উভয় সংকটে রোহিঙ্গারা

Myanmar Suu Kyi Silenceচট্টগ্রাম: ‘মংডুতে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে। অবিবাহিত মেয়েদের ধরে ধর্ষণ করছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। তিনি বেঁচে আছেন কি না, জানি না। তাই প্রাণের ভয়ে নৌকায় টেকনাফে পালিয়ে এসেছি। ওই নৌকায় আরও ১৮ রোহিঙ্গা নারীশিশু ছিল। সবাই এই ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছি।’

শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে বসে স্থানীয় সাংবাদিকদের এসব কথা বলছিলেন মদিনা বেগম (২৬)। তার বাড়ি মায়ানমারের মংডুর কাউয়ারবিল গ্রামে।

শুধু মদিনা নন; নিজের দেশের শাসকের অমানবিক নির্যাতন নির্যাতনে টিকতে না পেরে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। মানবিক বিপর্যয়ে পড়ে তারা যখন বাংলাদেশমুখী তখন তাদের পড়তে হচ্ছে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে। নাফ নদীতে রোহিঙ্গা বোঝাই অনেক নৌকা বিজিবির সতর্ক প্রহরার কারণে প্রবেশ করতে পারছে না। অনুপ্রবেশের চেষ্ঠায় থাকা রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। নাফ নদীর উভয় পাড়ের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের কান্নায়। উভয় সংকটে পড়ে বেঁচে থাকা রোহিঙ্গারা এখনো জানে না, তাদের কপালের ভাগ্য লেখনে আর কি কি লেখা রয়েছে!

প্রসঙ্গত গত অক্টোবরে মিয়ানমারের এক পুলিশ চেকপোস্টে অতর্কিত হামলায় ৯ পুলিশ নিহতের পর এ ঘটনায় রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক রয়েছে অভিযোগ তুলে রাখাইন ও মংডু প্রদেশে সেনা-পুলিশের অভিযান শুরু হয়। প্রায় দুই মাস ধরে চলা ওই অভিযানে মংডু ও রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যা, মহিলা ও কিশোরীদের ধর্ষণ, তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।

নিজের দেশের এমন নির্যাতন সইতে না পেরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় আছে রোহিঙ্গারা। টেকনাফের সাবরাং, জালিয়াপাড়া, নাইট্যপাড়া, দমদমিয়া ও জাদিমুরা সীমান্ত বরাবর নাফ নদীতে দিনের বেলায় রোহিঙ্গা বোঝাই বেশকিছু নৌকা ভাসতে দেখছেন স্থানীয়রা। তারা নিজ দেশে ফিরে গেলে হামলার শিকার হবেন। সেই ভয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে দিনে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সতর্ক প্রহরার কারণে নদীপথে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু স্থানীয় দালাল চক্রের সহায়তা নিয়ে রাতের আঁধারে জলপথ ও স্থলপথে শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে বলে জানা গেছে।

ইতিমধ্যে উনছিপ্রু, ওয়াব্রাং, লেদা, জাদিমুরা ও উখিয়ার বালুখালী ও তমব্রু সীমান্তবর্তী পয়েন্ট দিয়ে বেশকিছু রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এই দুই উপজেলার পাহাড়-জঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থানে আগে থেকেই বসবাসরত রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কেউ কেউ টেকনাফের লেদা ও উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে ঢুকে পড়ছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কতজন এভাবে প্রবেশ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারছে না।

এদিকে পুলিশ জানতে পেরেছে, টেকনাফ এবং উখিয়ার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থানকারী ৪০ জন দালালের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এরমধ্যে ২৫ জন বাংলাদেশি আর বাকিরা মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমার সীমান্তে প্রতিজন রোহিঙ্গার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সীমান্তে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে এসব দালালরা।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ থানার ওসি আবদুল মজিদ বলেন, ‘দালালরা টাকার বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে নৌকায় তুলে দিচ্ছে। এরপর রাতের অন্ধকারে সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে। এ ধরনের কর্মকান্ডে জড়িত ১০জনের বেশী দালালকে আমরা গ্রেফতার করেছি। এছাড়া ৪০ জন দালালকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবারের নাইক্ষ্যংছড়িতে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে টেকনাফ ও উখিয়ার দুটি শিবিরে নিবন্ধিত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করলেও এর বাইরে আরও কয়েক লাখ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা এসব এলাকায় বসবাস করছে।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফের বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীর প্রায় ৬৩ কিলোমিটার জলপথ সীমান্তজুড়ে বিজিবি টহল রয়েছে। তবে দুর্গম কিছু পয়েন্টে বিজিবির সার্বক্ষণিক টহল থাকে না, রাতের বেলায় এসব পয়েন্ট দিয়ে কিছু রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটছে। তবে এসব রোহিঙ্গার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি আমরা।’