন, ‘জ্বি স্যার।’

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এই দেশ স্বাধীন না হলে আপনি কি ওসি হতে পারতেন, ভেবেছেন কখনো? কিংবা আমাদের কী হতো, কোথায় থাকতাম আমরা! বিভাগীয় কমিশনারের কথাটি সমস্বরে সমর্থন দিলেন উপস্থিত সবাই। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, দেশে আজ দৃশ্যমাণ, স্পর্শমাণ অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। এই রোপওয়ে বা ক্যাবল কার সেই ধরনের একটি দৃশ্যমাণ, স্পর্শমাণ প্রকল্প।

এসময় ২০১৩-১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা, আগুন-সন্ত্রাস ছাপিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিসি, আজকের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের সাহসী ভূমিকা ও নির্দেশনার কথা স্মরণ করেন রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি আহসানুল কাদের ভূঁঞা ইমতিয়াজ, ওইসময় যিনি মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন।

বিভাগীয় কমিশনার বললেন, জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে সেদিন ওই ভূমিকা নিতে হয়েছিল। কারণ এই দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু-কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বড় বেশি প্রয়োজন। এই উপলব্ধিটা প্রতিটা মানুষের থাকা উচিত। -যোগ করেন বিভাগীয় কমিশনার।

এসময় সংশ্লিষ্টরা পরিদর্শন খাতা এগিয়ে দেন বিভাগীয় কমিশনারের সামনে। কমিশনার লিখলেন, ‘আজ বিকাল ৪টায় রাঙ্গুনিয়াস্থ শেখ রাসেল এভিয়ারী পার্ক ঘুরে দেখলাম। সাথে একদল তরুণ সহকর্মী। রোপওয়ে ক্যাবল কারে চড়ে সত্যিই আনন্দিত হয়েছি। দেশের ক্যাবল কার এটি। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-সূচকে এটি একটি সংযোজন বলে ভাবা যায়।

বনবিভাগ এর সংরক্ষণ, হেফাজত ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এই প্রত্যাশা সকলেই করেন। দেশের মানুষকে বিজ্ঞাপন প্রচার করে এ সম্পর্কে অবহিত করা জরুরি। পার্কটি আরো নান্দনিক অবয়বে সমৃদ্ধ হবে। আসুন সবাই মিলে এর জয়গান করি।’

একুশে/এসসি/এটি