
মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী : অমিত সম্ভাবনা ও প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা গতিশীল অর্থনীতির একটি দেশ বাংলাদেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ আলোকবর্তিকা হাতে আর্থ-সামাজিক অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ববাসীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের এক পাশে রয়েছে বিশ্বের ২য় শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ চীন এবং অন্যদিকে রয়েছে বিশ্বের ৫ম অর্থনীতির দেশ ভারত। আগামী বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার দাবিদার এই দুটো দেশের পাশে অবস্থান করে বাংলাদেশও তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নপূরণে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের মোট জনসংখ্যার বিবেচনায় এ অঞ্চল প্রায় ৩ বিলিয়ন ভোক্তার একটি বিশাল বাজার।
ষোড়শ শতকের মোগল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি প্রমাণ করে ভারতীয় উপমহাদেশের উজ্জ্বল অতীতের কথা। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মোগলদের অধীন ভারতের মাথাপিছু আয় ওই সময়ের ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের সমপর্যায়ের ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের শাসকরা এ অঞ্চলের উন্নয়নে উদ্যোগ নেননি। কোনো শিল্পকারখানা বা ব্যাংক-বীমার প্রধান কার্যালয় পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের কল-কারখানায় আগুন দেয়। ধ্বংস করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, রেলপথ। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা অর্জনের সময় কেবল অর্থনীতি-ব্যবসা বাণিজ্যেই নয়, আর্থ-সামাজিক নানা সূচকেই অনেক পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। ভগ্নদশা আর শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ।
অর্থনীতির বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং তৎকালীন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সাড়ে সাত কোটি মানুষের বাংলাদেশ আদৌ টিকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন বিশ্বের নামকরা অর্থনীতিবিদরা। ‘বাংলাদেশ : এ টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ –শীর্ষক এক বইয়ে নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ড. জাস্টফালান্ড ও ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জ্যাক আর পারকিনসন অনেকটা চ্যালেঞ্জের সুরে বলেছিলেন, ‘এ অবস্থা থেকে বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশই উন্নত হতে পারবে। ‘বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করে ছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার।
সেই বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নপূরণের মূলমন্ত্র হচ্ছে : `সকলকে সাথে নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সকলের জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করা’। এই দেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষের সকলেই এক একজন উন্নয়নকর্মী যাদের সফল এবং কর্মঠ প্রয়াসে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময়ের ঋণনির্ভর অর্থনীতির এই দেশটি এখন রপ্তানীমুখী একটি দেশে পরিণত হয়েছে। পরিণত জ্ঞানের সঙ্গে কর্মের সম্মিলন ঘটিয়ে আমাদের প্রিয় স্বদেশ এখন ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা বিবেচনায় বিশ্বের ২৯ তম অর্থনীতির দেশ।
এ ধারাবাহিকতায় আশা করা যায়, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সমৃদ্ধশালী ২০টি দেশের অন্যতম একটি দেশ। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্য উন্নয়ন সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার নজর কেড়েছে। যারা এক সময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিল তারা আজ এ দেশকে ‘উন্নয়নের মডেল’ বলে বিবেচনা করছে। অর্থনীতির নিম্নরূপ কিছু সূচকের গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার বিশ্বয়কর চিত্রটি অনুধাবন করা যায়।
জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় : বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত বছর সমূহে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারা বজায় রেখেছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। সরকারের সুষ্ঠু অর্থনৈতিক-ব্যবস্থাপনা, প্রাজ্ঞ রাজস্বনীতি ও সহায়ক মুদ্রানীতির প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও গত নয় বছরে দেশে গড়ে ছয় দশমিক নয় শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ছিল বার্ষিক ৫ ভাগ। ২০১৫- ১৬ অর্থ বছরে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় ৭ ভাগ এবং ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে সেটি ৮ এর বৃত্ত ভেঙ্গে ৮.১৩ ভাগ হয়েছে।
আগামীতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে জোর আশা করা যায়। World Economic Outlook (এপ্রিল-২০১৯) হিসাব মতে বিশ্ব দ্রুততর প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী ৩টি দেশের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। একই সাথে বেড়েছে মাথাপিছু আয়। ২০১০-১১ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথা পিছু আয় ছিল ৯২৮ ডলার যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯০৯ ডলার।
রপ্তানী খাতের অর্জন : অর্থনীতিতে রপ্তানীর খাতকে ‘প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যবসাবান্ধব নীতিগ্রহণ, আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা প্রদান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানী খাতে প্রয়োজনীয় গতিশীলতা আনয়ন করা সম্ভব হয়েছে। ফলে দিনে দিনে বাড়ছে রপ্তানী আয়। স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থবছরে রপ্তানী আয়ের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার (২৬০ কোটি টাকা) যা ২০০৯ সালে দাঁড়ায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রপ্তানী খাতে পোশাক শিল্পের উপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য খাতে আয় বৃদ্ধিকরণকল্পে সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে যার সুফল পাওয়া যাবে আগামী দিনগুলোতে।
রেমিটেন্স থেকে আয় : বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান জনশক্তি রপ্তানীকারক দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দক্ষ/আধাদক্ষ কর্মী ভাই বোন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং শ্রমের মাধ্যমে তাদের অর্জিত আয়ের একটি অংশ দেশে প্রেরণ করে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। দিন দিন বিদেশী কর্মসংস্থান যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে রেমিটেন্স প্রবাহের পরিমাণও। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে জনশক্তি রপ্তানি পরিমাণ ছিল ৬০৮৭ জন এবং এর বিপরীতে রেমিটেন্স আয়ের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে জন শক্তির পরিমাণ ছিল ৮ লক্ষ ৮০ হাজার ৩৭ জনের বিপরীতে রেমিটেন্স আয়ের পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
১৯৭১ এ ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অর্জনের দিকে। আমাদের অগ্রজ প্রজন্ম তাদের রক্ত দিয়ে, শ্রম দিয়ে এই দেশ উপহার দিয়েছেন। এখন সবার কাজ হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিমুখী যে যাত্রা শুরু হয়েছে তাকে এগিয়ে নেয়া এবং উন্নয়নকে টেকসই রূপ দেয়া। সবাই মিলে এ উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শরীক হয়ে নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমাদের উন্নয়ন হবে সকলকে সাথে নিয়ে সকলের জন্য। ভাল থাকুক ভালবাসার বাংলাদেশ।
লেখক : কাউন্সেলর (বাণিজ্য উইংস), বাংলাদেশ দূতাবাস, সিওল, দক্ষিণ কোরিয়া
