শরীফুল রুকন: ঘরে টেলিভিশন রাখলে চাকরি হারানোর হুমকিতে আছেন হাটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসাসহ হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী পরিচালিত বিভিন্ন মাদ্রাসার শত শত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ।
ঘরে টেলিভিশন রাখাকে হাদিস পরিপন্থি উল্লেখ করে মাওলানা শফী ও তার মতাদর্শের মাওলানারা নানা জায়গায় ওয়াজ নসিহত করছেন।
তারা বলছেন, ‘হযরত মুহাম্মদ (সা.) হাদিস শরীফে স্পষ্টত উল্লেখ করেছেন, মুসলিম জাহানে তার আবির্ভাব হয়েছে বাদ্য-বাজনা, টেলিভিশন, সিনেমা-নাটক; এসবকে ধ্বংস করার জন্য। কাজেই এই হাদিস অমান্য করে কোন মুসলমান তার ঘরে টেলিভিশন ও বাদ্য-বাজনার যন্ত্রাংশ রাখলে সেই ঘরে আল্লাহর রহমত ও রাসূলের ঈমান থাকবে না। এটি গুরুত্বর শরীয়ত ও হাদিস পরিপন্থি।’
এই বয়ানের মধ্য দিয়ে রাসূলপ্রেমী মুসলমানদেরকে এসব থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে তার পরিচালিত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘরে টিভি না রাখার হুশিয়ার করে দিয়েছেন শাহ আহমদ শফী।
এ নির্দেশনার বাইরে গিয়ে অথবা অমান্য করে কোন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘরে টেলিভিশন রাখলে তাকে চাকরি হারাতে হবে। এই ঘোষণার কারণে তার প্রতিষ্ঠানের যারা দেশ-বিদেশের সংবাদ সম্পর্কে আপডেট খবর জানার জন্য ঘরে একটি টেলিভিশন রাখবেন মর্মে চিন্তা করেছেন বা মনস্থির করেছেন, তারা রীতিমত আতংকে আছেন। একইভাবে আতংকে অাছেন, ইতিমধ্যে যারা ঘরে টেলিভিশন রেখেছেন বা কিনেছেন তারাও।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা মেহেরিয়া মাদ্রাসায় গত ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বার্ষিক সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আহমদ শফী। সেখানে ধর্মীয় আলোচনায় তিনি এ বিষয়ে তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে নতুন করে কঠোর হুশিয়ারি দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মাদ্রাসার একজন শিক্ষক বলেন, হুজুরের নির্দেশ আমাদের কাছে শিরোধার্য্য। কোরআন-হাদিসের আলোকে হুজুরের এই নির্দেশ আমরা মানতে বাধ্য। এর বাইরে গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এ কথা হুজুর স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে ইসলামের জন্মস্থান সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা ইসলামী বিধান অনুযায়ী ফতোয়া দিয়ে এখনো পর্যন্ত টেলিভিশন দেখা নিষিদ্ধ করেননি। পবিত্র হজ্বের সময় বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে, যে কেউ শুনতে পান ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি। সেই সুমধুর ধ্বনি যেটা সুদূর সৌদি আরবের মক্কা থেকে বলা হয়। অনেক মুসলিম অত্যন্ত আগ্রহ ভরে হজ্বের এই অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখে থাকেন। হজ্বের দিন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ শুনতে শুনতে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলে হজ্ব পালনের বিভিন্ন দৃশ্যও দেখানো হয়।
এসব প্রসঙ্গটি তুলে জানতে চাওয়া হলে হেফাজতের চট্টগ্রাম মহানগরের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আ ন ম আহমদ উল্লাহ বলেন, ঘরে টেলিভিশন রাখলে চাকরি চলে যাওয়ার বিষয়টি সত্য। কারণ ঘরে টেলিভিশন রাখা শরীয়তসম্মত না। টেলিভিশনে যা কিছু প্রদর্শিত হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে সমাজে হাজারো অপকর্ম ও গুণাহের দ্বার উম্মুক্ত হচ্ছে। এর ফলে মুসলমানদের ঈমান নষ্ট হচ্ছে।
হেফাজত নেতা মাওলানা আ ন ম আহমদ উল্লাহ বলেন, আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে টেলিভিশনের মাধ্যমে মানুষ বিপথগামী হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে ঘরে টেলিভিশন না রাখার বিষয়ে অনেক আলেম ফতোয়া দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে জমিয়তুল ফালাহ্ জাতীয় মসজিদের খতিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের গভর্নর আল্লামা মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল কাদেরী বলেন, তিনি (হেফাজত আমীর আল্লামা শফি) চাকরি দিয়েছেন, তিনি যে কোন কারণে তা ফিরিয়েও নিতে পারেন। এ নিয়ে অামার কিছু বলা ঠিক হবে না।
ঘরে টেলিভিশন রাখা শরীয়তবিরোধী কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আসলে এ বিষয়টি নিয়ে আলেমরা বিভক্ত। ওনার (শফী হুজুর) পুরো বক্তব্য ও যুক্তি না দেখে এখনই আমি কোন মন্তব্য করতে পারছি না।
প্রসঙ্গটির ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, এটা কি শুনালেন! খবর দেখার জন্য সবচেয়ে সহজ মাধ্যম টেলিভিশন। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে টেলিভিশন চালু আছে। হজ্বের অনুষ্ঠান সৌদি আরবের টিভি চ্যানেলে দেখায়। নানা ইসলামী অনুষ্ঠান দেশের টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করছে। এই যুগে এসে, ঘরে টেলিভিশন না রাখার নির্দেশনা- এটা অকল্পনীয়।
