চট্টগ্রাম: ছবির এই কিশোরের বয়স ১৬, মানসিক প্রতিবন্ধী। কর্ম নেই। মা নেই। বাবা থেকেও নেই। সবমিলিয়ে চাল-চুলোহীন কপর্দকশূন্য অবস্থা। এর মাঝেই বিয়ের সাধ জেগেছে তার। কিছুই না থাকুক। পাগল, বামন-খোঁড়া যাই হোক। সে তো পুরুষ। এটাই বড় যোগ্যতা।
এই যোগ্যতা নিয়ে বিয়ের বাজারে তোলা হয় তাকে। তাতেই তার দাম চড়া। শ্যামলা রংয়ের ১৫ বছরের কিশোরী বেবিকে বউ সাজিয়ে তার হাতে তুলে দিতে নিমিশে রাজি হয়ে গেলো তার মা জাহেদা বেগম। মেয়ে দেখলো, পছন্দ হলো। খুশিতে গদগদ প্রতিবন্ধী কিশোর আকবর।
ছেলের পক্ষে এবার বায়না ধরলো, বরের বাড়িতে টিউবওয়েল বসিয়ে দিতে হবে। সঙ্গে সেনিটারি ল্যাট্রিন, রান্নাঘর নির্মাণ করা লাগবে। দুজন, দুমাস যাতে খেতে পারে সেজন্য ৭৫ কেজি ওজনের এক বস্তা চালও লাগবে তার। কাপড়-চোপড় দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি উদরপূর্তি করে ৫০ জনকে খাওয়ানোর বিষয় তো আছে।
ব্যাস, বরের চাহিদা পূরণে আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশির কাছে ধর্না দিয়ে ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করে ফেললো কিশোরী বেবির পরিবার। এর মধ্যে ১২০ ফুট গভীরতার টিউবওয়েল বসে গেছে প্রতিবন্ধী বরের ভিঠেয়। ল্যাট্রিন তৈরির সরঞ্জামও পৌঁছে গেছে কয়েকদিন আগে। আগামী শুক্রবার বিয়ে। এজন্য বাকি প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন।
কিন্তু এর মাঝেই এ বাল্যবিয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সচেতন এলাকাবাসী। তাদের কথা, দুইজনই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। তার উপর ছেলের শারীরিক সক্ষমতা নেই। এরকম ছেলের কাছে কম বয়সের নিষ্পাপ একটা মেয়েকে তুলে দেওয়া মানে মরার আগে মেয়েটিকে কবরে ঢুকিয়ে দেওয়ার সামিল। এ নিয়ে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে স্থানীয়রা। অন্যদিকে মেয়ের মা জাহেদা বেগম চান যেভাবেই হোক মেয়েকে কিশোর আকবরের হাতে তুলে দিতে।
ঘটনাটি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের বাটানা পাহাড় মইশাবাম এলাকায়। স্থানীয় দিনমজুর গোলাম হোসেন আর জাহেদা বেগমের কনিষ্ঠ মেয়ে বেবি। গোলাম হোসেন এক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তাই তার স্ত্রী জাহেদা বেগমই পরিবারের কর্তা।
অন্যদিকে বর আকবর পার্শ্ববর্তী এলাকার মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে। তার মা নেই। বাবা হোসেন আরেকটি বিয়ে করে সেখানে বসতি গড়েছেন। এই সুযোগে পাড়ার কয়েকজন অতি উৎসাহী মিলে এই কিশোর-কিশোরীর সর্বনাশে মেতে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী জানান, মেয়েটি উত্তর পদুয়া গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ঘরে কাজ করে। অবস্থাপন্ন এই পরিবারে মোটামুটি ভালোই কাটছে মেয়েটির। উপযুক্ত বয়স হলে তারাই তাকে দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে দেবে। কাজেই মেয়েটিকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই।
বেবীর মা জাহেদা বেগম একুশেপত্রিকাডটকমকে বলেন, আমরা গরিব মানুষ। মেয়ে দিন দিন বড় হয়ে উঠছে। তাই সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি। নির্ভার, নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যই মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন বলে জানান তিনি।
মেয়ে-ছেলে দুজনই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। ছেলে আবার প্রতিবন্ধী, কর্মহীন। এই অবস্থায় মেয়ে বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন নাকি সর্বনাশ ডেকে আনছেন। উত্তরে জাহেদা জানান, এর মধ্যেই টিউবওয়েল ও ল্যাট্রিন বসানের জন্য ১৫ হাজার টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। এই টাকা তো ফেরত পাবো না। তাই ভাবছি মেয়ের কপালে যা আছে তাই হবে- বলেন তিনি।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল হোসেন একুশেপত্রিকাডটকমকে বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় যোগদান করার পর বাল্যবিয়েকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। প্রতিদিন এ নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা করছি। আগামী ডিসেম্বরে একটি বড় সমাবেশ করে রাঙ্গুনিয়াকে বাল্যবিয়ে মুক্ত ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই অবস্থায় এই খবর আমার জন্য দুঃখজনক, প্যাথেটিক। বর-কনেসহ যারা এই বিয়ের আয়োজনে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
নারী অধিকার ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের সংগঠন চট্টগ্রাম ফাইট ফর উইমেন রাইটসের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, বিয়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে মেয়ের ১৮ বছর এবং ছেলের ২২ বছর হতে হবে। এক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়ে দুজনই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। ১৯২৯ সালের বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী এটি বিয়ে নয়, বাল্যবিয়ে। যার অপর নাম শিশুবিয়ে। মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য কোনোদিকেই তারা বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। এই বয়সে সন্তান হলে মা এবং শিশু দুজনরই ভঙ্গুর স্বাস্থ্য হবে। তারা পরিবার ও সমাজের বোঝা হবে। এবং মানবসম্পদের জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি অপরাধ জানিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে ছেলে মেয়ের সম্মতি থাকলেও সেই সম্মতি গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু তারা শিশু। এধরনের বিয়েতে যারা বাধ্য করে তাদেরও জেল জরিমানার বিধান রয়েছে।
