চট্টগ্রাম: কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী আত্মহত্যা করেছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে। ২০ নভেম্বর রাতে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর এ মৃত্যু নিয়ে চলেছিল ‘আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড’ বিতর্ক। কিন্তু সকল বিতর্কের অবসান ঘটলো দিয়াজের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর। এবার প্রশ্ন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এতবড় দায়িত্বে থেকে কেন দিয়াজ আত্মহননের পথ বেছে নিলেন?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক প্রভাবশালী এ নেতার আত্মহত্যার কারণ কী- তা নিয়ে একুশে পত্রিকা চালিয়েছে অনুসন্ধান। বলা হচ্ছে, আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নিতে দিয়াজকে প্রেমঘটিত জটিলতাই প্ররোচিত করেছে। চবির ছাত্র, শিক্ষক, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, দিয়াজের প্রতিবেশী, পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী এমনকি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাথেও একুশে পত্রিকা কথা বলেছে এ নিয়ে।
এতে বের হয়ে এসেছে গত দেড় বছরে দিয়াজকে নিয়ে ঘটে যাওয়া নানান বিষয়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে চবি ছাত্রলীগের কমিটি গঠন ও টেন্ডারবাজির বিষয়, তেমনি রয়েছে দিয়াজের সাথে চবি ছাত্রলীগ নেত্রী সায়মা জেরিন প্রিয়াংকার প্রেমঘটিত জটিলতা। আবার উঠে এসেছে ‘বাংলার মুখ’ নামে দিয়াজের গ্রুপের বিভিন্ন স্তরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নানান সমীকরণ। পাঠক, চলুন মিলিয়ে নেওয়া যাক এসব সমীকরণ!
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া টেন্ডারবাজি :
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ৭৫ কোটি টাকার একটি টেন্ডার নিয়ে শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি আলমগীর টিপু, সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী সুজনের সাথে দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর দ্বন্ধ শুরু হয়। টিপু-সুজন অবস্থান নেয় ঢাকার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে। দিয়াজ অবস্থান নেয় চট্টগ্রামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বঞ্চিত হওয়ায় দিয়াজের অনুসারীরা টেন্ডার শিডিউল কেনার শেষ দিন চবিতে অবরোধের ডাক দেয়। তবে অবরোধের ডাক দিয়ে তার অনুসারীরা কোনো কর্মসূচি পালন করেনি। কেন পালন করেনি, তাও স্পষ্ট হওয়া গেছে।
টেন্ডার শিডিউল কেনার শেষ দিন ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে ক্যাম্পাসের দুই নম্বর গেইট এলাকায় দিয়াজের বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা দিয়াজের সাথে টাকা নিয়ে দর কষাকষি করে। এক পর্যায়ে তারা দিয়াজের ‘বাংলার মুখ’ ও সহ সভাপতি রেজাউল করিম, এনামুল হক অভি, রাশেদ হোসাইন ও উপ দফতর মিজানুর রহমান বিপুলের গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ‘ভিএক্স’র জন্য ২৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ টাকা থেকে ‘বাংলার মুখ’র জন্য ১০ লাখ, ভিএক্স গ্রুপের জন্য ১০ লাখ এবং দিয়াজের জন্য ৫ লাখ টাকা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এর বিনিময়ে দিয়াজের বাংলার মুখ ও ভিএক্স গ্রুপের কেউ ঢাকার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ড চালাবে না বলে কথা হয়। কিন্তু দিয়াজ তাদের জানায়, মৌখিক প্রতিশ্রুতি তিনি মানবেন না। ২৫ লাখ টাকার চেক দিতে হবে। তবেই তিনি তার গ্রুপকে ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখবেন। অভিযোগ উঠে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দিয়াজের কথামতো তাকে ২৫ লাখ টাকার চেক দিয়ে দেয়। এবং টেন্ডারের কার্যাদেশ ওই প্রতিষ্ঠান পেলেই এই চেকের টাকা ক্যাশ করা হবে বলে বৈঠকে সমঝোতা হয়। টেন্ডারের ভাগ নিয়ে দর কষাকষি ও চেক নিয়ে সন্তুষ্ট হতে হতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায় সেদিন।
এদিকে দিয়াজ যখন ঢাকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকার চেক নিয়ে সমঝোতা করছিল, অন্যদিকে তখন দিয়াজের অনুসারীরা চট্টগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে টেন্ডার শিডিউল কিনতে চবি প্রকৌশল দফতরে হাজির হয়। এ সময় চবি ছাত্রলীগের সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুন ওরফে ক্রীড়া মামুন, ভিএক্স গ্রুপের নেতা সহ সভাপতি রাশেদ হোসাইন, এনামুল হক অভির সাথে চবি প্রকৌশল দফতরে সভাপতি আলমগীর টিপু ও সাধারণ সম্পাদক সুজনের অনুসারীদের মধ্যে হয়ে যায় মারামারি। দিয়াজের অনুসারী মোহাম্মদ মামুন, ভিএক্স গ্রুপের নেতা রাশেদ হোসাইন মারধরের শিকার হন। মারধরের শিকার হওয়ায় তারা চট্টগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শিডিউল কিনতে পারেনি। কিন্তু দিয়াজ ২৫ লাখ টাকার চেক নিয়ে ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছ থেকে সমঝোতা করে ফিরে আসে। সেদিন রাতে ক্রীড়া মামুনের সাথে ২৫ লাখ টাকার চেক নিয়ে দিয়াজের কথা কাটাকাটি হয়। মামুন ও সহ সভাপতি মোহাম্মদ নাজিম সে সময় দিয়াজকে জানান, ১০ লাখ টাকা নিয়ে তাদের গ্রুপের দেড়-দুইশ’ কর্মীর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। এই চেকের টাকা মামুন ও নাজিম নেবে না।
দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হওয়ার পরদিন তার মামা রাশেদ বিন আমিন সেই ২৫ লাখ টাকার কথা গণমাধ্যমকর্মীদের জানান। পরিবারের পক্ষ থেকে টেন্ডারবাজির এ প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার কারণেই দিয়াজের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে, দিয়াজ করেছে আত্মহত্যা।
ওরা আমার কথা শুনছেনা! :
৭৫ কোটি টাকার শিডিউল কেনার শেষ দিন চবি প্রকৌশল দফতরে মারধরের শিকার হন দিয়াজের অনুসারী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুন। সভাপতি আলমগীর টিপুর অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি তায়েফুল হক তপুর বিরুদ্ধে মামুনকে মারধরের অভিযোগ উঠে। তার একদিন আগে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার সময় সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুন সাংবাদিকদের কাছে তপুর বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ তুলে। এ নিয়ে তপু ও মামুনের মধ্যে দ্বন্ধ তৈরি হয়। পরে চট্টগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে টেন্ডারের শিডিউল কিনতে গেলে তপুর হাতে মার খেতে হয় মোহাম্মদ মামুনকে। গত ২৯ অক্টোবর এ ঘটনার ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে তপুকে কুপিয়ে আহত করা হয়। অভিযোগ উঠে, এ ঘটনায় অংশ নেয় মোহাম্মদ মামুন, আরেক সহ সভাপতি মোহাম্মদ নাজিম, যুগ্ম সম্পাদক সুমন কান্তি, পাঠাগার সম্পাদক আবু বকর তোহা, আইন সম্পাদক আবু সাইদ মারজানসহ দিয়াজের ১০-১৫ জন অনুসারী। আশংকাজনক অবস্থায় তপু দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এরপর দিয়াজসহ ১২ জনের নামে হত্যা প্রচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয় হাটহাজারী থানায়। আবার তপুর উপর হামলার ‘প্রতিশোধ’ নিতে চবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দিয়াজ, মোহাম্মদ মামুন, মোহাম্মদ নাজিম ও তোহার বাড়ি-ঘরে হামলা চালায়।
এরপর থেকে দিয়াজ হতাশ হয়ে পড়ে। হতাশ হওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, তপুর উপর হামলার বিষয়ে দিয়াজের কোনো কিছু জানা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি ও সাংবাদিকদের দিয়াজ বারবার বলেছে, ‘তপুর উপর হামলা করার সিদ্ধান্ত আমি জানি না। জুনিয়রদের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে আমার। মামুন ও নাজিম জুনিয়রদের দিয়ে তপুকে এভাবে আহত করেছে। তাদের দায়িত্ব আমি নেব না।’ দিয়াজ এ সময় সাংবাদিকদের আরও বলেছিলেন, ‘৭৫ কোটি টাকার টেন্ডার টিপু-সুজন হাতিয়ে নিয়েছে। আমার টার্গেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ৫১ কোটি টাকার নতুন টেন্ডারটা। ওটা নিতে হবে। এ সময় আমি যদি তপু কিংবা কাউকে মারতে যাই আসল কাজটাই আদায় হবে না। টাকা না থাকলে ভবিষ্যতে রাজনীতি করা যাবে না। পরিবারকেও কিছু দেওয়া যাবে না। কিন্তু আমার এ পরিকল্পনা মামুনরা মানতে চায়নি। তারা তপুকে এমনভাবে কুপিয়েছে যা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে সম্ভব না। তাই আজ তাদের জন্য আমি মামলার আসামী। ক্যাম্পাসে কোণঠাসা। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলে দিয়েছি মামুনদের দায়িত্ব আমি আর নেব না। আমি বলির পাঠা হবো কেন তাদের জন্য? ওরা আমার কথা শুনছে না।’
এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৬ মিনিটে দিয়াজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। সেই স্ট্যাটাসে দিয়াজ লিখেন, ‘বলির পাঠা… এই সময়ে এসে খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি এর প্রকৃত অর্থ…’ এ ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুন ও মোহাম্মদ নাজিমের সাথে দিয়াজের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। মামুনের সাথে দিয়াজের এমন খারাপ সম্পর্ক- এই আত্মহত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
একটি স্ট্যাটাস থেকে স্পষ্ট হয় গ্রুপের ফাটল :
গত ১১ নভেম্বর রাত ৭টা ৫২ মিনিটে দিয়াজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর আমি একজন সাবেক শিক্ষার্থী। চবির সাথে আমার সম্পর্ক এটাই। চবির রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে আমার সাথে কেউ যোগাযোগ না করার অনুরোধ রইলো, করলে ব্লেকলিস্টে ঢুকবেন। আমায় আমার মত করে ভাল থাকতে দেন, সবাই ভাল থাকুন।’
দিয়াজের অনুসারী কিছু জুনিয়র জানান, এই স্ট্যাটাস দেওয়ার পর দিয়াজের অনুসারী সিনিয়ররা জুনিয়রদের নানাভাবে দিয়াজের বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপাতে থাকে। মামুনসহ কয়েকজন সিনিয়র বলে বেড়াতে থাকেন, ‘দিয়াজকে নেতা বানাতে গিয়ে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি। সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি। টিপুর সাথে ফাইট করেছি সবসময়। আজ যখন আমরা মামলা খেয়ে ক্যাম্পাস থেকে আউট, তখন দিয়াজ বেঈমানি করছে। সে ২৫ লাখ টাকার চেক নিয়েছে আমাদের বিক্রি করে। এখন সে চবির রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে প্রতারণা করেছে।’
সিনিয়রদের এসব কথা জুনিয়রদের মধ্যে খুবই প্রভাব ফেলে। জানা গেছে, দিয়াজের প্রায় দেড় শতাধিক অনুসারী রয়েছে। যার মধ্যে চবি ছাত্রলীগের ২৬১ জনের কমিটির ৪১ জনই দিয়াজের অনুসারী। মোট কথা, চবির সবচেয়ে বড় গ্রুপটি দিয়াজের। সেই গ্রুপে গত এক মাসের মধ্যে ধরে যায় ফাটল। কিছু অনুসারী চলে যায় সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুন ও মোহাম্মদ নাজিমের পক্ষে। আর বেশির ভাগ অনুসারী চলে যায় দিয়াজের অনুসারী চবি ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম জিসানের পক্ষে। তপুর উপর হামলার পর থেকে জুনিয়ররা নিজেদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হওয়ার পেছনে দিয়াজের ‘প্রতারণা’কে দায়ী করতে থাকে। এবং তাকে ওই ২৫ লাখ টাকার চেকটির ভাগ দিয়ে দিতে চাপ দিতে থাকে জুনিয়ররা। এ সময় দিয়াজ জুনিয়রদের জানান, বাড়াবাড়ি করলে চেকের এক পয়সাও কেউ পাবে না। একপর্যায়ে দিয়াজ চেক নিয়ে নিজের গ্রুপের সদস্যদের রোষানলে পড়ে যান প্রকাশ্যে। যা দিয়াজের জন্য অপমানজনক। এ বিষয়টিও দিয়াজের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছে চবি সংশ্লিষ্টরা।
ঘরে ছাত্রলীগের হামলা, পরিবারের চাপ :
তপুর উপর হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দিয়াজের ঘরে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ভাঙচুর করা হয় ঘরের আসবাবপত্র, মূল্যবান টিভি-ফ্রিজ। এ সময় দিয়াজের মায়ের স্বর্ণ এবং নগদ টাকাও লুট করা হয় বলে অভিযোগ করে দিয়াজের মা। দিয়াজের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার ফলাফল হিসেবে ঘর-বাড়ি লুট হয়েছে। মা ও বোনদের সম্মানহানি হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে দিয়াজের মা ও বোনদের পক্ষ থেকে দিয়াজের উপর একটি চাপ ছিল। এই ক্ষতি অপূরণীয়। ফলে দিয়াজ মানসিকভাবে ভেঙে পরে। ফেসবুকে তার ৪ নভেম্বর ও ১১ নভেম্বরের স্ট্যাটাসটি এই ভেঙে পড়ার বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী হয়েছিল দিয়াজের সাথে প্রিয়াংকার?
১৯ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে শেষ হয় চবি সুবর্ণজয়ন্তীর কনসার্ট। ওইদিন ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর সাথে দিয়াজও মদ পান করেন। রাত ১১টার দিকে গার্লফ্রেন্ড সায়মা জেরিন প্রিয়াংকাকে নিয়ে ভাটিয়ারীর পথে রওনা দেন দিয়াজ। এ সময় ওই গাড়িতে প্রিয়াংকার এক বান্ধবী ও তার বয়ফ্রেন্ডও ছিল। ওই রাতে দিয়াজের সাথে প্রিয়াংকার এমন কিছু হয়, যা নিয়ে তাদের সম্পর্কে তৈরি হয় ফাটল।
প্রিয়াংকার বান্ধবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ ঘটনার জের ধরে পরদিন ২০ নভেম্বর প্রিয়াংকা নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার কাছে দিয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এই অভিযোগ পেয়ে আওয়ামী লীগের ওই নেতা রেগে গিয়ে দিয়াজকে ফোন করেন। এবং প্রিয়াংকা দিয়াজের সাথে তার ওই রাতের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দিয়াজের বড় বোনকেও অবহিত করেন। এ নিয়ে ২০ নভেম্বর সকাল থেকে দিয়াজ ঘরের মধ্যে শুরু করে অস্বাভাবিক আচরণ।
স্থানীয় লোকজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা গেছে, ২০ নভেম্বর সকালে দিয়াজ তার নিজ হাত-পা কেটে ফেলার চেষ্টা চালায়। এ সময় প্রতিবেশী ও দিয়াজের অনুসারী কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে বাসায় ডেকে আনেন তার মা জাহেদা আমিন। তারা দিয়াজকে বুঝিয়ে শান্ত করে ফিরে যান। এরপর দিয়াজ বিশ্ববিদ্যালয় দুই নম্বর গেইট এলাকার একটি দোকান থেকে দড়ি কিনে নিয়ে যান। হাতে দড়ি দেখে দিয়াজের মা প্রতিবেশী ও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে আবার বাসায় ডেকে আনেন। তারা দিয়াজের কাছ থেকে দড়ি কেড়ে নেয়। এবং তাকে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারা বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর দিয়াজ আবারও তার মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করেন, তার কক্ষের জিনিসপত্র তছনছ করা শুরু করেন। মায়ের সাথে ঝগড়ার সময় দিয়াজ তার মোবাইল ফোনটিও ফ্লোরে ছুঁড়ে ভেঙে ফেলেন। একপর্যায়ে সন্ধ্যার দিকে তার মা বাসা থেকে বের হয়ে যান। রাত সাড়ে আটটার দিকে ফ্ল্যাটের বারান্দার জানালা দিয়ে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান প্রতিবেশীরা। এরপর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে লাশ উদ্ধার করে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রিয়াংকার সাথে সেদিন রাতে কী হয়েছিল দিয়াজের? যার কারণে দিয়াজের লাশ দেখতে চবি ছাত্রলীগের নারী নেত্রীদের সকলেই গেলেও শুধুমাত্র দেখা যায়নি প্রিয়াংকাকে। ঘটনার পর থেকে ডিঅ্যাকটিভ রয়েছে প্রিয়াংকার ফেসবুক আইডি। বন্ধ রয়েছে মোবাইল ফোন। সব ঘটনার উপরে সংশ্লিষ্টরা, প্রিয়াংকার নগর আওয়ামী লীগ নেতার কাছে দিয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়াকেই তার আত্মহত্যার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন। প্রসঙ্গত, দিয়াজের হাত ধরেই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপ ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক পদে আসেন সায়মা জেরিন প্রিয়াংকা।
চেক হাতে পাওয়ার পর গ্রুপের দায়িত্ব নিচ্ছিলেন না দিয়াজ :
টেন্ডারের সমঝোতা হয়ে যাওয়ার পর ২৫ লাখ টাকার চেক হাতে পেয়ে দিয়াজ গ্রুপের কর্মীদের সাথে দায়সারা আচরণ দেখাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। কারণ টেন্ডারের ঘটনায় তপুর উপর সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুন ও মোহাম্মদ নাজিমের নেতৃত্বে হামলার ঘটনায় দিয়াজের সম্পৃক্ততা ছিল না বলে তিনি সকলকে জানিয়ে আসছিলেন। আবার তপুর উপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার দুই নম্বর আসামী করা হয় দিয়াজকে। ৫ নভেম্বর ও ১১ নভেম্বর দিয়াজের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে নেতাকর্মীদের ধারণা হয়, ২৫ লাখ টাকার চেক পেয়ে দিয়াজ তাদের দায়িত্ব নেবেন না। পরে তারা দিয়াজকে বাদ দিয়ে দুইগ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হঠাৎ করেই একা হয়ে পড়ে দিয়াজ। নিজ গ্রুপের সাথে দ্বন্ধ, প্রেমিকার সাথে সম্পর্কের তিক্ততা, আওয়ামী লীগ নেতার কাছে দিয়াজের বিরুদ্ধে প্রেমিকার অভিযোগ, পরিবারের কাছে ছোট হওয়ার মতো কারণ তৈরি হওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন দিয়াজ।
এদিকে ২৫ লাখ টাকার চেক নিয়ে দিয়াজের সাথে আপনার সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল কিনা- এমন প্রশ্ন করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি মোহাম্মদ মামুনকে। তিনি বলেন, ‘দিয়াজের সাথে কোনো সময় আমার খারাপ সম্পর্ক ছিল না। যারা আপনাকে (প্রতিবেদক) এসব তথ্য দিয়েছে, তারা কারা ও তাদের উদ্দেশ্যে কী- তা আমি জানি। দিয়াজকে খুন করা হয়েছে। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা লেখা হয়েছে।’
দিয়াজের সাথে ছাত্রলীগ নেত্রী প্রিয়াংকার সম্পর্ক থাকা ও পরে সম্পর্কে ফাটল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামুন বলেন, ‘আপনার অফিস কোথায় বলুন, এটা কি আপনার পার্সোনাল নাম্বার। আপনার সাথে আমি এখনই দেখা করতে চাই।’
আপনার যা বলার দয়া করে এখনই বলুন- মুঠোফোনে প্রতিবেদকের এমন বক্তব্যের পর মামুন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার নিয়ে নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছে। এসব নিয়ে লিখেছেন কিনা বলুন। দিয়াজের সাথে আমার কেমন সম্পর্ক ছিল, তা আগে ভালোভাবে জেনে তারপর এ নিয়ে প্রশ্ন করুন।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি আলমগীর টিপু বলেন, ‘দিয়াজ আমার বন্ধু, সহযোদ্ধা ছিল। সে ছাত্রলীগের সম্পদ ছিল। কী কারণে তার আত্মহত্যা- তা বলতে পারছি না। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত, মর্মাহত।’
টেন্ডারের চেক নিয়ে নিজের গ্রুপের নেতাকর্মীদের সাথে দিয়াজের বিরোধ সৃষ্টি হয়- বিষয়টি জানতেন কিনা প্রশ্নে আলমগীর টিপু বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কে, কী করে বেড়াচ্ছে, সেটা দেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। কী কারণে সে আত্মহত্যা করতে পারে- তাও জানি না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বলেন, ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আত্মহত্যা আসায় এ ঘটনার সাথে টেন্ডার ও গ্রুপিংকে জড়ানোর সুযোগ নেই। দিয়াজের পরিবার দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত চাইলে তার পরিবারের দাবির সাথে ছাত্রলীগ একমত রয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো সহযোগিতার দরকার হলে আমরা তা করবো।’
