চট্টগ্রাম : রাঙ্গুনিয়ার নিভৃত পল্লী পদুয়ার দক্ষিণপাড়া। এই পাড়ারই বাসিন্দা নূরুল আজম। পৈত্রিকভাবে পাওয়া এক কানি জমি (৪০ শতক) আর মাথা গুঁজার ৮ শতক ভিটেই তার সহায়। দিনভর পরের জমি, পরের বাড়িতে বর্গাচাষ আর ঠেলা গাড়ির চাকায় পিষ্ট যখন জীবিকা; জীবনটা তখন ‘মোটা’, ‘ভারি’ মনে হওয়াই স্বাভাবিক নূরুল আজমের। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ‘মোটা’ ভাতের যাপিত দিনগুলো নিয়ে তেমন হা-পিত্যেশ নেই তার।
সব কষ্ট, দুঃশ্চিন্তা যেন অনাগত দিনগুলো নিয়ে। কারণ তার আছে তিন কন্যার দায়। কন্যাত্রয়ের শারীরিক বাড়-বাড়ন্তে আনন্দের বদলে আঁতকে উঠেন বাবা। মেয়েদের যে সময় মতো বিয়ে দিতে হবে! কিন্তু কীভাবে? ৪০ শতক জমি বেচে পাবেই বা আর কত? বড়জোড় ৫০ হাজার! ভাবতেই নিঃশ্বাসটা যেন আরও দীর্ঘ হয় নূরুল আজমের। নূরুল আজম জানেন, যৌতুকের টাকা ছাড়া আজকাল মেয়ের বিয়ে দেয়া অসম্ভব!
প্রিয় পাঠক, নুরুল আজমের সেই দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মাত্র ৫-৭ বছরের ব্যবধানে তার ৪০ শতক জমির মূল্য দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ টাকায়। আর ৮ শতক ভিটের দাম তো ৮ লাখ টাকার কম নয়। সবমিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সম্পত্তির মালিক নূরুল আজম। এর মধ্যে তার উপার্জন বেড়েছে, বেড়েছে জীবনমান।
দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার দুঃখখ্যাত কালিন্দিরাণী সড়কের ওপর ইট-পাথর আর চুন-সুড়কির আস্তরণ, শিলক খালের দুপ্রান্তে শিলক ও পদুয়া রাজারহাট এলাকায় দুইটি সেতু রীতিমতো পাল্টে দিয়েছে এই অঞ্চলের জীবন-জীবিকা। উৎপাদিত কৃষিপণ্য উত্তরে গোডাউন হয়ে চট্টগ্রাম শহর আর দক্ষিণে বাঙালহালিয়া বাজার হয়ে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি পৌঁছে যাচ্ছে অনায়াসে। অন্য অনেকের মতো নূরুল আজমও উন্নত এই যোগাযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে কৃষিপণ্যে ভর করে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। তাই তার চোখেমুখে এখন আনন্দের ঝিঁলিক, নতুন স্বপ্নের হাতছানি।
নূরুল আজম শুধু নন, রাঙ্গুনিয়ার মেঠো পথে অনেকের জীবন বদলে গেছে। তাদের জীবনপালে লেগেছে উন্নয়ন আর পরিবর্তনের ছোঁয়া। এর প্রধানতম কারণ যোগাযোগের যুগপৎ উন্নয়ন। পেশাগত কারণে রাঙ্গুনিয়ার প্রান্তসীমায় ঘুরে ঘুরে দেখেছি কীভাবে জীর্ণ-বিবর্ণ পথে ইটের পর ইট দিয়ে ঝরেপড়া স্বপ্নগুলোর বুনন হয়েছে নিখুঁতভাবে।
এক দশক আগেও পদুয়া, খুরুশিয়া এলাকার মানুষের জন্য চট্টগ্রাম শহর ছিল ঢাকা দূরত্বের আতঙ্ক। সরু, কর্দমাক্ত পথে রাঙ্গুনিয়া সদর কিংবা শহর যাতায়াতে গলদঘর্ম হতো মানুষ। বর্ষাবিদীর্ণ পথে গন্তব্যে পৌঁছা- সে তো যুদ্ধবিগ্রহের অভিজ্ঞতা। মটর গাড়ি ছিল কল্পনায়। রিক্সায় চড়াও যেন আক্কেল সেলামি। বর্ষা কিংবা বাদলমুখর দিনে রিক্সায় কিছুদূর যাবার পর উল্টো রিক্সাকেই ধাক্কা দিতে দিতে অস্থির-কাহিল যাত্রী নির্বিশেষ। থেমে থেমে হাঁটাপথ, রিক্সা, নৌপথে বেলা গড়িয়ে যেতো শহরযাত্রায়। সেই চার-সাড়ে চারঘণ্টার শহরযাত্রা এখন দেড়ঘণ্টার আরামদায়ক, সময়সাশ্রয়ী জার্নি।
জীবনভর চেরাগের মৃদু আলোয় অন্ধকার তাড়ানোয় তেতো হয়ে উঠা নাপিত পুকুরিয়ার বাচা মিয়ার বিদ্যুতের স্বপ্ন দেখা কি খুব বেশি বাড়াবাড়ি? নাগরিক সভ্যতা-বভ্যতার এই যুগেও সামান্য চাওয়াটুকু অপূর্ণ রেখেই বিদায় নেবেন বৃদ্ধ বাচা মিয়া? সুখের ব্যাপার হচ্ছে, সেই বাচার মিয়ার ঘর এখন ফকফকা, আলোঝলমল।
সর্বশেষ বিদ্যুতায়িত হয়েছে বাচা মিয়ার ঘরসহ প্রত্যন্ত নাপিত পুকুরিয়া এলাকা। নাপিত পুকুরিয়াসহ পুরো রাঙ্গুনিয়া আজ আলো ঝলমল। যেখানে অন্ধকার, সেখানে আলোর বিচ্ছুরণ, অন্ধকার ভেদ করে উৎসারিত হয়েছে নানান আলো।
এর পরও কেউ কেউ টিপ্পনি কাটেন, অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বলেন, কী করেছেন ড. হাছান মাহমুদ। এমনকি জীবন বদলে যাওয়া সেই নূরুল আজমই পাড়ার চা দোকানের আড্ডায় বলে বেড়ান হাছান মাহমুদ তাদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কিছুই করেননি। গেল অবসরে গ্রামে গিয়ে চা দোকানের সেই আড্ডার সাক্ষী হয়েছিলাম। তাদের বলি, এখানে আমার কথা বলার দায় আছে, এ দায় সত্যনিষ্ঠতার। একজন মন্ত্রী-এমপি জনে জনে, ঘরে ঘরে নগদ টাকা, চেক, চাকরি আর বরাদ্দ দিতে পারেন না।
একটি জনপদ তখনই উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত হয়, যখন সেই জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত। হাছান মাহমুদ গত ৮ বছর সমগ্র রাঙ্গুনিয়ায় সেই কাজটি করেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। আলপথকে সড়ক বানিয়েছেন, সড়ককে মহাসড়কে পরিণত করেছেন। সেটি করেছেন বলেই এই অঞ্চলের জায়গা-জমির দাম বেড়েছে হু হু করে।
নূরুল আজমের দেড় লাখ টাকার জমি-ভিটে হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। আরেকজনের ৫ লাখ টাকার জমির মূল্য বেড়ে হয়েছে এক কোটি টাকা। কাজেই ড. হাছান মাহমুদের উন্নয়নভোগী রাঙ্গুনিয়ার সবাই। কেউ বা প্রত্যক্ষভাবে, কেউ পরোক্ষভাবে। এভাবেই তারা আজ আলোকিত রাঙ্গুনিয়ার গর্বিত অংশীদার।
