বদলে যাওয়া একটি থানার গল্প


শরীফুল রুকন : বছরখানেক আগেও থানাটির সীমানা দেয়াল ঘেঁষে প্রস্রাব করতেন পথচারীরা। রাতের আঁধারে মলত্যাগ করতেন ছিন্নমূলের বাসিন্দারা। দিনের বেলা দুর্ভোগে সেই পথ পাড়ি দিতে হত পথচারীদের। চেনা জগৎ এখন অচেনা। সেই দেয়াল এখন সাজানো হয়েছে ফুলগাছ, গৌরবের ইতিহাস আর সচেতনতার বার্তায়। থানা প্রাঙ্গণের চোখ জুড়ানো দৃশ্যে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস।

বদলে যাওয়া থানাটি হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরের কেতোয়ালী মডেল থানা; একজন পুলিশ কর্মকর্তাই যে একটি থানাকে বদলে দিতে পারেন তারই নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলেন ওসি মোহাম্মদ মহসীন।

৫৯টি নান্দনিক চিত্রকর্ম, দেয়াল লিখন ও অসংখ্য ফুলগাছ দিয়ে কোতোয়ালী থানার ভেতরে-বাইরে সাজানো হয়েছে। রাতের বেলা লাইটের আলোয় এ দৃশ্য মানুষের মনে মুগ্ধতা ছড়ায়, রূপ পায় পর্যটন স্পটের।

সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় গেটের সামনে দিয়ে কোতোয়ালী মোড়ের দিকে হেঁটে যেতেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর অগ্নিঝরা ৭ মার্চের ভাষণের একটি নান্দনিক চিত্রকর্ম। থানার সীমানা দেয়ালে তুলে ধরা ওই নান্দনিক চিত্রে দেখা যায়, তর্জনী উচিয়ে জনসমুদ্রে ভাষণ দিচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কোতোয়ালী থানার দেয়ালে ইভটিজিং না করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘যে ইভটিজিংয়ের জন্য আপনাকে প্ররোচিত করে তার থেকে দূরে থাকুন, হতে পারে কাল তার হাতেই ইভটিজিংয়ের শিকার হবেন আপনার মা-বোন।’; ‘ইভটিজিং করার আগে ভেবে দেখুন, জেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তো?’

সেখানে জঙ্গিবাদে না জড়ানোর আহ্বান, ইভটিজিং না করার আহ্বান, গুজব না ছড়ানোর আহ্বান যেমন রয়েছে, তেমনি বাড়ির মালিককে সতর্ক করে ভাড়াটিয়া সম্পর্কে খোঁজ রাখার অনুরোধ জানিয়ে লেখা হয়েছে, ভাড়াটিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হোন, আপনার বাড়ি যেন জঙ্গি আস্তানা না হয়।’

কেতোয়ালী মডেল থানার দেয়ালজুড়ে রয়েছে বিখ্যাত মানুষদের উক্তি। ফেসবুকে প্রেমের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত না হতে আহ্বানও জানানো হয়েছে। ধর্ষণবিরোধী চিত্রকর্ম ও দেওয়াল লিখনে ব্যবহার করা হয়েছে প্রতীকী চিত্র।

থানার প্রবেশপথে চোখে পড়বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সম্বলিত বাণী- ‘শুধু জনগণের ঐকবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা গড়ে তুলতে পারি উন্নততর ভবিষ্যৎ।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সম্বলিত দেয়াল চিত্রে উল্লেখ আছে, ‘নিজের ভাগ্য গোছানোর জন্য নয়, দেশের মানুষের উন্নয়নে কাজ করি।’

থানার ভেতরে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন করে দেয়ালে লেখা হয়েছে, ‘মাদক নয়, মৃত্যু নয়, মাদকমুক্ত জীবন চাই।’ পাশেই রয়েছে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম, আব্রাহাম লিংকনসহ বিখ্যাত মানুষদের উক্তি।

এছাড়া সেবা নিতে আসা মানুষের জন্য কোতোয়ালী থানা প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘সেবা ছাউনি’। ফলে সেবা নিতে এসে এখন আর কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে না।

থানার এমন পরিবর্তনে অবাক অনেকেই। তুষার চৌধুরী নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিগত বিশ বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস করছি। কিন্তু কখনো এতো সুন্দর অবস্থায় কোতোয়ালী থানাকে দেখিনি। এখন এই থানার পাশ দিয়ে হেঁটে আসতেও অনেক ভালো লাগে। ধন্যবাদ টিম কোতোয়ালি এবং মহসিন স্যারকে, এত সুন্দর একটি উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য।’

সুমন বসাক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গতকাল রাতে একটা কাজে পাথরঘাটা গিয়েছিলাম। আসার সময় কোতোয়ালী মোড় দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। আসার সময় থানার চারপাশের বাউন্ডারি দেয়ালে দৃষ্টিনন্দন দেয়ালিকা দেখে খুবই ভালো লাগছিল। তখন সাথে একজনকে বলছিলাম দেখেন কি সুন্দর লাগছে কোতোয়ালী থানাকে। সবই সম্ভব হয়েছে ওসি কোতোয়ালী এর জন্য। বাংলাদেশের সব থানা যদি এরকম হতো!’

ফেসবুকে মইন উদ্দিন সাকিব লিখেছেন, ‘আজকে কোতোয়ালীতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। ৫ বছর ধরে মুসলিম হাই এ পড়েছি। থানার এত সুন্দর দেওয়াল কখনো দেখি নাই। সব সময় থানার দেওয়ালে পোস্টার অথবা মানুষে প্রস্রাব করত। আজ সেই দেওয়াল দেখে সত্যিই মন খুব ভালো হয়ে গেল। ধন্যবাদ ওসি কোতোয়ালীকে।’

এদিকে থানার অভ্যন্তরে উপ-পরিদর্শকদের কক্ষটিও করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন। দেখে বুঝার উপায় নেই, এটা থানা নাকি বহুজাতিক কোনো কোম্পানীর অফিস! উপ-পরিদর্শকদের কক্ষটির ছবি দেখে ফেসবুকে রানু মজুমদার লিখেছেন, ‘আসলেই অসাধারণ। এই রকম অফিস থাকলে কাজের গতি আপনা-আপনি বেড়ে যায়। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ, সুন্দর কাজের জন্য।’ মুহাম্মদ মেহেবুব আলী লিখেছেন, ‘পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য মানুষের মনকে সুন্দর করে। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ওসি সাহেব।’

কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সিএমপি কমিশনার স্যারের নির্দেশনায় থানা প্রাঙ্গণ সাজানো হয়েছে। এখন স্বাধীনতার ইতিহাস বলে কোতোয়ালীর দেয়াল! কোতোয়ালীর দেয়ালও কথা বলে, পুলিশিং করে!’

তিনি বলেন, ‘আশা করছি, থানায় আসা মানুষ এসব চিত্রকর্ম দেখে সচেতন হবেন, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। এছাড়া এখন ভালো পরিবেশ পাওয়ায় অফিসাররাও আগের চেয়ে ভালো ব্যবহার দিতে, কাজ করতে উৎসাহিত হবেন। ভালো পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা সর্বোত্তম সেবা দিতে চাই।’

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) আমেনা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাজানো-গোছানো কোতোয়ালী থানা দেখে মানুষ স্বস্তি পাবে। আমরা চাই, জনগণ আমাদেরকে তাদের পুলিশ মনে করুক। বিপদে জনগণ যেন পুলিশকে বন্ধু ভাবতে পারে—এমনভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে চাই আমরা।’

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য। থানাকে বদলে দেওয়া— এটাকে উৎসাহিত করছি আমরা। অবসরে কেউ মানবিক কাজ করতে চাইলে আমরা প্রমোট করছি, নিজেরাও করার চেষ্টা করছি।’