
শরীফুল রুকন : ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই পুকুরে, দিঘীতে জড়ো হন মৎস্য শিকারিরা। তাদের কারও হাতে বড়শি, আবার কারও হাতে মাছের খাবার। দেখতে উৎসব-আনন্দে মাছ শিকার মনে হলেও এর আড়ালে চলছে জমজমাট জুয়া।
বর্তমানে দেশের নানা স্থানে আয়োজন করা হচ্ছে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতা। আজ এই উপজেলায়, তো কাল অন্য উপজেলায়। পরশু এই জেলায় হলে, পরদিন আরেক জেলায়। স্থান পাল্টালেও মূল আয়োজক প্রায় একই থাকছে। খালি চোখে পুকুর বা দিঘীর মালিককে প্রতিযোগিতার আয়োজক হিসেবে দেখা গেলেও নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র; যারা দেশজুড়ে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতা আয়োজন করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
কথিত বড়শি প্রতিযোগিতার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীর ডিটি রোডের খালেক ও মালেক বড়শি বিতান, আসলাম বড়শি বিতান ও ফোরস্টার বড়শি বিতান, আগ্রাবাদের শাহ আমানত বড়শি বিতান, বকশির হাটের আলেক শাহ বড়শি বিতান, সাতকানিয়ার কেরানিহাটের জামাল বড়শি বিতান, লোহাগাড়ার আমিরাবাদের শাহপীর বড়শি বিতান ও কুমিল্লায় মিজানুর রহমান নামের একজনসহ নানাজনের কাছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর মালিকদের নিয়েই উক্ত চক্রটি গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।
বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতার একটি বড় স্পট হচ্ছে, বান্দরবানের লামা উপজেলার কেয়াজুপাড়া এলাকার হারেছ লেক। সেখানে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে টিকিটের মূল্য হিসেবে আদায় করা হয় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। যদিও হারেছ লেকে তেমন মাছ নেই। প্রতিযোগিতার আগে বাইরে থেকে ৫০-৬০টি মাছ এনে বিশাল লেকে ফেলা হয়। যার কারণে ছিপ ফেলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে একটি মাছও পাননি এমন অনেক মৎস্য শিকারীও আছেন।
প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী যিনি সবচেয়ে বড় মাছ বড়শি দিয়ে ধরতে পারবেন তাকে প্রথম পুরস্কার হিসেবে ৮ লাখ টাকা তুলে দেয়া হয়। দ্বিতীয় পুরস্কার চার লাখ টাকা, তৃতীয় পুরস্কার দুই লাখ টাকা, চতুর্থ পুরস্কার এক লাখ টাকা দেয়া হয়। পঞ্চম পুরস্কার ৮০ হাজার, ৬ষ্ঠ পুরস্কার ৭৫ হাজার, ৭ম পুরস্কার ৭০ হাজার, ৮ম পুরস্কার ৬৮ হাজার, ৯ম পুরস্কার ৬৭ হাজার, ১০ম পুরস্কার ৬৬ হাজার ও ১১তম পুরস্কার হিসেবে ৬৫ হাজার টাকা দেয়া হয়।
হারেছ লেকে গত ২৫ অক্টোবর ৯৫ আসনের টিকিট বিক্রি করা হয়। প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল ৩৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে মোট টিকিট বিক্রি হয়েছে ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সেদিন পুরস্কার দেয়া হয় ১৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। বাকি ১৮ লাখ ১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
গত ১ নভেম্বরও ৯৫ আসনের টিকিট ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করে একইভাবে ১৮ লাখ ১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়।
এরপর ৮ নভেম্বর প্রতিটি ৩৫ হাজার টাকা করে ১০৬টি আসনের টিকিট বিক্রি করা হয় ৩৭ লাখ ১০ হাজার টাকায়। সেদিন ১৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকার পুরস্কার দেয়া হয়। বাকি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
হারেছ লেকে ২২ নভেম্বর ৯৫ আসনের জন্য টিকিট বিক্রি থেকে আসে ৩৮ লাখ টাকা। প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল ৪০ হাজার টাকা। সেদিন পুরস্কার দেয়া হয় ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বাকি ২০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আয়োজকরা।
২৯ নভেম্বর প্রতিটি টিকিট বিক্রি করা হয় ৪৫ হাজার টাকায়। সেদিন ৯৫টি টিকিট বিক্রি থেকে আসে ৪২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আর পুরস্কার দেয়া হয় ১৯ লাখ ২৪ হাজার টাকার। সে হিসেবে ২৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত ৬ ডিসেম্বর হারেছ লেকে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকায় প্রতিটি টিকিট বিক্রি করা হয়। ৯৫ আসনের টিকিট বিক্রি করে আয়োজকরা আয় করেছে ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। সেদিন পুরস্কার দেয়া হয় ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকার। বাকি ১৯ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আয়োজকরা।
একজন প্রবীণ মৎস্য শিকারী একুশে পত্রিকাকে বলেন, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা হল এক ধরনের জুয়া খেলা। এর চেয়ে বড় জুয়া আর নেই। হারেছ লেকে টিকিটের দাম পড়ে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। দেশের কিছু জায়গায় লাখ টাকায়ও টিকিট কিনতে হয়। এই জুয়ায় পড়ে অনেকে ঘরবাড়ি বেচে দিয়েছে, অনেকের পরিবার সর্বশান্ত হয়েছে।
এদিকে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হারেছ লেকে মৎস্য শিকারে যাওয়া লোকজনদের জানানো হয়, মাছ শিকারের জন্য বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে কোনো ধরনের সমস্যা নেই।
এ বিষয়ে রোববার বিকেলে বান্দরবান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, জুয়া খেলার জন্য আমি কিভাবে অনুমোদন দেব? অনুমোদন যদি দিয়ে থাকি মাছ ধরার জন্য দিয়েছি, মাছ তো ধরতেই পারে। অনুমোদন দিয়েছি কিনা সেটা খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারবো।
এরপর লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নূর-এ-জান্নাত রুমি’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, হারেছ লেকে মাছ ধরা বন্ধের জন্য এই মাত্র ডিসি স্যারের নির্দেশনা পেয়েছি। সেখানে মাছ ধরা বন্ধের জন্য লামা থানার ওসি সাহেবকে আমি বলেছি।
এ ব্যাপারে জানার জন্য রোববার রাত ৯টার দিকে লামার হারেছ লেকের কথিত মালিক হারেছের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজী হননি। ব্যস্ত আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
শুধু হারেছ লেক নয়, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরি ফতেহ খাঁন দিঘীতেও আয়োজন করা হয়েছে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতার। আগামী ১০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রতিটি টিকিটের দাম রাখা হচ্ছে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। ৫৫টি টিকিট বিক্রি হলে সেখান থেকে আসার কথা ৯ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা। উক্ত প্রতিযোগিতায় ৮টি পুরস্কারের দাম ঘোষণা করা হয়েছে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। সেখান থেকে হাতিয়ে নেয়া হতে পারে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা।
এ বিষয়ে চাতরি ফতেহ খাঁন দিঘীর মালিক আখতারুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ইউএনও, থানা, চেয়ারম্যান- সব জায়গা থেকে আমরা অনুমতি নিয়েছি। অনুমতির কাগজপত্রও আছে। একটি মাদ্রাসার স্বার্থে আমরা এসব করছি, ব্যক্তিগত স্বার্থে না। চট্টগ্রামে আরও চার-পাঁচটি জায়গায় হচ্ছে এটা (বড়শি প্রতিযোগিতা)।
বড়শি প্রতিযোগিতা জুয়ার মধ্যে পড়ে মন্তব্য করে আনোয়ারা থানার ওসি দুলাল মাহমুদ বলেন, ইউএনও সাহেব এটার অনুমোদন দিয়েছেন। অনুমতির একটি কপি থানায় তারা দিয়ে গেছে, এতটুকুই। এখানে থানার কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়ার কিছু নেই।
জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ফতেহ খাঁন দিঘী থেকে মাছ ধরার জন্য স্থানীয় একজন লোক অনুমতি চেয়েছিল। সেখানে জুয়া বা মাছ ধরা প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য আমি অনুমতি দিইনি। আগামীকাল সকালে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব।
