
চট্টগ্রাম: পুলিশের তালিকায় তিনি চোর। ২০০৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানায় তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে মামলাও হয়েছিল। চুরির ঘটনায় ২০১১ সালের ১৬ অক্টোবর রাজধানীর নিউমার্কেট থানায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একাধিক খুন-সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অপরাধ ঢাকতে দলবল নিয়ে কয়েক বছর আগে সক্রিয় হয়ে উঠেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে, পরিচিতি পান ‘বোয়ালখালীর বাদশা’। গত ২৭ জুলাই বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদও বাগিয়ে নেন। এখন ক্ষমতাসীন দলের টিকিটে বোয়ালখালী পৌর মেয়র পদে নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছেন মো. মনছুর আলম পাপ্পী (৫৫)।
সরেজমিন দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট অংশে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যদিও কালুরঘাট সেতু, সিইউএফএল পাম্প হাউস ও মাটির নিচে পাইপলাইন থাকায় এলাকাটি স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত। সেখান থেকে উত্তোলিত বালু নদীর দুই পারে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। অথচ বালু উত্তোলনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বা জেলা প্রশাসন কোনো ইজারা দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, বালু তোলার জন্য কালুরঘাট এলাকার ঘাটটি একরকম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উত্তোলন করা বালু ভবন, ব্রিজ কালভার্টসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বালু বিক্রি করে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করছেন মনছুর আলম পাপ্পী। পুরো কালুরঘাট এলাকায় অবৈধ বালু ব্যবসা তার নিয়ন্ত্রণে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও মনছুর আলম পাপ্পী গড়েছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। নামে-বেনামে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট কেনার পাশাপাশি বিশাল জায়গা দখল করে বোয়ালখালীতে করেছেন ‘বাগানবাড়ি’। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত মনছুর আলম পাপ্পী স্ত্রী-সন্তানসহ পুরো পরিবার নিয়ে নিয়মিত ভ্রমণ করেন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। বিলাসবহুল প্রাডো গাড়িসহ ৪-৫টি গাড়ি ব্যবহার করেন মনছুর আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা। সবসময় অবৈধ অস্ত্রধারী দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করেন তিনি। জায়গা-জমি দখল থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে মনছুর আলম পাপ্পীর বিরুদ্ধে।
অবৈধ বালু-পাথরের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বোয়ালখালীতে বেশ কয়েকটি হত্যার ঘটনায়ও মনছুরের সংশ্লিষ্টরা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে বালু ভরাটের বিরোধকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সন্ত্রাসী আজিম উদ্দিন মাহমুদকে অপহরণের পর লাশ গুম করা হয় বলে নগরের খুলশী থানায় মামলা হয়। উক্ত মামলায় মনছুর আলম পাপ্পী ও তার ভাই মো. আলম ববিসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া বোয়ালখালীতে সাইফুল মেম্বার হত্যা, কামাল মেম্বার হত্যা ও স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবদুল হাকিম হত্যার ঘটনায়ও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে মনছুর আলম পাপ্পীর বিরুদ্ধে।

একের পর এক হত্যা, অপহরণ ও সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে পার পেয়ে যাচ্ছেন মনছুর আলম পাপ্পী। আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় ব্যবহার করে বর্তমানে বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন মনছুর আলম পাপ্পী। তার ছোট ভাই মো. আলম ববি বোয়ালখালী উপজেলা যুবদলের সভাপতি ও কথিত মাওয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অভিযোগ আছে, মাওয়া গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান নাম দিয়ে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয় দেখিয়ে অবৈধপন্থায় অর্জিত টাকা বৈধ করার কাজটি দেখভাল করেন মো. আলম ববি। ভাই ববিকে সাথে নিয়ে পুরো বোয়ালখালীজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করছেন মনছুর আলম পাপ্পী। বোয়ালখালীতে মনছুরের কথাকে আইন হিসেবে ধরে নেয় স্থানীয়রা।
অভিযোগ আছে, বোয়ালখালীতে কোন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলে সেখানে হাজির হন মনছুর আলম পাপ্পী। উক্ত প্রকল্পে নানা নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের কাজ হয় পাপ্পীকে দিতে হবে, নয়তো যারা নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করবে তারা নির্দিষ্ট একটি অংশ পাপ্পীকে দিয়ে দেবে। এর ব্যতিক্রম হলে সংশ্লিষ্টদের কড়া মাশুল দিতে হয় বলে অভিযোগ আছে। কালুরঘাট এলাকায় নির্মিত হতে যাওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজও আদায় করে নিয়েছেন মনছুর আলম পাপ্পী।
আসন্ন বোয়ালখালী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন মনছুর আলম পাপ্পী। বিভিন্ন সভা সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দলের নজরে আসার চেষ্টা করছেন তিনি। ‘মনছুর আলম পাপ্পী ভাইকে বোয়ালখালী পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই’ লেখা সম্বলিত পোস্টার দেখা যাচ্ছে বোয়ালখালীর পথে-পথে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মনছুর আলম পাপ্পী একুশে পত্রিকাকে বলেন, জীবনে যত ব্যবসা করেছি বা করছি সবগুলো বৈধ ব্যবসা। সরকারকে ট্যাক্স, ভ্যাট দিয়ে এবং দেশের আইন মেনে আমি ব্যবসা করি।
চুরির মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৫ ও ২০১১ সালে (আমার বিরুদ্ধে) কোন চুরির মামলা হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই। শক্রুতা করে কেউ হয়তো মামলা করতে পারে। তবে বিগত দিনে আমার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো ছিল, সবগুলোতে আমি খালাস পেয়েছি। আমার জানা মতে আজকের দিন পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে কোনো থানায় একটি জিডি পর্যন্ত নেই।
