অন্ধকার-অসুন্দরের সঙ্গে লড়াইটা তিনি একাই করছেন

ranu-20চট্টগ্রাম : মূলত সুরের মানুষ। কিন্তু বেসুরো পথেই হাঁটতে হয়েছে আজীবন। চলেছেন অমসৃণ, কর্দমাক্ত পথে। বাধ্য হয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে এই পথ বেছে নিয়েছেন- সমাজকে এগিয়ে দিতে, নারীমুক্তি আন্দোলনের দীপ্ত এক অঙ্গীকার থেকে। কারণ, তার অস্থিমজ্জায়, শিরা-উপশিরায় সমাজ বদলের অন্যরকম এক উন্মাদনা!

সমাজে এমন কোনো পথ নেই, মত নেই যেখানে তিনি হাঁটেননি, পা মাড়াননি। কোথাও বাল্যবিয়ে হচ্ছে; সেই বিয়ে ঠেকাতে একাই লড়েছেন। আবার নগরে জলাশয়-জলাধার ভরাট হচ্ছে; প্রতিবাদের ঝান্ডা হাতে ছুটে গেছেন। কর্ণফুলির দখল-দূষণ হচ্ছে; সেখানেও হাজির তিনি। কারো সংসার ভেঙেছে; জোড়া লাগানোর আহ্বানে না করেন না তিনি। আগুনে-নির্যাতনে দগ্ধ হয়েছে কোনো নারী; আইনী সহায়তার ঝাঁপি খোলে দেন তিনি। স্লোগানে রাজপথ মাতানো দরকার; উচ্চকিত আওয়াজটি তাকেই দিতে হবে। এভাবেই দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে জনমানুষের সঙ্গে মিশে থাকা মানুষটি আর কেউ নন, অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।

ranu-1শিশুবেলা থেকে মানবিক, পরোপকারী, ব্যতিক্রমী চিন্তা-চেতনা আর প্রতিবাদী মানসিকতায় বেড়ে উঠেন রেহানা বেগম রানু। রেলওয়ে স্কুলের ক্লাশ ফাইভ’র ছাত্রী তিনি। বার্ষিক পরীক্ষার প্রগ্রেস রিপোর্ট আনতে গিয়ে দেখেন- প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার মতো বার্ষিকেও প্রথম। কিন্তু ড্রয়িং পরীক্ষায় অনুপস্থিত দেখিয়ে তাকে দেওয়া হয় ২০তম স্থান। অথচ যাকে ‘প্রথম’ দেখানো হয়েছে ড্রয়িং পরীক্ষা ছাড়াও তার চেয়ে ৪১ নম্বর বেশি আছে তার। ন্যায্যতা ফিরিয়ে দিতে প্রধান শিক্ষকের কাছে অনেক অনুনয়-বিনয় করেন কিশোরী রানু। কিন্তু কিছুতেই সেটি দেওয়া হবে না তাকে। এ অবস্থায় শিক্ষক আর শত শত শিক্ষার্থীর সামনে প্রগ্রেস রিপোর্ট ছিড়ে টুকরো টুকরো করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান তিনি। দুপুর গড়িয়ে রাত, রাত গড়িয়ে সকাল- আদরের মেয়েটির ঘরে ফেরা হয় না। পাগলের মতো ছুটতে লাগলেন স্বজনেরা। উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা। এই অবস্থায় একদিনের মাথায় ‘প্রিয়সখী’ শিরিনের বাসায়ই আবিষ্কৃত হলেন রানু। পুরো ঘটনা জানার পর ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা মুখোমুখি হন স্কুলের শিক্ষকদের। আর তখনই প্রকৃত ঘটনা ফাঁস করলেন প্রধান শিক্ষক। বললেন, মেধাবী ছাত্রী রানুকে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চান না তারা। আর সে কারণেই তাদের এই কৌশল, এই আয়োজন। শেষমেষ দ্বিতীয় স্থানটি দিয়েছেন বটে। কিন্তু রানুকে আর রাখা যায়নি। যোগাযোগ-সুবিধার জন্য বাড়ির কাছে আগ্রাবাদ সরকারি কলোনী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৮৪ সালে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। সেদিন রানু শিখলেন-প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিবাদের ধরন, প্রতিবাদের ফল।

ranu-2ষষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাশটিচার ছিলেন রমাদি। ক্লাসে প্রায়ই ধ্যানমগ্ন অথবা ঘুমাচ্ছন্ন থাকতেন। একদিন ‘মশার উপদ্রব’ শিরোনামে কিছু একটা লিখতে বলে যথারীতি ধ্যানে গেলেন তিনি। সবাই যে যার মতো করে লেখা শুরু করলেন। কখনো সেই লেখা রমাদি দেখেন, কখনো না দেখেই ক্লাসত্যাগ করেন। তাই বেশিরভাগ শিক্ষার্থী উল্টাপাল্টা লিখে খাতাভর্তি করার চেষ্টায় থাকেন। উল্টোরথে হাঁটলেন রানুও, তবে একটু অন্যভাবে। তিনি লিখলেন-‘পরিস্কার পানিতে মশার জন্ম হয়, বংশবিস্তার ঘটে। মশার কামড় ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধ করে’। পাশের বন্ধুদের দৃষ্টি এড়ায় না বিষয়টি। তারা কৌতুহলী হতেই রানু আবার লিখলেন, ‘ঠা-ায় ঘামছি, গরমে কাঁপছি!’ ব্যস, তাতেই পুরো রুমে হইচই। হাসিতে গড়াগড়ি খায় সহপাঠীরা। ধ্যান ভাঙে রমাদির। তীব্র বেগে ছুটে এলেন হাসির ফুয়ারায়। ধারণ করেন রূদ্রমূর্তি। কেড়ে নিলেন রানুর খাতা। পড়ে দেখতেই ছানাবড়া চোখ। এসব কী লিখেছিস তুই!-শব্দ করে ধমক দিতেই আবার থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, ‘অনেক বড় হবে, অনেকদূর যাবে এই দুষ্টু বালিকা!’

ranu-3এরপর দায়িত্ব পান ক্লাস-ক্যাপ্টেনের। স্পিরিট বেড়ে যায় রানুর। ক্লাসে ‘সেরা’, ‘শ্রেষ্ঠ’ তকমা পেয়েই কেবল বসে থাকেননি তিনি; মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে, অন্যদেরও সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করার মহান ইচ্ছার সলতেটি জ্বালিয়ে নেমে পড়েন সমস্ত অন্ধকারে আলো জ্বালাতে। মাদার তেরেসা, বেগম রোকেয়ার জীবনাদর্শ দারুণ প্রভাবিত করে তাঁর জীবন। সবার তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণাটি লাভ করেন তাঁদের জীবন থেকে।

শুরু হয় সমস্ত সুন্দরের অলিতে গলিতে তার বিচরণ। সুরাঙ্গনে গান শিখে বিনামূল্যে পাড়ার ছেলেমেয়েদের গান শেখানোর উদ্যোগ নেন। গান গেয়ে নিজে তৃপ্তি পান, তৃপ্তি দেন অন্যদেরও। তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে গানে গানে মাত করেন বেতার-টেলিভিশনও।

ranu-4অবশ্য তার আগেই যুক্ত হন খেলাঘরের সঙ্গে, টু-থ্রিতে পড়ার সময়। খেলাঘরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতেন পরিবারের বাধা ডিঙ্গিয়ে, কষ্টসহিষ্ণু পথ পাড়ি দিয়ে। পরিবারের সায় নেই, গাড়িভাড়াও নেই। তাই পা দুটিই ছিল তার বাহন। আগ্রাবাদের বেপারিপাড়া থেকে ছোট ছোট পা ফেলে সেই বালিকাবেলায় হেঁটে যেতেন ডিসি হিলের অনুষ্ঠানে। নগরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-আন্দোলনে একজন কিশোরীর নিত্য উপস্থিতি, আগ্রহ একসময় বড়দেরও নজর কাড়ে। সুযোগ আসে গান গাওয়ার, দু-চার কথা বলার। সে সুযোগটিই দারুণ কাজে লাগান তিনি। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর গান আর কথামালার ভক্ত হয়ে উঠেন অনেকেই। এই ফাঁকে বিতার্কিক হিসেবেও দাঁড়িয়ে যায় তার আরেকটি ভাবমূর্তি।

ranu-5সুন্দরের প্রায় সব পথে দাপুটে বিচরণ তাকে ক্রমশ আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে, করে তোলে স্বপ্নবাজ। স্বপ্নপূরণে স্বপ্নের ফেরিওয়ালাকে অনেক বেশি হৃদ্য, সমৃদ্ধ হতে হয় সেটিও তার জানা। আর এই কারণে তিনি নতুন করে হাঁটা শুরু করলেন শিক্ষা গ্রহণ ও বিতরণের পথে। শুরু করেন হিন্দি, উর্দু ভাষার গবেষণা। ফ্লুয়েন্সি বাড়াতে ভর্তি হলেন ‘স্পোকেন ইংলিশ’ কোর্সে। কোর্স শেষে পাড়ার ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে ইংরেজি গ্রামার শিক্ষা দিতেন। শেখাতেন টেন্স, ভয়েজ চেঞ্জ, ন্যারেশন, ভাওয়েল প্রভৃতি।

ranu-6তিনি বুঝতেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে হলে নীতি, নৈতিকতা, সততা, পরিশ্রম, কমিটমেন্টের পাশাপাশি প্রায় সব বিষয়ে দরকার বিস্তৃত জানাশোনা। তাই জানার জগতটাকে শাণিত করতে কড়া নাড়তে শুরু করেন দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান লেখক-মনীষিদের সৃষ্টি সম্ভারে। স্কুল-কলেজ জীবনেই শেষ করেন তারাশঙ্করের ‘কবি’, সেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’, ভিক্টর হুগোর ‘হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’, রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ম্যাক্সিমগোর্কি ও আনিসুল হকের ‘মা’, হুমায়ুন আজাদের ‘পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল’ এবং ‘নারী’, তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’, ‘মেয়েবেলা’সহ নানান মৌলিক গ্রন্থ। এই যোগসূত্রে আপন মৌলিক, মানবিক, নান্দনিক চিন্তার জগতটি আরও খোলে গেলো, আপন মনে তৈরি হলো নিষ্কলুষ সমাজ বিনির্মাণের অন্যরকম এক নেশা!

ranu-7সমাজের ‘জেন্ডার বৈষম্য’-এর বিষয়টি নিদারুণ কষ্টের আগুনে দগ্ধ করে, পুড়িয়ে মারে তাকে। তিনিই আওয়াজ তুললেন, ‘নারী’ নয়, ‘মানুষ’ সম্বোধন করতে হবে নারীকে। এই কনসেপ্টে মাঠে নেমে গেলেন নারীমুক্তি আন্দোলনে। শুরু হলো নারীদের সংগঠিত করার কাজ। যেখানে নারীবৈষম্য ও বঞ্চনার ঘটনা সেখানেই তিনি। নারী জাগরণের কাজের পাশাপাশি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে দেখলেন একজন নারীর অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য। নারীকে ‘ভোগ্যপণ্য’ কিংবা ‘সেবাদাস’ ভাবার সংখ্যা তথাকথিত এই এলিট সমাজেও একেবারে কম নয়। রাজনীতি, সমাজসংস্কার, নারীমুক্তি আন্দোলন কিংবা নারীর প্রতি বৈষম্য ও অনাচারের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে একশ্রেণীর মুখোশপরাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি হারে হারে টের পেয়েছেন তিনি। এই জায়গায় ‘কম্প্রোমাইজ’ না করে টিকে থাকা ছিল অনেক বেশি কষ্টকর। আর সেই কষ্টের কাজটি তাকে করতে হয়েছে অনেক বেশি সাহস, ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে।

ranu-8রানু দেখলেন, নারীমুক্তি প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম, সেটিকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে হলে তার একটি প্লাটফরম দরকার। তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্বে মাস্টার্স পড়ার পাশাপাশি ভর্তি হন ‘বঙ্গবন্ধু ল টেম্পল’ এ। এখান থেকে আইনজীবী হয়ে বেরোনোর পর নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত নারীদের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রটি আরও বড় হলো তার। নারীদের জন্য অল্প খরচে খুলে দেন আইনী সহায়তার দ্বার। সামর্থ্যহীনদের জন্য গঠন করেন বিনামূল্যে ‘আইনী সহায়তা সেল’।

প্রতিদিন নির্যাতিতদের পদভারে মুখর হয় তার বাসা, চেম্বার। স্বজন-সতীর্থ মানুষটিকে শোনান নানান কষ্টকর বর্ণনা আর নির্যাতনের কথা। এক্ষেত্রে অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানুর ব্যতিক্রম ও বিরল উপমার কথাটি বলা যায়। ভিকটিমের মুখে ঘটনা শোনার সাথে সাথে মামলায় না গিয়ে প্রথমে তিনি দুইপক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন। অনেকক্ষেত্রে সফলতাও পেয়েছেন তিনি। এভাবে আদালত নয়, রানুর বাসা-চেম্বারে বসে বহু তিক্ততা, জটিলতার অবসান হয়েছে, ঘটেছে নতুন করে ‘হাতে হাত ধরা’র ঘটনা। এ নিয়ে রানুর বিখ্যাত উক্তি- ‘মামলা করা নয়, মামলা প্রোটেক্ট করি আমি’।

ranu-9যত বেশি মামলা হবে একজন আইনজীবীর ততই লাভ, ততই প্রাপ্তি। কিন্তু একজন পেশাদার আইনজীবী হয়েও এই প্রাপ্তিতে গা ভাসান না রানু। এই প্রসঙ্গে তার বক্তব্য- বৈষয়িক প্রাপ্তি কিংবা লাভ-অলাভের হিসাব নয়, সদা সুন্দর থাকা, সুন্দরের পক্ষে থাকাই আমার ব্রত!

এরও আগের কথা। চিত্তের তাগাদা, মনের খোরাক মেঠানোর কর্মযজ্ঞে অহর্ণিশ কাটাতে গিয়ে তার সামনে এলো জনপ্রতিনিধি হওয়ার হাতছানি। ২০০০ সালে উত্তর আগ্রাবাদ, পাঠানটুলি ও সরাইপাড়া তিন ওয়ার্ড মিলে বিপুল ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হন রেহানা বেগম রানু। সুরের, সুন্দরের, সৃষ্টির এই মানুষটির জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে আনুষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ ঘটল এক জটিল, কুটিল কর্দমাক্ত জগতে। কারণ, জনপ্রতিনিধি মানে ভালো-মন্দ, উগ্র-উচ্ছৃঙ্খল অদ্ভুত সব চরিত্রের মুখোমুখি হওয়া। অনেকেই ভেবেছিলেন বহুমুখী সমস্যা, বহুমুখী চরিত্রগুলোকে মোকাবিল করা কঠিন হবে সুর আর গানের এই মানুষটির। বাস্তবে স্বজন-শুভার্থী, সাধারণের এই ধারণা ভুল প্রমাণ করতে বেশি সময় লাগেনি কমিশনার রানুর। দীর্ঘসময় কমিশনার থাকাকালে সমাজের প্রভাবশালী, মাতব্বর শ্রেণীর রক্তচক্ষু, ভয় উপেক্ষা করে বিচারপ্রার্থীদের সঠিক ‘জাজমেন্ট’টি দিতে কখনো তিনি ভুল করেননি। এমনও সময় গেছে একদিনে চৌদ্দটি সালিশবৈঠক নিষ্পত্তি করতে হয়েছে তাকে। সুষ্ঠু, ন্যায়ভিত্তিক বিচারের স্বার্থে প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রভাবিত করতে পারে এমন মাতব্বর-সর্দার শ্রেণীর মানুষকে বিচারকক্ষ থেকে ধমক দিয়ে বের করে দিতেও কুণ্ঠা করতেন না। নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, সাহস আর প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে রেহানা বেগম রানুকে বিপুল ভোটে পরপর তিনবার (২০০০-২০১৫) ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত করেন এলাকাবাসী।

ranu-10সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলরদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটিও তাকে করতে হয়েছে। প্রথমবার কমিশনার নির্বাচিত হয়ে দেখেন নারী কাউন্সিলরদের কোনো ‘ক্ষমতা’ নেই। ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ তারা। তিন ওয়ার্ডকে সমন্বয় করে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নারী কাউন্সিলররা একটি জাতীয়তা বা চারিত্রিক সনদ ইস্যু করতে পারেন না। অথচ মাত্র এক ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত পুরুষ কাউন্সিলররা সনদ ইস্যু, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন দিব্যি। এই বৈষম্য দূর করতে প্রথম প্রতিবাদ শুরু করেন তিনি। এ নিয়ে সিটি করপোরেশন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের অভিভাবক, পিতৃতুল্য মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে অনিচ্ছাকৃত বিরোধে জড়াতে হয় সন্তানতুল্য রানুকে।

মূলত নারী কাউন্সিলরদের সনদ দেয়ার এখতিয়ার নেই- তৎকালীন মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর এই বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্ট পুস্তক ও আইন ঘেঁটে একটি ক্লজ খুঁজে পান রানু। যেখানে বলা আছে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাত্রই সনদ ইস্যু করতে পারবেন। এই ক্লজ নিয়ে ফের মহিউদ্দিন চৌধুরীর মুখোমুখি হন করপোরেশনের মাসিক সাধারণ সভায়। তুমুল বিতণ্ডা ও তিক্ততার একপর্যায়ে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যান রানু, বেরিয়ে যান অন্য নারী সদস্যরা। এরপর কমিশনার রানু নিজেই প্রেস থেকে জাতীয়তা সনদ ছাপিয়ে ইস্যু করা শুরু করেন। বিষয়টি ওই সময়ে ‘টক অব দ্যা সিটি’তে পরিণত হয়।

ranu-11এদিকে প্রভাবশালী মেয়র বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেক্টরে বলে দিলেন নারী কাউন্সিলরদের ইস্যু করা সনদ যেন গ্রহণ করা না হয়। অবশ্য সেই অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেশি সময় লাগেনি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ ও আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে সনদ ইস্যুর অধিকার ফিরে পান নারী কাউন্সিলররা। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে তিন ভাগের একভাগ উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনারও অধিকারও আদায় করেন রানু। লাভ করেন নিজস্ব অফিস পরিচালনা এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অফিস-ভাড়া প্রাপ্তির সুবিধা।

সিটি করপোরেশনে ‘ভারপ্রাপ্ত ’মেয়রপ্রথা ভেঙে আইন করে সৃষ্টি করা হয় প্যানেল মেয়র প্রথা। তিন প্যানেল মেয়রের মধ্যে একজন বাধ্যতামূলক নারী প্যানেল মেয়রের বিধান রাখা এবং নির্বাচিত কাউন্সিলরদের গোপন ভোটে প্যানেল মেয়র নির্বাচন করতে দাবি তুলেন রানু। এই দাবিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবালের মুখোমুখিও হন তিনি। রানু তখন বাংলাদেশের ছয় সিটি করপোরেশনের নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিক ইনস্টিটিউশন (আইআরআই)-এর উদ্যোগে গঠিত সংগঠনের সভাপতি। ফলে সহজেই উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবালের মাধ্যমে প্যানেল মেয়রে একজন নারী প্রতিনিধি রাখা এবং ভোটের মাধ্যমে প্যানেল মেয়র নির্বাচন করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি। বিভিন্ন অর্জনের মধ্যে এটি একটি অন্যতম অর্জন বলে মনে করেন রানু।

ranu-12চট্টগ্রামসহ সারাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পথিকৃৎ বলা হয় রানুকে। বলাবাহুল্য, নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকানোর মধ্যদিয়েই শুরু হয় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের মিশন। ১৯৮৭ সালে নবম শ্রেণীর ছাত্রী রানু। এসময় এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে রানুর আকদ্-এর আয়োজন করা হয়। কিন্তু তার আগেই রানু নিরুদ্দেশ। আকদ্-এর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রানুর দেখা নেই। শেষপর্যন্ত গুটিয়ে নিতে হলো সব আয়োজন। এরপর প্রিয় এক বান্ধবীকে নিয়ে আলতো পায়ে ঘরে ঢোকেন রানু। পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করলেও রানুর দৃঢ়তায় বুঝে নিলেন তাদের এই চেষ্টা সফল হবে না।

সেই থেকে শুরু হয় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে তার এক কঠিন শপথ। প্রথমদিকে অনেক কন্টকাকীর্ণ ছিল এই কাজটি। মানুষ কথা শুনতে চাইতেন না। খেয়ে-দেয়ে কাজ নাই, পিচ্চি এক মেয়ের কথাই বিয়ে বন্ধ হবে! পাগল, উন্মাদ বলেও উপহাস করতো কেউ কেউ। সচেতনতা, জনমত গঠনের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে থামাতে ব্যর্থ হলে হাজির হতেন থানা-পুলিশে। নিজেই বাদি হয়ে ডায়েরি করতেন। অনুনয় বিনয় করে নিয়ে যেতেন পুলিশকে। বিয়ের আয়োজন বন্ধ করেই শুধু থেমে যেতেন না, ১৮ বছর হওয়ার আগে বিয়ে দেওয়া হবে না মর্মে অভিভাবকদের কাছ থেকে নিতেন মুচলেকা। হাজার-দেড়হাজার মানুষের খাবার প্রস্তুত, অতিথিরাও অনেকেই হাজির। বর আসবে খানিক পর। এই অবস্থায়ও বিয়ে বন্ধ করার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত আছে তার। আর এসব করতেন নারীমুক্তি, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তার গড়া সংগঠন ‘ফাইট ফর উইমেন রাইটস-এর ব্যানারে। এগুলো করতে যেয়ে প্রাণনাশসহ বহুবার হুমকি-ধামকি মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে।

ranu-13এ প্রসঙ্গে একটি শ্বাসরুদ্ধকর বাল্যবিয়ে বন্ধের কাহিনী শোনান রানু। ২০০৮ এর দিককার ঘটনা। হিন্দু সম্প্রদায়ের লগ্ন চলছিল। আন্দরকিল্লা রাজাপুকুর লেনে হৈমন্তি নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরির বিয়ে-আয়োজন প্রায় শেষ। চলছে খাওয়া-দাওয়া। এসময় হাজির হলেন রানু। বললেন, এই বিয়ে হতে দেবেন না তিনি। রূদ্রমূর্তিতে এগিয়ে যেতে রানুকে ঘিরে ফেলেন মেয়ের আত্মীয়স্বজন ও তাদের লেলিয়ে দেয়া একদল যুবক। স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অবস্থানও রানুর বিরুদ্ধে। কঠিন এক পরিস্থিতি রানুর সামনে। রানু জানেন, এই জায়গায় ব্যর্থ হলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে দীর্ঘদিনের কাজটি মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই তার সামনে এখন ‘ডু অর ডাই’। তিনি ডিটারমাইন্ড- যে কোনো মূল্যে এই বিয়ে তাকে বন্ধ করতে হবে। সমস্ত বাধা, মানবপ্রাচীর ডিঙিয়ে অদ্ভুত এক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মুহূর্তের মধ্যে স্টেজের কাছে পৌঁছে যান তিনি। বউয়ের সাজে বসে থাকা হৈমন্তীকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনলেন। এ অবস্থায় ঘিরে ফেলা হলো রানুর চারপাশ। সামনে ব্যারিকেড আর ব্যারিকেড। বিয়েবাড়ি জুড়ে চরম উত্তেজনা, ভয়ঙ্কর অবস্থা। উপায়ন্তর না দেখে গর্জন করে বলে উঠলেন রানু- ‘আমার কাছ থেকে হৈমন্তিকে ছিনিয়ে নিতে হলে আমার লাশ ফেলতে হবে।’

সাহসী, দৃঢ়চেতা এই উচ্চারণের পর মুহূর্তেই নুয়ে পড়লো সমস্ত রক্তচক্ষু। এরপর হৈমন্তিকে সোজা নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন রানু। পরম মমতায় রাখলেন অনেকদিন। তারপর ‘আর বাল্যবিয়ে নয়’ এমন মুচলেকায় পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেন হৈমন্তীকে। বলাবাহুল্য, গণমাধ্যমের বদৌলতে এই ঘটনা তখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছিল। রেহানা বেগম রানু বলেন, এটি আমার জীবনে একটি বড় কাজ, বড় অর্জন বলে মনে করি। রংপুর থেকেও যখন বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে ফোন আসে, কিশোরগঞ্জ কিংবা দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপ থেকে বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য অনুরোধ আসে তখন সত্যিই খুব ভালো লাগে, দারুণ এনজয় করি বিষয়টা।’

ranu-14এক্ষেত্রে আরেকটি চাঞ্চল্যকর, আলোচিত ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ঘটনাটি ২০০৮ সালের। নিজামপুর কলেজের মেধাবী ছাত্রী চন্দনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে গৃহশিক্ষক অর্জুনের। বিয়ের আশ্বাসে চন্দনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কেও জড়ান অর্জুন। কিছুদিন পর এই সম্পর্ক অস্বীকার করে অন্যত্র বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চান অর্জুন। নানাভাবে অর্জুনের মন গলাতে ব্যর্থ হয়ে স্থানীয়ভাবে বিচারপ্রার্থী হন চন্দনা। তার চাওয়া একটাই- প্রেমের পথ ধরে চিরতরে অর্জুনকে কাছে পাওয়া। কিন্তু স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানরা অবস্থান নিলেন অর্জুনের পক্ষে। চন্দনার অভিযোগ শুনতে চায় না থানা-পুলিশও। কী আর করা! লজ্জা, ক্ষোভ আর অপমানে আত্মহননের পথে পা বাড়ান চন্দনা। আর তখনই আলোকবর্তিকা হয়ে আসেন ‘ফাইট ফর উইমেন রাইটস’-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু। পড়ন্ত এক বিকেলে দলবল নিয়ে সুদূর চট্টগ্রাম থেকে মিরসরাইয়ে চন্দনার বাড়িতে হাজির হন তিনি। পরম মমতায় বুকে টেনে নেন বীতশ্রদ্ধ চন্দনাকে। বললেন, কেউ না থাকুক তিনিই আছেন চন্দনার পাশে। সমস্ত দায়িত্ব নিতে চান তিনি।

রানুর আশ্বাসবাণী শুনে ঘুরে দাঁড়ান চন্দনা। ভাবলেন বেঁচে থাকার চেষ্টাটা বোধহয় আরেকবার করা যায়! এরপর রানুর হাত ধরে শহরে চলে এলেন। উঠলেন রানুর বাসাতেই। চন্দনার মানসিক শক্তি, স্বস্তি নিশ্চিত করার পর মিরসরাই থানায় ধর্ষণ মামলা ঠুকে দেন রানু। কেবল তাই নয়, অর্থের বিনিময়ে অর্জুনের পক্ষে নেওয়ায় প্রকাশ্যে সেই চেয়ারম্যানকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করেন। এদিকে পুলিশী অ্যাকশন শুরু হতেই দেশ ছেড়ে ভারত পালিয়ে যান অর্জুন। একবছর পর্যন্ত রানুর বাসায় থাকেন চন্দনা। পরে ঢাকার ইডেন কলেজে পড়াশোনা শেষে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তিনি। চন্দনার জন্য এখানে-সেখানে চাকরির খোঁজও করেন রানু। চট্টগ্রামের একটি আদালতে বর্তমানে চন্দনার মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

ranu-15গৃহকর্মী জাহেরা নির্যাতনের বিষয়টি ছিল আরও বর্বর, নিষ্ঠুর, হৃদয়বিদারক। সময়টা তখন এক-এগারো। উত্তর আগ্রাবাদের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক নেভী কর্মকর্তার স্ত্রী গৃহকর্মী জাহেরাকে অমানবিক নির্যাতনের পর পিঠে ‘জাহেরা’ লিখে দেন খুন্তিপোড়া আগুনে। ঘটনা শুনে স্থির থাকতে পারেননি রানু, দ্রুত ছুটে যান সেখানে। গিয়ে দেখেন সেখানে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি। শত শত মানুষ বিক্ষোভ করছেন নেভী কর্মকর্তার ভবন ঘিরে। মনে হচ্ছে এখনই তারা টেনে, চিড়ে চ্যাপ্টা করবেন পাষ- গৃহকত্রীকে। কিন্তু নির্যাতিত, নিপীড়িতের ঠিকানা রানুর উপস্থিতিতে পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট। মুহূর্তেই বিক্ষোভ থেমে গেলো। তারা বুঝতে পারলেন, কমিশনার রানু এসেছেন, এখন আর পালাবার পথ নেই। বিক্ষোভকারীদের শান্ত করে ভবনের পাঁচতলার বাসায় ঢুকে রানু দেখলেন উদভ্রান্তের মতো বসে আছে নির্যাতনকারী মহিলাটি। জাহেরা কোথায় সেব্যাপারে কিছুই জানা যাচ্ছিল না। মহিলাটিও বলছিলেন না কিছু।

এ অবস্থায় নিচ থেকে উঠে আসা একটি শব্দ রানুর কানে বাজল, জাহেরাকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। কালবিলম্ব না করে গড়গড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামেন। এক দৌড়ে পুলিশ ভ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, খবরদার- জাহেরাকে নিয়ে একপাও আগাবেন না। জানিয়ে দিলেন, মুমূর্ষু জাহেরার কিছু হলে পুলিশকেও আসামী হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ভড়কে গেলেন পুলিশ সদস্যরা। উপায়ন্তর না দেখে রানুর কাছেই জাহেরাকে হস্তান্তর করতে হলো। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) জাহেরাকে ভর্তি করান রানু।

এরইমধ্যে পদস্থ নেভী কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপি ও প্রভাবশালীরা একের পর এক ফোন করতে থাকেন রানুকে। রানুর একটাই জবাব-নির্যাতনকারী যেই হোক তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হতে হবে। অবশেষে নেভী কর্মকর্তাদের জোরাজুরি, অনুরোধে ওদিন রাতেই স্থানীয় এক বাসায় নেভী কর্মকর্তাদের সঙ্গে রূদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন কমিশনার রানু। সেখানে অনেক কথা, বাকবিত-া। একপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জাহেরার পরিবারকে কিছু অর্থসাহায্যের বিনিময়ে আপোস-মীমাংসার প্রস্তাবে কামরুল নামের নেভী কর্মকর্তাকে এভাবেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন রানু।

ranu-16: আপনার মেয়ে আছে?
: হ্যাঁ, আছে।
: ধরুন, জাহেরা আপনার মেয়ে। আপনার মেয়ের উপর এমন নিষ্ঠুরতা চালালো কেউ। আপনি কি তাকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দিতেন অথবা ক্ষমা করতেন?

এমন প্রশ্নে নীরব, নিস্তব্ধ পুরো ঘর। বস-কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে আছেন অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই। বসের মুখের সামনে এতবড় কথা! সবার অপেক্ষা এর পরে বস-এর রিঅ্যাকশন কী হয় তা শুনতে। ঠিক তখনই বস-কর্মকর্তা বললেন, হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক, যৌক্তিক। আমার মেয়ের বিষয় হলে কখনো আপোস করতাম না। আইনগতভাবে যা করার করুন, আমাদের আর কোনো আপত্তি থাকবে না বলে বিদায় নিলেন ওই ভদ্রলোক। পরদিন হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা অনুযায়ী মামলার ড্রাফট করে থানায় পাঠান রানু। কিন্তু পরক্ষণে উল্টে যান ওসি, মামলা নিতে চান না তিনি। রানু আবার ওসিকে ফোন দিলেন। জানতে চান কী সমস্যা! ওসি বললেন, ডিসি পোর্ট কুসুম দেওয়ানের সঙ্গে কথা বলতে। কথামতো কুসুম দেওয়ানকে ফোন দিলে তিনিও গড়িমসি করতে থাকেন। রানু সাফ জানিয়ে দেন, এই মামলা যদি নেওয়া না হয় পরদিন সকালে পুলিশের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ডাকবেন তিনি, যাবেন আদালতে। মিনিট পাঁচেকের পর ওসি ফোন দিয়ে বললেন, আপা উত্তেজিত হইয়েন না, আমরা মামলা নিয়েছি। এরপর গ্রেফতার হলেন সেই ডাইনি গৃহকর্ত্রী। হাজতবাস করলেন দীর্ঘদিন। মামলাটির বিচারকাজও এখন শেষপর্যায়ে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চট্টগ্রামের পরিবেশরক্ষা, দূষণরোধে ঈর্ষন্বীয় কাজটিও রেহানা বেগম রানুর। কোথাও জলাশয়, জলাধার কিংবা পুকুর ভরাটের ঘটনা ঘটলে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। মানববন্ধন, বিক্ষোভ, প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। নগরীর ভেলুয়ার দিঘি রক্ষার তীব্র প্রতিবাদটিও আসে রানুর সংগঠন থেকে। কর্ণফুলীর দখল-দূষণ রোধে প্রায়শ জোরালো আওয়াজ, জোরালো ভূমিকায় দেখা যায় রানুকে। কর্ণফুলী সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে কর্ণফুলী পাড়ে মানববন্ধনও করতে হয় তাকে। নিজ সংগঠন জলাশয় ও জলাধার রক্ষা কমিটির ব্যানারেই করেন তিনি পরিবেশ আন্দোলনের যাবতীয় কাজ।

ranu-17নিজের টাকায় এসব করতে গিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব শূন্য হন তিনি। পুরস্কার (!) হিসেবে পান ভূমিদস্যু, খেকোগোষ্ঠীর হুমকি-ধামকি। প্রকারান্তরে দেশ-বিদেশের অর্থসহায়তা নিয়ে এসব যারা করেন তারা পান আন্তর্জাতিক পুরস্কার, সম্মাননা আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে কী লাভ, কী আনন্দ। কিংবা বৈষয়িক ও ভোগবাদী সমাজে এসব কি পাগলামি নয়?- এমন প্রশ্নে রানুর জবাব- ‘প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটু-আধটু পাগলামি থাকা উচিত, যে পাগলামি জীবনকে উপভোগ্য করে, অর্থবহ করে। দুইদিনের পৃথিবীতে সমাজের জন্য, সমাজের মানুষের জন্য কিছু করতে পারা অনেক গৌরবের, আনন্দের।’
রাজনীতির মাঠেও একজন নিবেদিতপ্রাণ, ত্যাগী কর্মী রেহানা বেগম রানু।

১৯৯৪ সালে সরাসরি চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে তার অভিষেক। ক্রমান্বয়ে মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এক এগারোর সময় দেশে যখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর উপর অসহনীয় অত্যাচার, নিপীড়ন, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল, অধিকাংশ নেতাকর্মী যখন পলাতক কিংবা নিরুদ্দেশের ভূমিকায় তখন প্রায় ৫শ’ নারীকর্মী নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে চট্টগ্রামের মাটিতে প্রথম মানবন্ধন ও সমাবেশ করেন রানু। বলাবাহুল্য, বেধড়ক লাঠিচার্জ করে পুলিশ সেই সমাবেশ পণ্ড করে দেয়। এরপরও শেখ হাসিনার মুক্তি-আন্দোলনে পিছু হটেননি তিনি। তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মুক্তির দাবিতেও রাজপথে সরব ছিলেন রানু।

ranu-18জনগণের অনুরোধে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (ডবলমুরিং) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন রানু। তৃণমূলের ভোটে ৪র্থ হন তিনি। মনোনয়ন না পেলেও নির্বাচনে ৮ এবং ৯ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমান সরকারের ৭ বছর মেয়াদের মধ্যে তিনবারই সংরক্ষিত আসন থেকে তাকে এমপি বানানোর রব উঠে। আলোচনা হয় গণমাধ্যমসহ নানা মহলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি এমপি হতে পারেননি। কেন হননি, হতে পারেননি সে প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে তিনি বলেন, এমপি হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা থাকা দরকার তা হয়তো আমার নেই। এ নিয়ে কোনো কষ্ট নেই জানিয়ে রানু বলেন, ‘কোনো কিছুই সময়ের আগে নয়, আবার সময়ের পরেও নয়।’ সবকিছু সময়মতো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শিক, দায়িত্ববানকর্মী হিসেবে আমি অনেক ভালো আছি, স্বাচ্ছন্দ্যে আছি। ‘সমস্ত পথজুড়ে যে আছে, তার আবার পদের দরকার কী !- যোগ করেন তুখোর এই রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী।

বর্তমানে মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক, সিডিএ নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য, বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সহ সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চট্টগ্রাম শাখার সহ সভাপতি, নারী জোট, চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক, মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক কমান্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, নারী উন্নয়ন ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি, সুশাসনের জন্য প্রচার অভিযান (সুপ্র) চট্টগ্রামের সহ সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স ডেমোক্রেসি নেটওয়ার্কের সদস্য, বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল চট্টগ্রাম শাখার সদস্যসহ অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত রেহানা বেগম রানু।

ranu-19চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শিক্ষা স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার থাকাকালে শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নে কাজ করেন শিক্ষানুরাগী এই মানুষটি। তিনবার বেসরকারি কারা পরিদর্শক থাকাকালে কারাগারের সংস্কার, উন্নয়নের পাশাপাশি কারাবন্দীদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে নান্দনিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া বিনাদোষে যারা হাজতবাস করছেন কিংবা অভিভাবকহীন কারাবন্দীদের তালিকা করে তাদের জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা করেন।

রাজনীতি, সমাজ ও নারী উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় বাংলাদেশস্থ মার্কিন দূতাবাস ২০০৫ সালের দিকে রেহানা বেগম রানুকে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘আরলি রাইজিং লিডার’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে এই অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি একিএম এম বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর সন্তান, তৎকালীন এমপি মাহী বি চৌধুরীকে। ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নামে একটি গ্রন্থ রয়েছে রানুর। তার এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছে ঢাকার জাগৃতি প্রকাশন। এছাড়া স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক-সাপ্তাহিকে সমসাময়িক ইস্যুতে ছাপা হয়েছে তার অসংখ্য প্রবন্ধ, ফিচার। শাহবাগে ‘চিরকালের স্বজন’ নামে কিছুদিন একটি প্রকাশনী সংস্থাও পরিচালনা করেন রানু।

নারীর ক্ষমতায়ন, রাজনীতি ও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিতে রেহানা বেগম রানু ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও থাইল্যান্ড সফর করেন। এর মধ্যে ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরামের সেমিনার, নারী ও মানবাধিকার বিষয়ক সেমিনার ‘উই ক্যান’-অক্সফাম, উইমেন্স ডেমোক্রেসি নেটওয়ার্ক ও জলবায়ু সম্মেলন উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সংস্কার এবং নারীর ক্ষমতায়নে জাতীয় সংসদে সমান প্রতিনিধিত্ব বিষয়ক বিশেষ গবেষণালব্ধ জ্ঞান অর্জন করেছেন রেহানা বেগম রানু। এছাড়া তিনি এলটিজি (জেন্ডার ইস্যু), নারী অধিকার ও আইন বিষয়ক (UNFPA) প্রশিক্ষণ কর্মশালার নিয়মিত প্রশিক্ষক। জেন্ডার প্রজেক্ট ইপসার লিগ্যাল অ্যাডভাইজার এবং হাঙ্গার প্রজেক্টের উদ্যোগে জনপ্রতিনিধি বিষয়ক, জেন্ডার ইস্যুতে স্থানীয় সরকার ও নারী অধিকার বিষয়ক ট্রেনিং এবং মমতা, কেয়ার বাংলাদেশ ও ইয়াং ওয়ানের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন রেহানা বেগম রানু।

এতসবের পরও একজন সহজসরল, সাদামাটা, নিরহঙ্কারী মানুষ রেহানা বেগম রানু। তিনি বলেন, মানবকল্যাণে কাজ করাকে আমি অহংকারের বিষয় মনে করি না। সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিত নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য উন্নয়ন এবং নানা প্রণোদনামূলক কাজ করছি নিরন্তর। এগুলোকে আমার উপর অর্পিত পবিত্র সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করি। আর এসব করতে গিয়ে এক কোটি সন্তান প্রসবের যে বেদনা তার চেয়েও বেশি বেদনা, কষ্ট আমাকে সহ্য করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তবুও মাঠে আছি, থাকবো মরণ অবধি।