চট্টগ্রাম : বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে সম্পদের পাহাড় গড়া লিবার্টি এন্টারপ্রাইজ ও সানরাইজ এক্সেসরিজের মালিক মোহাম্মদ ইলিয়াছ অবশেষে দুদকের নজরদারিতে। একই সঙ্গে নজরদারিতে আছেন লিবার্টি গ্রুপের পরিচালক পারভিন আহমেদও।
দুদকের একটি দল সম্প্রতি তাদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে। ইতোমধ্যে তারা ইলিয়াছের সকল ব্যাংক হিসাব, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তির তালিকা প্রস্তুত করেছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে ইলিয়াছ ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক পারভিন আহমেদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দুদকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ব্যাংক এশিয়া, আগ্রাবাদ শাখার একটি সূত্র একুশেপত্রিকাডটকমকে জানায়, মোহাম্মদ ইলিয়াছের ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য জানাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে ইলিয়াছের লেনদেন ও হিসাব সংক্রান্ত প্রায় ১ হাজার পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ব্যাংক এশিয়ার আগ্রাবাদ শাখা।
এ শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশেপত্রিকাডটকমকে জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো উৎস ছাড়া ইলিয়াছের অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি আমরা চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়ে দিয়েছি।
তিনি বলেন, বছরে ইলিয়াছের ৭৫ কোটি টাকা লেনদেনের লিমিট ছিল এই শাখায়। কখনো কখনো ওই লিমিট অতিক্রমের চেষ্টায় নানা হম্বিতম্বি করতেন তিনি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ, উৎস ও এলসি ছাড়া আমরা এই অস্বাভাবিক লেনদেনের সুযোগ দিতে পারি না। নিতে পারি না এধরনের লেনদেনের দায়।
সূত্র মতে, বন্ড সুবিধায় আনা শুল্কমুক্ত এসব কাঁচামাল গুদামে না এসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি ঢাকাসহ সংশ্লিষ্ট বাজারে চলে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও একশ্রেণীর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্কের বিষয়টি কাজে লাগাচ্ছেন ইলিয়াছ।
বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল ছাড়া দৃশ্যত তার বৈধ কোনো আয়-উপার্জন নেই জানিয়ে সূত্রটি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক সুরম্য দালান ও ফ্ল্যাট বাড়ি গড়ে তুলেছেন তিনি।
শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ও তদন্ত বিভাগ চট্টগ্রামের উপ পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, লিবার্টি গ্রুপ দীর্ঘ দিন ধরে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে অধিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে বন্ড লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করে দিচ্ছে। আমদানিকৃত কাঁচামাল যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও হিসাব রাখা বাধ্যতামূলক হলেও তিনি কখনোই তা করেন না। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের ফলে দেশের শিল্পায়ন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি এবং ১১ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির দায়ে ইতোমধ্যে লিবার্টির বিরুদ্ধে মামলা করে শুল্ক বিভাগ। বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি রপ্তানিযোগ্য ৪৬ কোটি টাকার পণ্য হাটহাজারীর চৌধুরীহাট এলাকায় অবস্থিত লিবার্টি এন্টারপ্রাইজ খোলা বাজারে বিক্রি করেছে। তারা বন্ড সুবিধায় ৪৬ কোটি টাকা মূল্যের ৩ হাজার ৫৬০ টন কাঁচামাল আমদানি করে। কিন্তু এসব কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়। এর মাধ্যমে প্রায় ১১ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেয় প্রতিষ্ঠানটি।’
এর আগে লিবার্টি গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ও বিজিবি পৃথকভাবে শুল্ক ফাঁকির দায়ে তার কারখানায় বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়েছিলো। এ ঘটনায় লিবার্টি গ্রুপের মালিক হাটহাজারীর বাসিন্দা ইলিয়াছ বিজিবির কাছ থেকে জব্দ মালামাল উদ্ধারের জন্য আদালতে মামলাও করেছিল।
এছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে ১৭ কোটি টাকা ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে লিবার্টি এক্সেসরিজের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা দায়ের করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। লিবার্টি এক্সেসরিজ এর আগেও ৩৪ কোটি টাকার পণ্যের ১২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ইলিয়াছের আরেক প্রতিষ্ঠান সানরাইজ এক্সসোসরিজের বিরুদ্ধেও কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির মামলা করে শুল্ক অধিদপ্তর।
টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লিবার্টি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইলিয়াছ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একুশেপত্রিকাডটকমকে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে খোলাবাজারে কাঁচামাল বিক্রির অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। একটি গ্রুপ ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বলে তিনি দাবি করেন।
এসব মিথ্যা হলে দুদক আপনার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে কেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুদক তদন্ত করলেই যে সবকিছু সত্য হয়ে যাবে তা নয়। আপনার বিরুদ্ধেও যদি দুদক তদন্তে নামে আপনি কি দুর্নীতিবাজ, অসৎ হয়ে হয়ে যাবেন- উল্টো প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন মোহাম্মদ ইলিয়াছ। পরক্ষণে প্রতিবেদককে ফোন করে এই পত্রিকার মালিক-সম্পাদক কে এবং কারা এই পত্রিকা চালান জানতে চান তিনি।
