চট্টগ্রাম : বড়জোর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্যপদ আশা করেছিলেন চট্টগ্রামবাসী। নওফেল এবং তার বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরীও চেয়েছিলেন একটা সদস্যপদ হলেই চলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে। কিন্তু সব ছাপিয়ে মহিউদ্দিনতনয় ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই করে নিলেন একেবারে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে। নওফেলের এই বিশাল পদপ্রাপ্তির মধ্যদিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতি দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার আস্থা, বিশ্বাস ও আন্তরিকতাই প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি মহিউদ্দিনবিরোধী শিবিরের প্রতি এটা এক ধরনের অনাস্থা, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
গেল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দৌড়ে ছিঁটকে পড়েছিলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা, তিন তিনবারের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মনোনয়ন পান দলের চট্টগ্রাম নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। দুইবছর আগেও মহানগর আওয়ামী লীগে যার একটি সদস্যপদ ছিলো না, সেই আ জ ম নাছির উদ্দীনই অল্পদিনের ব্যবধানে একে একে দলের সাধারণ সম্পাদক, সিজেকেএস সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সহ সভাপতি সবশেষ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র। দ্রুত সময়ের মাঝে সব পদ, সব ক্ষমতা এসে ধরা দেয় হাতের মুঠোয়। আ জ ম নাছির হয়ে উঠেন রাজনীতির মাঠে অসীম ক্ষমতাধর। এই ক্ষমতার ঢেউ আছড়ে পড়ে তার অনুসারী নেতাকর্মীদের মাঝে।
টেন্ডার ছাড়াই নগরসজ্জার ১৫ কোটি টাকার কাজ পছন্দের ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়াসহ নানান নেতিবাচক গল্পের ঢালপালা বিস্তৃত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত। জনশ্রুতি আছে, একাধিকবার চেষ্টার পরও গণভবনে নাছিরকে সাক্ষাতের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বার বার ফিরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন তার বিরক্তির কথা। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ করে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনায় আসেন আ জ ম নাছির। জানা গেছে, তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কার্যত সরকারের বিরুদ্ধে নাছিরের এই ধরনের অভিযোগ ভালোভাবে নেননি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ফলশ্রুতিতে জেলা শহর নারায়নগঞ্জের মেয়রকে উপমন্ত্রী, রংপুরের মেয়রকে যেখানে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়, সেখানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মেয়রের এধরনের মর্যাদা নাই। এ নিয়ে নানাভাবে শেখ হাসিনার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা হলেও তাঁর মন গলেনি। এমন এক অবস্থার মাঝে মহিউদ্দিন-তনয়কে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করে দৃশ্যত নগর আওয়ামী লীগে আ জ ম নাছিরবিরোধী শক্তিকে আকাশের চূড়ায় তুলে দিলেন শেখ হাসিনা। তিনি ভালো করেই জানেন, নগর আওয়ামী লীগে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির গ্রুপের বাঘে-মহিষে অবস্থা। প্রকাশ্য সংঘাত, গ্রুপিং তাদের মাঝে। আর এই গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে নওফেলকে পদ দিয়ে কার্যত মহিউদ্দিন-শিবিরকেই এগিয়ে দিলেন শেখ হাসিনা।
এমনটি মনে করে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিষয়টি সর্বজনগ্রাহ্য। তার সন্তান হিসেবে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্যপদ দিতে পারতেন শেখ হাসিনা। কিন্তু আওয়ামী লীগের তৃতীয় শীর্ষপদ কেন দিলেন সেই সমীকরণ অন্তত শেখ হাসিনার কাছে পরিস্কার।
রাজনীতি সচেতনদের মতে, আ জ ম নাছির মেয়র হিসেবে বাড়তি শক্তিমত্তার মালিক হলেও চট্টগ্রামের আমজনতার সঙ্গে আছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এখনো চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে আওয়ামী পরিবারের বড় একটা অংশ মহিউদ্দিনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছেন। তার উপর ছেলের আকাশচুম্বী প্রাপ্তিতে রাতারাতি পাল্টে গেছে চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির সমীকরণ। মহিউদ্দিন-নওফেল বন্দনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে চট্টগ্রামে। পক্ষান্তরে হতাশা নেমেছে আ জ ম নাছির অনুসারী ও সমর্থকদের মাঝে।
রাজনীতি বোদ্ধারা বলছেন, গ্রুপিং-এর রাজনীতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীশিবির এগিয়ে যাওয়ার চেয়েও বড় কথা মহিউদ্দিন চৌধুরী অনেক ভাগ্যবান। জীবদ্দশায় নেতৃত্বের তিলক পরিয়ে দিতে পেরেছেন সন্তানকে। নিজের গড়া সিংহাসনে একেবারে রাজকীয় অভিষেক ঘটাতে পেরেছেন! যেটি তার সমসাময়িক কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর চেয়ে প্রবীণ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এখনো নিজের নেতৃত্ব-মন্ত্রীত্ব নিয়ে ব্যস্ত। তারও যোগ্য সন্তান আছে। কিন্তু এই বয়সেও নিজেকে নিয়ে বিভোর থাকায় যোগ্য সন্তান থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটা করতে পারেননি। অবশ্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে তিনিও তার বড় ছেলের জন্য একটি সদস্যপদ চাওয়ার কথা শোনা যায়। পরবর্তীতে পরিবারতন্ত্রের হিসেব অনুযায়ী ছেলে মূল্যায়িত হলেও তিনি হয়তো সেটা দেখবেন না।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুও দেখে যেতে পারেননি ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের মন্ত্রীত্ব-নেতৃত্ব। পারেননি আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম মেম্বার আতাউর রহমান খান কায়সার। তিনি মারা যাবার পরই মেয়ে ওয়াশেকা আয়েশা খান সংরক্ষিত আসনের এমপি হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মারা যাবার পর সাঈদ খোকন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরে ঢাকার মেয়র হয়েছেন বাবার বদৌলতে। এভাবে প্রায় সব রাজনীতিবিদের সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে নেতা হয়েছেন, মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন বাবা প্রয়াত হবার পরেই। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু নওফেল। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে রাজনীতিতে বর্ণাঢ্য অভিষেক তার। এসেই পেয়ে গেলেন আমজনতার ভালোবাসায় সিক্ত বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরীর গোছানো মাঠ, রাজনীতির ফরম্যাট।
তবে কেবল মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান-এই বিচারে নওফেলের এমন অভিষেককে ভালোভাবে নিতে পারছেন না এমন মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তারা বিষয়টিকে ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টি’ উল্লেখ করে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে পুরনো বিবাদ-বিসম্বাদকে নতুন করে উসকে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন। বিশাল এই পদ-পদবি মহিউদ্দিন-নওফেল বলয়কে শক্তিমত্তায় বেশ এগিয়ে দেবে তাতে সন্দেহ নেই। তাতে করে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়বে নাছির গ্রুপের নেতাকর্মীরা। আরও বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রাজনীতি।
তবে আশাবাদি মানুষেরও কথা আছে। তারা বলছেন, রাজনীতির মাঠে নতুন হলেও নওফেল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। রাজনৈতিক আবহে তার বেড়ে উঠা। এছাড়া মেধাবী, সজ্জন, বিনয়ী হিসেবে তার সুনাম আছে। আইন ও নৃবিজ্ঞানে মাস্টার্সের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ে পাণ্ডিত্যও তার কম নয়। চমৎকার বলতে পারেন। রাগত স্বরে কথা বলা, গালাগাল দেওয়া বাবার দোষগুলোও তার মাঝে অনুপস্থিত।
সংঘাত আর গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে না গিয়ে শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন-উপযোগী তারুণ্য ও মেধানির্ভর যে যোগ্যতা তার আছে সে যোগ্যতা কাজে লাগাতে পারলে তার উপরই নির্ভর করছে চট্টগ্রামের আগামী রাজনীতি। সে ক্ষেত্রে মেয়রসহ এমপি-মন্ত্রীর মতো পদগুলো তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে শুধু তা নয়, তিনি হতে পারেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক সজিব ওয়াজেদ জয়ের মেধাবী ও তারুণ্যনির্ভর কাফেলার অন্যতম সিপাহশালার। ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এখন কোন পথে যাবেন সেটা নির্ভর করছে মূলত তার উপর।
