চট্টগ্রাম: পুলিশ আইনের পরিবর্তন চায় পুলিশ- এমনটিই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার। শনিবার সকালে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওয়াজেদিয়া এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে তিনি এ তথ্য জানান।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘১৮৬১ সালে পুলিশ আইন প্রণীত হয়েছিল, যার আলোকে পুলিশ বাহিনী পরিচালিত হচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পুলিশ আইন যখন তৈরী হয়েছিল তখন এতে লেখা ছিল, সরকারকে রক্ষা করার জন্য একটি বাহিনী করা হলো- যার নাম পুলিশ। তখনকার প্রেক্ষাপটের কারণে হয়তো এটি যথার্থ ছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এই আইনটির পরিবর্তন দরকার। আমরা ২০০৭ সাল থেকে আইনটি পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছি। কারণ আমরা জনগণের পুলিশ হতে চাই।’
কমিউনিটি পুলিশের স্লোগান হচ্ছে- ‘জনতাই পুলিশ, পুলিশই জনতা’। এই স্লোগানটি বর্তমান আইজিপি শহীদুল হক তৈরী করেছেন উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘আমার নিজের একটি স্লোগান আছে। আপনারা সবাই বলে আসছেন, পুলিশকে আপনারা সহায়তা করছেন, করতে চান। আমি বিনয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। আপনি পুলিশকে সহায়তা করবেন না। আমার স্লোগানের মধ্যেই আপনি পাবেন, সেটি হলো- ‘জনগণের জন্য পুলিশ, জনগণের জন্য জনগণ’।
নিজের দেয়া স্লোগানের ব্যাখ্যা দিলেন পুলিশ কমিশনার, ‘আপনি যদি পুলিশকে সহায়তা করেন, তাহলে আপনি আপনাকে সহায়তা করলেন, আপনার সমাজকে সহায়তা করলেন, আপনার গোষ্টিকে সহায়তা করলেন। এ সহায়তা প্রকারান্তরে হয়তো পুলিশকে সহায়তা করেছেন। কিন্তু আসলে আপনি সহায়তা করেছেন আপনাকেই।’
কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে নিজের মত তুলে ধরেন ইকবাল বাহার। তিনি বলেন, ‘কমিউনিটি পুলিশের প্রথম বিষয়টি হল অংশীদারিত্ব। আরেকটি বিষয় হল পুলিশের সাথে জনগণের একটি সেতুবন্ধন রচনা করা। পুলিশ ও সমাজের প্রতিটি মানুষ মিলে যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তাহলে আমাদের পরাস্ত, পরাভূত করা যাবে না। সে জায়গা থেকে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
‘ইভটিজিং নিয়ে নারীদেরকে সচেতন হতে হবে। সাহসের সাথে ইভটিজিং প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে আস্তে আস্তে ইভটিজিং আর থাকবে না।’- বলেন পুলিশ কমিশনার।
নারীদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সরকারের সাড়ে ১৭ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে। এরমধ্যে ৪ লাখ ২৩ হাজার অর্থ্যাৎ শতকরা ২৪ ভাগ নারী। এরকম পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে নেই। সে জায়গায় আমরা উন্নীত হয়েছি। দিন যত যাবে তত আমরা এগিয়ে যাবো। নারী যদি উপার্জন করতে পারেন, তাহলে তিনি ক্ষমতায়িত হবেন। নারী যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিজেকে অর্ন্তভুক্ত করতে পারেন, তিনি ক্ষমতায়িত হবেন।’
নারী ও পুরুষদের প্রতি অনুরোধ রাখলেন সিএমপি কমিশনার, ‘আপনারা নিজেদেরকে ক্ষমতায়িত করুন। পুরুষদের প্রতি অনুরোধ- নারীদের ক্ষমতায়িত করতে সহায়তা করুন। এতে আপনার ক্ষমতা কমে যাবে না। বরং আপনি গর্ববোধ করবেন, একটি উন্নত দেশের নাগরিক হবেন। যেখানে নারী-পুরুষের সমতা নির্ধারিত থাকবে। নারী-পুরুষ সমঅধিকার ও মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করবেন।’
মাদক ব্যবসা প্রতিরোধে জনগণকে তাদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে স্মরণ করে দেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, ‘আপনারা যারা সমাজে বসবাস করেন, প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায়িত্ব আছে, দায়বোধ আছে। নিজেকে যখন আপনি সজাগ করবেন, তখন দেখবেন এই সমাজে মাদক থাকবে না। বায়েজিদ থানায় ১০০জন পুলিশের বিপরীতে আছে ১২ লাখ মানুষ। ১২ লাখ মানুষ যখন সচেতন হবে, তখন এই ১০০জন পুলিশ কিন্তু নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে হবে, প্রয়োজন থাকবে না। আপনারা সজাগ হোন, আপনার এলাকায় কে মাদক খায়, কে মাদক ব্যবসা করে, কে মাদকের সাথে জড়িত- আপনাদের চাইতে তো থানার পুলিশ ভালো জানার কথা নয়।’
‘ইসলামে আছে- যদি আপনার সামনে কেউ খারাপ কাজ করে তাহলে তাকে বিরত করুন, যদি বিরত করতে না পারেন তাহলে তাকে নিষেধ করুন, তাও না পারলে তাকে ঘৃণা করুন। এখন এই তিন স্তরের কোনটিকে আপনি বেছে নেবেন সেটা ঠিক করুন।’ -বলেন পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার।
পুলিশকে তথ্য দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন সিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, ‘ফোনে পুলিশকে তথ্য দিতে পারেন। নগর পুলিশের ফেসবুক পেইজের মাধ্যমেও অপরাধের তথ্য দিতে পারেন। তথ্য দেওয়ার জন্য অনেকেই আমাকে রাত ১টা, ২টা, ৩টায় পর্যন্ত ফোন করে। আমি কখনো বিরক্ত হই না। হবোও না ইনশাআল্লাহ।’
‘আপনাদের জন্যই এখানে আমার অবস্থান। ৭০ লাখ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার কাঁধে। যিনি যত বড় অবস্থানে যাবেন, তার দায়বদ্ধতা কিন্তু তত বেশী। তার জবাবদিহীতাও তত কঠিন। সে জায়গা থেকে যে কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করার চেষ্টা করবো আমি।’ -যোগ করেন পুলিশ কমিশনার।
চট্টগ্রাম নগরীকে ১৪৫টি বিটে ভাগ করে প্রতিটিতে একজন এসআই ও এএসআই এবং দুইজন কনস্টেবল নিয়োগ করা হয়েছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেছেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে বিট পুলিশিংয়ের তথ্য সংগ্রহ শেষ হবে। এরপর জানুয়ারি থেকে বিট পুলিশিংয়ের সুফল মানুষ দেখতে পাবে। বর্তমান সময়ের চেয়ে আরও ভাল পুলিশী সেবা মানুষ পাবে।’
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘৭০ লাখ মানুষের এই নগরীতে পুলিশের সংখ্যা মাত্র ৬ হাজার ৭০০। সে হিসেবে ১ হাজার ৫০ জনের জন্য একজন পুলিশ। অথচ ৩৮ বছর আগে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের জন্ম হয়েছিল। তখন ৩ হাজার জনবল নিয়ে ১০ লাখ মানুষের নিরাপত্তা দিয়েছিল পুলিশ। অর্থ্যাৎ ৩৩০ জন মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ ছিল। আজকে এটা আমরা আরো পিছিয়ে এনেছি। ৩৩০ এর জায়গায় এক হাজার ৫০ জন হয়েছে। প্রত্যাশার বিপরীতে আপনাদের প্রাপ্তি কিছুটা কম হওয়ারই কথা। সে প্রাপ্তিটা যেন কম না হয়, প্রাপ্তিতে যাতে আপনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। সেজন্য আমরা কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম শুরু করেছি। এটার সুফল জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।’
বক্তব্যের শেষ দিকে একটা ঘোষণা দিয়ে ফেললেন পুলিশ কমিশনার, ‘কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল প্রবক্তা আমাদের পুলিশ প্রধান মহোদয়। আগামী পহেলা ডিসেম্বর লালদিঘীর ময়দানে আমরা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে কমিউনিটি পুলিশের বিশাল সমাবেশ করবো। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আমাদের মাননীয় আইজিপি। আমি আশা করবো কমিউনিটি পুলিশের সবাই লালদিঘী ময়দানে গিয়ে নতুন করে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের শপথ নেবেন।’
পুলিশ কার বন্ধু ও কার শক্রু হবে- তা সুনির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার, ‘পুলিশ তারই বন্ধু হবে, যিনি শান্তিপ্রিয়, যিনি আইনমান্যকারী। পুলিশ চরম শক্রু হবে তার, যে আইন অমান্যকারী, যে অপরাধী। অপরাধী যেই হোক, তার কোন পরিচয় নেই।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মোঃ আব্দুল ওয়ারীশ বলেন, ‘সন্ত্রাস ও অপরাধমুক্ত শহর গড়তে পুলিশ এবং জনতাকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। ৭০ লাখ মানুষকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। আপনারা সবসময় মনে রাখবেন, পুলিশ আপনাদের পাশে আছে। আপনাদের যে কোন বিপদে, যখনই আপনারা আমাদের সাহায্য চাইবেন, তখনই আমরা সাহায্য দিতে প্রস্তুত। থানায় গিয়ে কেউ বিফল হয়ে ফিরে আসবেন না। সহায়তা না পেয়ে ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই। সহায়তা না পেলে আমাকে সাথে সাথে জানাবেন।’
অনুষ্ঠানে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ মাস আপনাদের এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছি। কমিশনার স্যার বলেছেন, কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে একটা সমাবেশ করতে হবে। সবার আগে আমি উদ্যোগ নিয়েছি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে আপনারা এসে আমাকে কৃতজ্ঞ করেছেন। আপনারা এসে প্রমাণ করেছেন, পুলিশের সাথে আপনাদের সেতুবন্ধন হয়ে গেছে। আমরা সবাই মিলে স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌছে দেব। আমরা সবাই চাইলে সন্ত্রাস, মাদক, ইভটিজিং হবে না।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর সিকান্দার খান, নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (উত্তর) কাজী মুত্তাকী ইবনু মিনান, পাঁচলাইশ জোনের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম, ৩নং পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কফিল উদ্দিন প্রমুখ।
