
চট্টগ্রাম: নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকদিনই ছিল নানা অনিয়ম আর ভোগান্তি। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে দায়সারা ভাব দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, নেওয়া হয়নি তেমন কোন পদক্ষেপ। কেবলই কেন্দ্র পরিদর্শন আর ক্যাম্পাসে টহল দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ক্যাম্পাসে পরীক্ষার্থীরা কিভাবে থাকছে, খাবারের দোকানগুলো সঠিক নিয়মে চলছে কিনা বা নিষিদ্ধ থাকা সত্বেও ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মিছিলের বিরুদ্ধে কোন প্রকার পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষের। তার বদলে ইভটিজিংয়ের দায়ে মারধরের শিকার চবি উপ উপাচার্যের ভাতিজাকে শেল্টার দিতে মনযোগী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পরীক্ষার প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় সামলাতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে।
অনিরাপদ যাতায়াতে চরম ভোগান্তি
এবার ভর্তি পরীক্ষায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৮০ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করেন। তাদের সাথে ক্যাম্পাসে আসেন অভিভাবকরা। প্রত্যেকদিনের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক যাতায়াত করছেন শাটল ট্রেনে। ফলে পরীক্ষার আগে ও পরে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় ট্রেনে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে শাটলের সূচী বাড়ালেও তা পর্যাপ্ত হয়নি।
এদিকে ভর্তি পরীক্ষার চতুর্থ দিন ঘটেছে শাটলের শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি শাটল ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তার বদলে বেলা ১০টায় একটি ডেমু ট্রেন দেওয়া হয়। যা বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

অন্যদিকে একই দিন শাটলে স্ট্রোক করে মারা যান এক ভর্তিচ্ছুর বাবা। এছাড়া প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের বাস সংকট দেখা দিয়েছে প্রথম দিন থেকেই। বাস সংকটের কারণে শিক্ষকদের দাঁড়িয়ে পরীক্ষা ক্যাম্পাসে যেতে দেখা গেছে। এতে করে শিক্ষকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন দপ্তরকে বিষয়টি অবহিত করলেও কোন ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে দাবি শিক্ষকদের। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে যাতায়াত ব্যবস্থায় দেখা গিয়েছে চরম ভোগান্তি।
হল পরিদর্শকদের অদক্ষতা
এবার ভর্তি পরীক্ষায় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপালন করা শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অধিকাংশ পরীক্ষা কক্ষে যাচাই করা হয়নি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কোন রকম মোবাইল বা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস রয়েছে কিনা। ভর্তিচ্ছু একাধিক শিক্ষার্থী জানান, কেবল ফোন থাকলেই রেখে যেতে বলেছেন কর্তব্যরতরা। কিন্তু কোন ধরনের পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। যার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় ভর্তি পরীক্ষার তৃতীয় দিন ‘এ’ ইউনিটের দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ৫৩২ নাম্বার রুম থেকে এক পরীক্ষার্থীর জালিয়াতি ধরা পড়ার বিষয়টি। এতে কেন্দ্র পরিদর্শকদের যতটা না ভূমিকা ছিলো তার চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন জালিয়াতির দায়ে আটককৃত শিক্ষার্থীর পাশে বসা আরেক পরীক্ষার্থী। জনা যায়, কোন বাধা-বিঘ্ন ছাড়াই মোবাইল ও বিশেষ ক্যালকুলেটর নিয়ে পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশ করেন সেই পরীক্ষার্থী।
প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরীক্ষায় ত্রুটি
এবার ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও প্রশ্নে ত্রুটির ঘটনাও ঘটেছে। ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ছিলো একটি প্রশ্ন ভুল। তাছাড়া ‘ডি’ ইউনিটে অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত পরীক্ষা। জাতীয় পাঠ্যক্রম ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশ্ন প্রণয়ন না করেই নেওয়া হয়েছে ব্রিটিশ কারিকুলামে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রশ্নে। ফলে স্থগিত হয়েছে ‘ডি’ ইউনিটের ফলাফল প্রকাশ। এবং আগামী ৬ নভেম্বর ফের ৪১৬ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।এতে করে বৈষম্য সৃষ্টির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া ‘ডি’ ইউনিটের বিকেলের শিফটেও একটি প্রশ্ন ভুল ছিলো।

উপ-উপাচার্যের ভাতিজাকে প্রক্টরিয়াল বডির আশ্রয়-প্রশ্নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের তদারকি কিংবা ক্যাম্পাসে খাবারের দোকানগুলোতে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন ও যাতায়াত ব্যবস্থার বিষয়ে কোন রকম পদক্ষেপ গ্রহণ না করলেও উপাচার্যের ভাতিজাকে শেল্টার দিতে ব্যস্ত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা।
গত সোমবার (২৮ অক্টোবর) রাত সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন চত্বরে চবি উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত) ড. শিরীণ আখতারের ভাতিজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের (১৪-১৫) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আজফার কামাল শাওনের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে ইভটিজিংয়ের অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের একাংশের সাথে মারামারির ঘটনাও ঘটে।
আজফার নিজেকে উপাচার্যের ভাতিজা পরিচয় দিয়ে পুলিশ এবং প্রক্টরিয়াল বডি দ্বারা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের হুমকি দেন। একপর্যায়ে স্বয়ং প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরাই আজফারসহ তার সাথে থাকা ৫ বহিরাগত ইভটিজারকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যান। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে ২০ মিনিটের জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন।
আজফার সহ ৫ বহিরাগতকে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উদ্ধার করে ওয়াচ-টাওয়ারের ভেতরে রাখলে তারা টয়লেটে আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে সহকারী প্রক্টর রেজাউল করিম এসে আজফারসহ অন্যদেরকে ভিসির বাংলোতে নিয়ে যেতে প্রক্টরের গাড়িতে তুলেন। এসময় ইভটিজিংয়ের ঘটনার বিচার না করে তাদেরকে নিয়ে যেতে চাওয়ায় ছাত্রলীগ কর্মীরা প্রক্টরের গাড়িতে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। যদিও এতে কোনো ভাংচুরের ঘটনা ঘটেনি। সোমবার রাত ৯ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করে। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। মো. সাফায়াত নামে ঢাকা থেকে আসা এক ভর্তিচ্ছু বলেন, যখন রাতে দেখতে পাই ক্যাম্পাসে ঝামেলা হচ্ছে তখন খুব ভয় হচ্ছিলো। ভাবছিলাম পরীক্ষা না দিয়েই চলে যাবো। পরে বন্ধুদের কথায় ফিরে যাইনি।
এদিকে প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সময় সব রকমের মিছিল মিটিং বন্ধের ঘোষণা দিলেও ভর্তি পরীক্ষার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন ক্যাম্পাসে মিছিল করে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তবে এ বিষয়ে কোন রকম ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায় অস্থায়ী দোকান, হল ও ক্যাফেটেরিয়ার পাশ থেকে বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। ভর্তি পরীক্ষার আগে ক্যাম্পাসে লাগানো পোস্টার ছিঁড়ে ক্যাম্পাসের যত্রতত্র ফেলে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যকে নষ্ট করে।

এদিকে হলগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের থাকার জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভর্তিচ্ছুদের থাকতে দিলেও পরীক্ষার্থীদের থাকা নিয়ে কর্তৃপক্ষ নেয়নি কোন রকম ব্যবস্থা। এছাড়াও এবারের ভর্তি পরীক্ষায় র্যাগিং, পার্কিং এর নামে বহিরাগতদের চাঁদাবাজি ছিল ক্যাম্পাস জুড়ে। যার দু’একটি ছাড়া অধিকাংশ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যেমন ভর্তিচ্ছুদের ছিলো নানা অভিযোগ তেমনি রয়েছে তাদের অভিভাবকদের। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও সমালোচনা করছেন এই ধরনের ভর্তি পরীক্ষার। তবে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না তারা।
এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের বক্তব্য জানতে পারেনি একুশে পত্রিকা। তবে বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ড. শিরীণ আখতার দাবি করেছেন, ভর্তি পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত সুষ্ঠু, নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুসম্পন্ন হয়েছে। এজন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন তিনি।
