আইন অমান্য করে বাল্যবিয়ের ভিকটিমকে নিয়ে ফেসবুক লাইভে ইউএনও

কক্সবাজার : বিচার কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিশুর নামপরিচয় প্রকাশ যেখানে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, সেখানে বাল্যবিয়ের ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে নিয়ে পরপর দুইবার ফেসবুক লাইভে হাজির হয়েছেন স্বয়ং কক্সবাজারের রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা।

বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে ‘ইউএনও রামু’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে আসেন ইউএনও প্রণয় চাকমা; ৮ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে ভুক্তভোগী মেয়েটিকে বারবার দেখান তিনি। এর আগে দুই মিনিট ৪০ সেকেন্ডের আরেকটি লাইভে আসেন ইউএনও; যেখানে ভুক্তভোগী মেয়েটি ও তার পরিবারের সদস্যদের দেখানো হয়।

ফেসবুক লাইভে ইউএনও বক্তব্য নিয়েছেন ভুক্তভোগী মেয়েটির বাবা, রামু থানার এসআই আনোয়ার, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও উপজেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা জুয়েলের।

লাইভের শুরুতে ইউএনও প্রণয় চাকমা বাল্যবিয়ের কুফল নিয়ে বক্তব্য দিতে এসআই আনোয়ারকে বলেন। এরপর পুলিশ কর্মকর্তা সবাইকে বাল্যবিয়ের খবর জানানোর আহ্বান জানান। এবং খবর পাওয়া মাত্রই ইউএনওসহ হাজির হবেন বলে এসআই আনোয়ার লাইভে আশ্বস্ত করেন।

এরপর স্থানীয় ইউপি সদস্যের দিকে ক্যামেরা তাক করে ইউএনও বলেন, বাল্যবিয়ের খারাপ দিক সম্পর্কে বলুন। তখন বাল্যবিয়ে দিতে সবাইকে নিরুৎসাহিত করছেন বলে জানান ইউপি সদস্য। নিজের তিন মেয়েকে ডিগ্রিতে পড়ার সময় বিয়ে দেওয়ার কথাও তিনি লাইভে জানান।

ইউপি সদস্যের বক্তব্য শেষ হতেই বাল্যবিয়ের কুফল তুলে ধরার পাশাপাশি ভুক্তভোগী মেয়েটির ছবি দেখান ইউএনও প্রণয় চাকমা। এরপর মেয়েটির বাবার নাম উচ্চারণ করে ইউএনও বলেন, আপনি অত্যন্ত খারাপ কাজ করেছেন।

ইউএনও লাইভে বলেন, ২০১৭ সালে মেয়েটি ৮ম শ্রেণীতে ক্লাস করেছে, এখন ২০১৯, এখন তার বয়স কত হতে পারে? ইউএনও’র প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত একজন জবাব দেন, সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬।

এরপর আবার ভুক্তভোগী মেয়েটিকে লাইভে দেখিয়ে ইউএনও উপদেশ দেন, তুমি আপাতত বিয়ের চিন্তা করবে না। পড়ালেখা করো, তোমার জন্য যা যা করার আমরা করবো। বিয়ের চিন্তা করলে নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারবে। তুমি মনে করছো, বিয়ে দিলে সুখে থাকতে পারবে, সেই সুখ ক্ষণস্থায়ী হবে। কারণ কম বয়সে তোমাকে বিয়ে দিচ্ছে।

এ পর্যায়ে ইউএনও বলে উঠেন, ‘সুপ্রিয় রামুবাসী, আপনারা ভালো থাকবেন। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া এটা কাম্য নয়। আমরা চাই, একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ সুখের হোক। জীবনটা স্বাচ্ছন্দ্যময় হোক। এই কথা বলে আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। এই পরিবারকে বাল্যবিয়ে থেকে দূরে রাখতে যা যা করার আমরা করবো। আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন, সহযোগিতা করবেন।’ এ কথা বলার পর আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা জুয়েলকেও হাজির করেন ইউএনও প্রণয় চাকমা। তাকেও বাল্যবিয়ের কুফল বলতে বলেন ইউএনও।

প্রসঙ্গত শিশু আইন, ২০১৩ এর ৮১ ধারার ১ উপ-ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিচারাধীন কোনো মামলা বা বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম অথবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী এমন কোনো প্রতিবেদন, ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা যাইবে না, যাহার দ্বারা শিশুটিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়।

একই আইনের ২ উপ-ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করিলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনধিক ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা একুশে পত্রিকাকে বলেন, মেয়ের বাবাকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তারা নিতান্তই গরীব লোক, ১০ হাজার টাকা দিতে হিমশিম খেয়েছে।

শিশু আইন অমান্য করে ফেসবুক লাইভে এসে ভুক্তভোগীর ছবি দেখানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত সচেতন করতে এটা করা হয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আমার কাছে যেটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে, সেটাই করেছি। এক্ষেত্রে আইন অমান্য হয়নি। জনগণের জন্য যা যা করার আমি সেটা করেছি।

তিনি আরো বলেন, এই মেয়েকে যদি অন্য কোথাও বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, তখন যাতে বাল্যবিয়ে না হয়… মেয়েটিকে সচেতন করা, একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করা। কারণ যখন কারো বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়, তখন তার ছবি বিভিন্ন জায়গায় টাঙিয়ে দেয়া হয়। হুলিয়া মানে তাকে ধরিয়ে দিন। মানুষের কাছে মূলত প্রচার করা, এই মেয়েকে যদি অন্য কোথাও তার বাবা বাল্যবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করেছি। আমি লাইভে গিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি, অন্য কিছু নয়।

একুশে/এসআর/এটি