সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাংবাদিক সেজে জামায়াত নেতার পাওয়া চেক বাতিল হচ্ছে

অপকর্ম ঢাকতেই সাংবাদিক নাম ধারণ করেন সাদাত উল্লাহ

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, নভেম্বর ৮, ২০১৯, ৪:৪৩ অপরাহ্ণ


হিমাদ্রী রাহা :
অবশেষে বাতিল হতে যাচ্ছে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিল থেকে অনুদান পাওয়া জামায়াত নেতা ও কথিত সাংবাদিক সাদাত উল্লাহর চেক। একুশে পত্রিকাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ।

তিনি বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে সাংবাদিকদের চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সাদাত উল্লাহ নামে একজন চেক পান। পরে জানতে পারি উনি জামায়াত নেতা ও জামায়াতের ব্যানারে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়ন থেকে নির্বাচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। জানতে পারি তিনি মূলধারার কোনো সাংবাদিক নন। আমি দায়িত্ব নেয়ার আগে ২০১৮ সালে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে অনুদান প্রাপ্তির জন্য তার ফাইল তৈরী হয়। আর তাতে সুপারিশ ছিলো বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্তে নেমেছি। আগামী সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই চেকটি বাতিল করা হবে।

একজন জামায়াত নেতা কীভাবে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের সুপারিশপ্রাপ্ত হলো এ বিষয়ে জানতে কথা হয় বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলামের সাথে। তিনি একুশে পত্রিকাকে জানান, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমি কোনো জামায়াত নেতার পক্ষে সুপারিশ করিনি। আপনার কাছ থেকেই বিষয়টি প্রথম শুনলাম।

বিষয়টি জানতে আর ও কথা হয় বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাচ্চুর সাথে। তিনি একুশে পত্রিকাকে জানান, সাদাত উল্লাহ বান্দরবানের বাসিন্দা না হলেও এক এসময় সে দৈনিক ইনকিলাবের জেলা প্রতিনিধির পরিচয়ে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছিলো। তবে সে মূল ধারার সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত নয় এবং সে কখনো প্রেস ক্লাবেরও সদস্য ছিলো না। সে ২০১২ সালে লোহাগাড়ার চরম্বা ইউনিয়নে জামায়াতের ব্যানারে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। বর্তমানে সে বান্দরবানে সাংবাদিকতা করে না।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন, প্রায় তিন বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবে ইফতার-পরবর্তী ক্লোজডোর মিটিংয়ে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি হিসেবে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে ঢাকার বাইরের বিভাগীয় পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তিনি (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) সেদিন এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্যে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণা অনুযায়ী যদি কল্যাণ ট্রাস্টের ঢাকার বাইরের অন্তত চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধিত্ব থাকতো তাতে এমন করে আজ বিতর্ক হতো না। কল্যাণ ট্রাস্টে পাঁচজন থাকলেও পাঁচজনই ঢাকার। ঢাকার নেতৃত্বের সিন্ডিকেট প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সেটি হতে দেয়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী একুশে পত্রিকাকে বলেন, গতকাল গণভবনে অনুষ্ঠানের ঘোষক যখন সাদাত উল্লাহর নামটি উচ্চারণ করে তখন থমকে যাই। দেখি চেক নিতে এগিয়ে যায় সেই চিহ্নিত লোক। পাশের একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে বললাম, ও তো জামায়াতের লোক। জামাতের ব্যানারে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান। সে কীভাবে এখানে এল। তার জন্য অনুদানের সুপারিশই বা কে করলেন। চেক বিতরণপর্ব শেষে চাচক্রে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কয়েকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি জাফর ওয়াজেদ ভাইকে জানাই। এরই মধ্যে ওই লোককে কাছে পেয়ে তার দলের পরিচয় তুলে ধরে বললাম, আপনি একজন ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে কীভাবে অসহায়, অসুস্থদের তহবিলের টাকা নিলেন। কে আপনার জন্য সুপারিশ করেছে। এ প্রশ্নের জবাবে সে বলে, তার ছেলে অটিস্টিক। তার চিকিৎসার জন্য নিয়েছেন। এসময় কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি তাকে বলেন, সুটেট-ব্যুটেড হয়ে সাহায্য নিতে এসেছেন। বিষয়টি দৃষ্টিকটু হল না।

চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস একুশে পত্রিকাকে জানান, একজন জামায়াত নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাদাত উল্লাহর দুঃস্থ সাংবাদিক সেজে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের চেক গ্রহণ করা খুবই দু‍ঃখজনক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকা সাংবাদিকদের কল্যাণে দিয়ে থাকেন। কিন্তু একটি সিন্ডিকেট এসব টাকা নিয়ে নয়ছয় করছে। এরা কারা? এই জামায়াত নেতা আগেও প্রধানমন্ত্রীর অনুদান থেকে চেক পেয়েছিলো। কার ইন্ধনে কার সহযোগিতায় এসব হচ্ছে? আমি দাবি জানিয়েছিলাম ঢাকার বাইরে যেসব বিভাগ বা জেলা রয়েছে সেখানে সাংবাদিক ইউনিয়ন বা যেখানে সাংবাদিক ইউনিয়ন নেই সেখানে প্রেস ক্লাবের মাধ্যমে সাংবাদিক বাছাই করতে। কিন্তু এই দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এটা হলে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটতো না।

এদিকে এর আগে বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, জামায়াত নেতা সাদাত উল্লাহ দুঃস্থ সাংবাদিক হিসেবে দুই লাখ টাকার অনুদান পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে এ অনুদান তুলে দেন। সাদাত উল্লাহ দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক হিসেবে ওই অনুদান পেয়েছেন। এর কয়েক মাস আগেও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে জামায়াতে ইসলামী সক্রিয় সমর্থক সাদাত উল্লাহ আরও দুই লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এবং তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

কে এই সাদাত উল্লাহ : সাদাত উল্লাহর বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের মজিদিয়া পাড়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মাওলানা আব্দুল কাদের, যিনি যুদ্ধকালীন শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।

১৯৯২ সালে চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাবস্থায় ছাত্র শিবির করতেন সাদাত উল্লাহ। ছিলেন ঐ স্কুলের ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৫ সালে তার নেতৃত্বে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো সাতকানিয়া আওয়ামী লীগের অফিস। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরীর ছোট ভাইকে (ভাইস চেয়ারম্যান) অপহরণ করে নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে সাতকানিয়া কলেজে ফেলে রাখে মৃত ভেবে।

জানা যায়, ২০০০ সালে ছাত্রলীগ নেতা নুরুল কবীর হত্যার মূল হোতাদের তিনি একজন। চট্টগ্রামের ৮ ছাত্রলীগ নেতার হত্যা মামলার ৬ নং আসামী কক্সবাজার গর্জনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম শিকদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেও শোনা যায় সাদাত উল্লাহ।

২০১২ সালের ৩ মে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। জামায়াতের প্রত্যক্ষ সমর্থনে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে দৈনিক ইনকিলাবের বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়া শুরু করেন।

জামায়াতের এই নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জামায়াত নেতাদের প্রচার প্রচারণা নিয়ে বেশ সক্রিয় ছিলেন।

 

২০১২ সালের ১১ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর শামসুল ইসলাম কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর সাদাত উল্লাহসহ জামায়াত নেতারা তাকে বরণ করেনেন। সে বছরের ১৪ জুলাই এ নিয়ে স্ট্যাটাসও দেন তিনি।

২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর সাদত উল্লাহ আরেকটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন- ‘আজ সারাদেশে সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করার প্রতিবাদে জামায়াতের ডাকে আগামীকাল সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল সফল করুন।’ স্ট্যাটাসটির ৫ দিন পর ৮ ডিসেম্বর তিনি লেখেন,‘হে আল্লাহ, আল্লামা সাঈদীকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও ..।’ সেই সাথে একটি ছবি শেয়ারে করেন যাতে লেখা ছিলো- নিরপরাধ আল্লামা সাইদীর ১ দিনের সাজা হলেও গ্রামবাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ বাঁশের লাঠি, বর্শা-বল্লম ও তীর-ধনুক হাতে রাস্তায় নেমে পড়বে।’একই দিন আরেকটি স্ট্যাটাসে লেখেন-‘ শেখ হাসিনার আছে পুলিশের শক্তি আর আমাদের ঈমানের শক্তি। জীবন দিয়ে হলেও করবো আল্লামা সাঈদীকে মুক্তি। আমরা সাঈদী ভক্ত, পারলে ঠেকাও।’

একুশে/এইচআর/এটি