বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

শেষ বয়সে আবারও কপাল খুলছে মোছলেমের, হতে পারেন মন্ত্রী!

প্রকাশিতঃ রবিবার, জানুয়ারি ১৯, ২০২০, ৩:৫৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নয়, নয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কিংবা ব্যাংকের বড় বড় দায়িত্ব। সব ছাপিয়ে জীবনে একটিবার এমপি হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন মনের ঈষাণ কোণে। জাসদ একাংশের প্রয়াত সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের শূন্য আসনে উপ নির্বাচন করে ৭৩ বছর বয়সে সেই স্বপ্ন মুঠোবন্দী করলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য, চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোছলেম উদ্দিন আহমেদ।

এমপিতেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন তিনি; বলছেন ‘বঙ্গবন্ধু-কন্যার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। পড়ন্ত বেলায় তিনি আমাকে এমপি হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আমার আর কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার নেই। এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সেবা করেই বাকি ক’টা বছর কাটিয়ে দিতে চাই।’

মোছলেম উদ্দিন হয়তো জানেন না তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে আরো বড় সংবাদ, চমকপ্রদ কিছু। ‘সংসদ সদস্য’ পদের পর তার ভাগ্যতিলকে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘মন্ত্রী’র পালক। এমনটাই আভাস মিলছে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোচনায়।

সূত্র মতে, শনিবার প্রকাশিত হয়েছে সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিনের নামে সরকারি গেজেট। গেজেট প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যেই শপথ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসেবে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দীন আহমেদকে শপথ পড়াবেন। শপথ নিয়েই তিনি যোগ দেবেন সংসদের চলতি শীতকালীন অধিবেশনে, যেটি জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, নানা বিবেচনায় মন্ত্রী হিসেবে মোছলেম উদ্দিনের নাম আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছে। সারাদেশের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য, সাহচর্য পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতার সংখ্যা বর্তমানে ১০-১৫ জনের বেশি নয়। এরমধ্যে চট্টগ্রামে আছেন দুইজন। একজন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, অপরজন মোছলেম উদ্দিন আহমেদ।

প্রয়াত আতাউর রহমান খান কায়সার, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, এম এ মান্নান, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনদের সম কাতারের রাজনীতিক মোছলেম উদ্দীন। উল্লেখিত নেতারা দলীয় পদ-পদবীর বাইরে রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী-এমপি, মেয়র সবই হয়েছেন, পেয়েছেন অনেক কিছুই। এমনকি তাদের সন্তানরাও এখন মন্ত্রী-এমপি, বড় বড় পদপদবীর মালিক।

তবে এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য, স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রাপ্তির ঝুলি সবচেয়ে বড়। দলীয় মনোনয়নে ৬ বার সংসদ সদস্য, দুবার মন্ত্রী, তিনবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘স্বাধীনতা পদক’সহ অনেক কিছুই পেয়েছেন।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া জীবিত নেতাদের মধ্যে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত দলীয় পদ-পদবীর বাইরে তেমন কিছু পাননি প্রবীণ নেতা মোছলেম উদ্দিন আহমেদ।

এসব বিবেচনায় তৃণমূল থেকে উঠে আসা আওয়ামী রাজনীতির পরীক্ষিত, একনিষ্ঠ মুজিব সৈনিক মোছলেম উদ্দিনের নাম মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

মোছলেম উদ্দিন আহমেদ আশৈশব মুজিব-আদর্শের কর্মী।  মেধা, মনন, সাহসিকতা আর দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মোছলেম উদ্দিন আহমেদ স্কুলজীবন থেকেই প্রতিনিয়ত রাজপথের ধুলো মাখিয়েছেন শরীর জুড়ে। তিনি ছিলেন ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলের অগ্রভাগের বিপ্লবী। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সমাবেশে কিংবা ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে ছিল মোছলেম উদ্দিনের সক্রিয় অংশগ্রহণ। মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় সংগঠকের ভূমিকা পালনের পাশাপাশি বাংলার স্বাধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে মোছলেম উদ্দিন বীর চট্টলার একটি অনন্য সাহসী নাম। বিশেষ করে কালুরঘাট সেতু এলাকায় পাকবাহিনীকে পরাস্ত করার ইতিহাস আলোচনায় এলেই মুক্তিযোদ্ধা মোছলেম উদ্দিন আহমেদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের বিষয়টি উঠে আসে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে।

মৌলভী সৈয়দ, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলে ৭ মাস কারাবাস করা মোছলেম উদ্দিন ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাক্কালে মোছলেম উদ্দিন ছাত্রদের সংগঠিত করতে কাজ করেছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। ১৯৭০ সালে তিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম শহর শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বোয়ালখালী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদদের। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

আওয়ামী রাজনীতির বর্ণাঢ্য, এখনো জীবিত ‘চরিত্র’ মোছলেম উদ্দিন আহমেদের এসব অবদান তাঁর এমপি হওয়ার পর থেকে সরকার ও দলের উচ্চপর্যায়ে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এসব কারণেই মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে মোছলেম উদ্দিনের। আর তাই যদি হয়, চট্টগ্রামবাসী মন্ত্রী হিসেবে পেতে যাচ্ছে আপাদমস্তক একজন রাজনীতিককে।

সূত্র মতে, ৭ জানুয়ারি সরকারের একবছর পূর্তি উপলক্ষে মন্ত্রীসভায় রদবদলের কথা ছিল। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, মুজিববর্ষের ক্ষণগণনার প্রস্তুতি-ইত্যকার ব্যস্ততায় মন্ত্রীসভার রদবদল না হলেও জানুয়ারির শেষে অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতে মন্ত্রীসভার রদবদল অনেকটা নিশ্চিত। সেই রদবদলে মন্ত্রীসভায় নবীন সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো ‘ইন’ করতে পারেন মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। সে যাত্রায় মন্ত্রীসভায় স্থান না হলে আগামী প্রায় চার বছর মেয়াদের যে কোনো সময় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ নেতা মোছলেম উদ্দিন মন্ত্রী হবেন সেটা একপ্রকার নিশ্চিত।

টেলিফোনে কথা হলে মোছলেম উদ্দিন আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু-কন্যার কাছে আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তিনি আমাকে এমপি বানিয়েছেন তাতেই আমি খুশি, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি যখন যে অবস্থায় কাজ করতে বলবেন বা দায়িত্ব দিবেন সেই দায়িত্ব শিরোধার্য ভেবে পালন করতে আমি বদ্ধপরিকর।’

একুশে/এটি