চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : সৌন্দর্য যেখানে হাতছানি দিয়ে ডাকে


ইফতেখার সৈকত : প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। শহর থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির খুবই কাছে হাটহাজারীর জোবরায় অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে সকাল হয় পাখির গানে। শাটলের ঝনঝনানিতে শুরু হয় দিন। পথ-প্রান্তর কেবল সবুজ আর সবুজ। সড়কের দু’পাশে পাহাড় আর পাহাড়।

একটু পথ এগিয়ে গেলে সাদা, লাল বর্ণের দালান। কোন
কোনোটি ফ্যাকাল্টি, কোনোটি হল, কোনোটি প্রশাসনিক কার্যালয় কিংবা চাকসুর মতো ভবন। যেখানে রোজ পথচলা হাজার হাজার জ্ঞানপিপাসুর। যাদের হাতেই আগামীর বাংলাদেশের আলোকরশ্মি। ফ্যাকাল্টিগুলোর পাশে শোভা পায় টিনের চালা দেওয়া ছোট ছোট দোকান। ক্যাম্পাসের বাসিন্দারা এই দোকানগুলোকে ডাকে ‘ঝুপড়ি’। যেখানে রোজ হয় গল্প, কবিতা, আড্ডা কিংবা জ্ঞান-গবেষণার চর্চা।

এই পুরো ক্যাম্পাস একটি পর্যটনকেন্দ্রের মতো। অনেকের মতে জ্ঞানীদের আবাস। এখানে রয়েছে পরিচিত কিছু স্থান। যে স্থানগুলো স্বীয় গুণে পুরো ক্যাম্পাস থেকে স্বকীয়। এই স্থানগুলো হলো-জিরো পয়েন্ট, শহিদ মিনার, বুদ্ধিজীবী-জয়বাংলা ভাষ্কর্যের ত্রিমুখী চত্বর, কাটাপাহাড় সড়ক, স্লুইস গেইট, সুবিশাল কেন্দ্রীয় মাঠ, চালন্দা গিরীপথ, টেলিহিল, পাম বাগান, বায়োলজি পুকুর পাড়, হতাশার মোড়, বঙ্গবন্ধু উদ্যান কিংবা ফরেস্ট্রির মতো স্থানগুলো। তাছাড়া চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় জাদুঘরও এখানে অবস্থিত। রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরী।

বন্যপ্রাণী ও বৃক্ষরাজির অভয়াশ্রম: প্রায় ২১শ’ একরের এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের একটি বড় বিষয় বন্যপ্রাণী ও বৃক্ষরাজি। এই ক্যাম্পাসের পাহাড়ের সর্বত্র বৃক্ষের সমারোহ। বৃক্ষরাজির আড়ালে বসবাস করে শত শত বন্য জীবজন্তু ও পাখপাখালি। যা এই ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এক গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে কিছু দুর্লভ প্রজাতির পাখি। মথুয়া, পিটা, গ্রিন ম্যাগপাই, কানাকুয়া, মালকোহা, রেড হেডেড ট্রাগল, রুপাস নেকড লাফিং প্রাস এমনই কিছু দুর্লভ পাখি ক্যাম্পাসের বন-বাঁদারে উড়ে বেড়ায়। ক্যাম্পাসে কখনো কখনো দেখা মিলে হরিণের। এছাড়া বানর, বন্যশুকর, সজারু, খরগোশ, কাঠবিড়াল, কাছিম, বাঁদুর, কুকুর, বনমোরগ এবং বহু প্রজাতির সাপ ও ব্যাঙ প্রায়ই দেখা যায়। ক্যাম্পাসে ছয়টি শ্রেণির ৯৯টি পরিবার এবং ৩১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণির দেখা মেলে।

এ ছাড়া কীট-পতঙ্গের সংখ্যা রেকর্ডকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ২০১৬ সালে বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, মোহাম্মদ সফিউল আলম ও মো. আকতার হোসেনের করা এক গবেষণা হতে জানা যায়, বর্তমানে ক্যাম্পাসে ১৩৬টি পরিবার এবং ৫১২টি গণের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৮৮৫ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদের উপস্থিতি রয়েছে।

ক্যাস্পাসে পাহাড়ি গাছ-গাছালি ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও ফলগাছ। প্রকৃতিতে ঋতুর পালাবদলের সাথে সাথে বদলে যায় এই ক্যাম্পাসের চিত্র। কখনও বা জারুলের রঙে রঙ্গিন কখনও বা কৃষ্ণচূড়ার ফুলঝুরি আবার শীত এলে দেখা যায় ডালিয়া, গাদা কিংবা সূর্যমুখীর বাহার। রাত হলে স্নিগ্ধতা ছড়ায় হাসনাহেনা আর হলের পাশে শোভা পায় সাদা, লাল বর্ণের কাঠগোলাপ। এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন মৌসুমে আম, কাঠাল, পেয়ারা, জামরুল, জামসহ বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলে।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সাম্প্রতিক সময়ে ওয়েবমেট্রিক জরিপে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। তাছাড়া আয়তনে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের তকমাতোদ আছে। এখানে বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। প্রতিবছরই হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে যোগ দেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে। অবদান রাখেন দেশের জ্ঞান-গবেষণা ও উন্নয়নে।

পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার স্থান : রূপসী বাংলার রূপবতী কন্যা এই ক্যাম্পাস। তাইতো এটি শিক্ষার্থীদের প্রাণের স্পন্দন। শিক্ষার্থী ছাড়াও বাইরে থেকে অনেকেই আসেন এখানকার সবুজ প্রকৃতিতে মনজুড়াতে।

মিরসরাই থেকে আসা খান মোহাম্মদ নামে এমনি এক পর্যটক একুশে পত্রিকাকে জানান চবি ক্যাম্পাস নিয়ে তার অনুভূতির কথা। তিনি বলেন, আমি ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াই। সুন্দর সৃষ্টি আর সৌন্দর্যে চোখ জুড়ানো দুটোই ভালোবাসি। এবার ঈদের পর আসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতেই নিজের কাছে বেশ আপসোস লাগলো। যদি আমি এখানে পড়তে পারতাম! কিন্তু তা আর হলো কোথায়।

‘ভীষণ সুন্দর এখানকার পরিবেশ। সন্ধ্যা হলে মনে হয় আকাশ থেকে কুয়াশা পতিত হচ্ছে আর নিরবতা গান গাইছে। আধো আলোয় সড়কগুলো দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মনে হয় কবিতার রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। তারপর আরেকটু দূরে গিয়ে দেখতে পাই গিটারের শব্দ আর টং দোকানে চায়ের ধোঁয়া। দিনের বেলায় বেশ কোলাহল, ছুটোছুটি। লাইব্রেরিতে দেখেছি বইয়ের সমুদ্র আর জাদুঘরের সংগ্রহগুলোও বেশ।’

তিনি আরও বলেন, অনেক বড় ক্যাম্পাস হওয়ায় পুরো ক্যাম্পাস দেখতে পারিনি। তবে যতটুকু দেখেছি তাতেই খুব ভালো লেগেছে। আরও কয়েকবার আসতে চাইবো এখানে। দেখতে চাইবো পুরো ক্যাম্পাস।

নিজের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সহাবউদ্দীন ফাহিম বলেন, সাধারণত আমরা প্রথমবার যে স্থানে যাই তা খুব ভালো লাগে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যায় সেই ভালোলাগা। বিষয়টি এতদিন চিরন্তন সত্যের মতো মনে হতো। তবে আজকে প্রায় চার বছর যাবৎ ক্যাম্পাসে অবস্থান করেও ভালোলাগা হারিয়ে যায়নি। বরং মনে হচ্ছে আরও কতো অদেখা রয়ে গেছে।

এ শিক্ষার্থী আরও বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে কৃত্রিমতার ছোঁয়া একেবারেই নগণ্য। তাই এর সৌন্দর্য হারিয়ে যায়নি। বরং বেড়েই চলেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেখার মতো স্থান আছে, সৌন্দর্যও আছে বটে। তবুও নিরাপত্তার ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। অনেকসময় ছিনতাইয়ের শিকার হতে হয়। প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে নজর দেওয়া আর সৌন্দর্য রক্ষায় কাজ করা। তবেই এই ক্যাম্পাস হবে চিরযৌবনা।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধন করতে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রশাসন। চবির পরিবহন সেলে আরেকটি শাটল সংযুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন রেলমন্ত্রী। এমনটা হলে শাটল যেমন তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে, তেমনি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে এমনটাই আশা সবার।