চট্টগ্রাম: টেন্ডারবাজির ২৫ লাখ টাকার চেক নাকি মা জাহেদা আমিনের কাছ থেকে ছাত্রলীগ নেতা ও শিক্ষকের দাবিকৃত দুই লাখ টাকা চাঁদা- কোনটিকে সত্য ধরে দিয়াজ ‘হত্যা’ মামলার তদন্ত হবে?
দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি আদালতে অভিযোগ দায়ের করে তার মা জাহেদা আমিন চৌধুরী।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মায়ের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলয়ের সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল মনসুর জামশেদ, বর্তমান সভাপতি আলমগীর টিপুসহ ১০ জন দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা না দিলে তারা দিয়াজকে হত্যারও হুমকি দিয়ে আসছিল।
দুই লাখ চাঁদার টাকা পরিশোধ না করায় দিয়াজের ঘরে গত ৩১ অক্টোবর রাতে লুটপাট চালিয়েছিল টিপুরা। এমন দুস্কর্মের ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাসহ ১০ জন মিলে হত্যা করেছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিবলু কুমার দে’র আদালতে দিয়াজের মা জাহেদা আমিনের দায়ের করা অভিযোগে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।
অথচ দিয়াজের মৃত্যুর পরদিন দিয়াজের মামা রাশেদ বিন আমীন, দিয়াজের বড় বোন অ্যাডভোকেট জুবা্ইদা ছরওয়ার নিপার স্বামী ছরোয়ার আলম দাবি করেছিলেন, টেন্ডারের সমঝোতার ২৫ লাখ টাকার চেকের টাকা পরিশোধ না করতেই ছাত্রলীগের একটি অংশ দিয়াজকে হত্যা করেছে।
এ সময় তার মা জাহেদা আমীনসহ পরিবারের সদস্যরা হত্যার অভিযোগ তুলে ২৫ লাখ টাকার টেন্ডারসহ ছাত্রলীগের গ্রুপিংকে দায়ী করেছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবারের মামলায় টেন্ডারবাজির ২৫ লাখ টাকার চেকের কথা এড়িয়ে গিয়ে ‘দুই লাখ টাকা চাঁদা’র কথা উল্লেখ করায় দিয়াজের মৃত্যুর কারণ নিয়ে খোদ প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছে তার পরিবারের সদস্যরাই।
এখন প্রশ্ন, ২৫ লাখ টাকার চেক নাকি মা জাহেদা আমিনের কাছ থেকে দাবিকৃত দুই লাখ টাকা চাঁদা- কোনটিকে সত্য ধরে দিয়াজ ‘হত্যার’ তদন্ত হবে?
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি, বর্তমান ছাত্রলীগ সভাপতি, সিনিয়র সহ সভাপতি মনসুর আলম, সহ সভাপতি আবদুল মালেক, যুগ্ম সম্পাদক আবু তোরা পরশ, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সভাপতি আলমগীর টিপুর ভাই মোহাম্মদ আরমান, দিয়াজের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক রাশেদুল আলম জিসান, আপ্যায়ন সম্পাদক মিজানুর রহমান, সদস্য আরেফুল হক অপু এবং অজ্ঞাত নামা আরও কয়েকজন মিলে দিয়াজের মায়ের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবির যৌক্তিকতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
এ প্রসঙ্গে অভিযোগের আসামী ও চবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক আবু তোরাব পরশ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সভাপতিসহ দশ জন মিলে দুই লাখ টাকা যদি দাবি করে থাকি তাহলে এক জনের ভাগে পড়বে বিশ হাজার টাকা। আবার দীর্ঘদিন ধরে আমরা সবাই মিলে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসলেও মৃত্যুর আগে দিয়াজ কিংবা তার পরিবারের কেউ এ অভিযোগ কাউকে কেন করেননি?’
পরশ আরও বলেন, ‘তাদের ঘরে লুটপাটের অভিযোগে যে মিথ্যা মামলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে হাটহাজারী থানায়, সে মামলায়ও দিয়াজের মায়ের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবির কোন তথ্য উল্লেখ নেই। তাই আমার মনে হয়, আত্মহত্যার পর সহকর্মী দিয়াজের শোক সন্তপ্ত পরিবারকে ব্যবহার করে কেউ নোংরা ফায়দা নিতে শিক্ষক ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের চরিত্রহননের চেষ্টা করছে।’
দিয়াজের বোন ও বাদিপক্ষের আইনজীবি অ্যাডভোকেট জুবাইদা ছরওয়ার চৌধুরী বলেন, ‘দিয়াজের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা উল্লেখ করে বুধবার যে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে, তার সাথে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার করা সুরতহাল রিপোর্টের কোন মিল নেই। আমরা আবার ময়নাতদন্ত দাবি করছি।
তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের ব্যক্তিগত কোন হতাশা ছিল না। হত্যার আগেরদিন দিয়াজ চবির সুবর্ণজয়ন্তীতে সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করেন। তার হত্যার বিষয়টি আমরা না জানার আগেই কিছু গণমাধ্যমে তা আত্মহত্যা বলে প্রচারিত হয়। দিয়াজের রুমের বাইরে বেলকনির সাথে থাকা মই ব্যবহার করে হত্যাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে বেলকনির ওই দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আসামীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী দন্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত অভিযোগ অনুসন্ধান করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছে।
