রিপোর্টারের ডায়েরি : নুরুল ইসলাম বি.এসসি’র মন্ত্রী হওয়ার গল্প

bsc-picআজাদ তালুকদার : জাতীয়পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি নুরুল ইসলাম বি.এসসি। আর এটি পেতে দীর্ঘ এক বছর আট মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে রাজনীতি থেকেই যখন বিদায় নেওয়ার কথা ভাবছেন তখনই ত্যাগের স্বীকৃতি পান বি.এসসি। পেশাগত কারণে জনাব বি.এসসি’র এই ত্যাগ, স্বীকৃতি কিংবা মন্ত্রী হওয়ার গল্প খুব কাছ থেকে দেখা এবং জানার সুযোগ হয়েছিল আমার। একুশে পাঠকদের জন্য সে গল্পটিই আজ তুলে ধরতে চাই।

১৯৯১, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নিবাচনে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী আসন থেকে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যথাক্রমে বিএনপির প্রয়াত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মোরশেদ খানের কাছে পরাজিত হন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বি.এসসি। ২০০১ সালেও মনোনয়ন চান। কিন্তু মনোনয়ন দেওয়া হয় দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সহ সভাপতি কুয়েতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত এসএম আবুল কালামকে।

এরপর ২০০৮ এর নির্বাচন আসলে নুরুল ইসলাম বি.এসসি মনোনয়ন চান চট্টগ্রামের প্রেস্টিজিয়াস আসন কোতোয়ালী থেকে। এক্ষেত্রে বেঁকে বসেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তৃণমূল নেতাদের দেয়া ভোটবাক্স সরিয়ে ফেলাসহ নানা কৌশল করেও বি.এসসির মনোনয়ন ঠেকাতে পারেননি তিনি। চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভ করেন বি.এসসি।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আসেন রাজনীতির মাঠে ‘শিশু’ খ্যাত ইলিয়াছ ব্রাদার্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামসুল আলম। শুরুতে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চান তিনি। ব্যর্থ হয়ে বিএনপির তরীতে উঠে যান, রাতারাতি পেয়ে যান ধানের শীষ প্রতীক।

আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়া এবং সেই একই ব্যক্তি পরক্ষণে বিএনপি থেকে মনোনয়ন ভাগিয়ে নেওয়া-এই বিষয়গুলোকে তখন ভালোভাবে নিতে চাননি সচেতন মানুষ। তাদের বক্তব্য- এখানে আদর্শ, ভালোবাসা আর কমিটমেন্ট বলতে কিছু নেই। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়া, এমপি হওয়াই শামসুল আলমদের মূল লক্ষ্য। সেই বিবেচনায় শুরু থেকেই ভোটের মাঠে শামসুল আলম থেকে সচেতনদের মুখ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও চলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষ থেকে।

তবুও শামসুলের পক্ষে শেষ মুহূর্তের গণজোয়ারে শঙ্কিত হয়ে পড়েন নুরুল ইসলাম বি.এসসি ও তার সমর্থকেরা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় নেওয়া হয় নতুন কৌশল। শামসুল আলম আদর্শবিবর্জিত, রাজনীতিতে আনখোড়া, আনস্মার্ট, সওদাগর-ইত্যকার বিশেষণের পর ভোটের রাজনীতিতে নতুন স্লোগান উঠে ‘শামসুল ইসলাম এসএসসি, নুরুল ইসলাম বি.এসসি’।

তবুও শঙ্কা- অন্য আসনের ফলাফল যাই হোক এই আসনে শামসুলই জিততে পারেন। পরাজিত হতে পারেন রাজনীতির মারপ্যাচে অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ নুরুল ইসলাম বি.এসসি। কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতে শামসুলের নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস থেকে ৫৫ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনা ‘শাপেবর’ হয় বি.এসসির জন্য। দেশের গণমাধ্যমে ফলাও করে এই খবর প্রচারের পর রাতারাতি পাল্টে যায় ভোটের হিসেব-নিকেশ। সঙ্গে নৌকার জোয়ার যুক্ত হলেও অপেক্ষাকৃত কম ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়ে আসেন নুরুল ইসলাম বি.এসসি।

মিথ আছে, কোতোয়ালী আসনে যে প্রার্থী জয়লাভ করেন তার দলই সরকার গঠন করে। এই আসন থেকে যিনি নির্বাচিত হন তিনি অবধারিত মন্ত্রী। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনায় নুরুল ইসলাম বি.এসসিও আশা করেছিলেন এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটবে না। এই নিয়ম অনুসরণ করলেই তিনি মন্ত্রী। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হয়নি। পূরণ না হলেও বি.এসসির মনে কোনো কষ্ট নেই। থাকার কথাও নয়। জীবনে একবার এমপি হওয়ার স্বপ্ন তো পূরণ হলো। পরে এমপি হোন আর না হোন অন্তত ‘সাবেক এমপি’ এই পরিচয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারবেন। বলা চলে, খোশ মেজাজেই কেটে যায় বি.এসসির এমপি মেয়াদের পাঁচ বছর।

আসে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। রানিং এমপি, মনোনয়ন না পাবার কোনো কারণ নেই-এই এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে আছেন বি.এসসি। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ান মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। জোটরক্ষায় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা শেষপর্যন্ত এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেন। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিয়ে আসেন সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। তাহলে বি.এসসি সাহেব যাবেন কই? শেখ হাসিনা বললেন, ‘আপনি সরে যান, আপনাকে আমি দেখবো’।

এই আশ্বাসে খুশীতে আটখানা নুরুল ইসলাম বি.এসসি। নির্বাচন নামক ‘ঝড়ঝঞ্জা’ ও অর্থখরচের পথে না গিয়ে মূলত নেত্রীর এমন একটি আশ্বাসবাণীই চেয়েছিলেন তিনি। কাঙ্ক্ষিত সেই আশ্বাস বি.এসসি’র স্বপ্নের দরজাটাই খুলে দেয়। তার বিশ্বাস, নেত্রী বলেছেন-কিছু একটা তো করবেনই। তিনি মনে করেন, সেই কিছু মানেই ‘মন্ত্রীত্ব’। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রীসভার সদস্যদের শপথ-অনুষ্ঠানে ডাক পড়বে সেই আশায় আগেভাগেই ঢাকার বাসায় গিয়ে অবস্থান করেন বি.এসসি। কিন্তু আশায় গুঁড়েবালি।

এরপর মাস যায়, বছর যায়। বি.এসসি সাহেবের ভাগ্য খোলে না। মনের কথাও জানাতে পারেন না নেত্রীকে। চাইলেও সাক্ষাৎ মেলে না নেত্রীর। মাঝে মাঝে বি.এসসি সাহেবের হতাশার কথা ফেসবুকে তুলে ধরে তাঁর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস-রাজনৈতিক) নিয়াজ মোরশেদ নিরু। ভালোবাসার কারণে আমরাও সুযোগ পেলে নির্লোভ, ত্যাগী, দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ-বি.এসসির সঙ্গে এমনসব অভিধা জুড়ে দিয়ে তিনি মন্ত্রী হচ্ছেন, মেয়র পদে প্রার্থী হচ্ছেন এমন খবরে ফেনা তুলি। বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় কর্মরত অনুজদের দিয়ে কিছুদিন পর পর মন্ত্রীসভার রদবদলের সংবাদ করাই। আর বরাবরই সেখানে এগিয়ে রাখা হতো নুরুল ইসলাম বি.এসসিকে। মূলত বিএস.সি সাহেবকে মন্ত্রী বানাতেই এমন সংবাদের অবতারণা। এক্ষেত্রে বাংলামেইলের তৎকালীন সিনিয়র করসপনডেন্ট অনুজপ্রতীম আলম দিদারের ভূমিকাও কম ছিল না।

এরপরও ভালো খবরটির দেখা নেই। আমার স্নেহভাজন নিরু প্রায়ই ফোন করে আমার কান ঝালাপালা করতো। বলতো, আমার স্যার (বি.এসসি সাহেব) মন্ত্রী হচ্ছেন কিনা কিংবা তার ব্যাপারে নেত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি কী হাছান ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিন না। তাদের ধারণা- এ ব্যাপারে সবচেয়ে অথেনটিক খবর হাছান ভাই-ই (ড. হাছান মাহমুদ) দিতে পারবেন। তাদের পীড়াপীড়িতে আমিও হাছান ভাইয়ের কাছে জানতে চাইতাম বি.এসসি সাহেবকে আদৌ কিছু করা হচ্ছে কি না। হাছান ভাই বলতেন, বি.এসসি সাহেব নেত্রীর ‘গুড বুক’-এ আছেন। নিশ্চয় তাকে কিছু একটা করবেন। একবার তো হাছান ভাইকে বি.এসসি সাহেবের সঙ্গে ফোনে মিলিয়েও দিয়েছিলাম। হাছান ভাই বললেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন, নেত্রী আপনাকে মূল্যায়ন করবেন।’

এরপর সময় গড়িয়ে যায়। আসে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার পর চট্টগ্রামের রিমা কমিউনিটি সেন্টারে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ জেলার উদ্যোগে বিশাল শোডাউন ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের নেতার সম্মিলন ঘটে সেই শোডাউনে। অনুপস্থিত থাকেন কেবল নুরুল ইসলাম বি.এসসি। হতাশা, অভিমানে একপ্রকার ঘরকুনো হয়ে বসে আছেন তিনি। তার এপিএস নিরুকে জানালাম, আ জ ম নাছির উদ্দীনকে কেন্দ্র করে সব নেতা আজ ঐক্যবদ্ধ, একই প্লাটফরমে। এখন বি.এসসি সাহেবের জ্বলে উঠার, আলোচনায় আসার মোক্ষম সুযোগ। ওনাকে বলো, কাল থেকে আ জ ম নাছিরের কোনো মিটিং, গণসংযোগ যেন বাদ না দেন। তিনি যত বেশি সক্রিয় হবেন, দৃশ্যমাণ হবেন ততই আলোচিত হবেন, হাইকমান্ডের নজরে থাকবেন। পারলে এই ইস্যুতে প্রতিদিনই গণমাধ্যমে কথা বলতে বলো।

আমার কথাটি লুফে নিলো নিরু। প্রতিদিনের মতো পরের দিন সকালে একাত্তর টেলিভিশনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছিরের গণসংযোগ লাইভ করতে তার বাসায় হাজির হই। দেখি বি.এসসি সাহেবও সেখানে উপস্থিত। ৯ টার সংবাদে ‘লাইভ’ শুরু করলাম নুরুল ইসলাম বি.এসসিকে ধরে। দীর্ঘ সেই লাইভে প্রায় ৫ মিনিটের মতো কথা বললেন তিনি। বললেন, `আ জ ম নাছিরের পক্ষে আজকের এই গণজোয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ফল। কারো শক্তি নেই এই জোয়ার ঠেকানোর। আ জ ম নাছির জিতবেই জিতবে। তাকে জয়ী ঘরে ফিরবো আমরা।’

মুহূর্তেই আমার সামনেই অসংখ্য ফোন আসতে থাকে বি.এসসি সাহেব ও নিরুর মোবাইল ফোনে। দুজনই আমাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন। সেই থেকে প্রতিদিনই আ জ ম নাছিরের গণসংযোগের অগ্রভাগে দেখা যেতো বিএস.সি সাহেবকে। কাভারেজ-এর বন্যা বয়ে যায় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। এভাবে নতুন করে আলোচনার পাদপ্রদীপে চলে এলেন নুরুল ইসলাম বি.এসসি।

রাজনীতির এই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার আড়াই মাসের মাথায় ১৪ জুলাই ২০১৫ মন্ত্রীসভায় শপথ নেওয়ার ডাক পড়ে বিএস.সি সাহেবের। তিনি আশা করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু শপথ নেন পূর্ণমন্ত্রী (টেকনোক্রেট) হিসেবে। দায়িত্ব পান বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর মন্ত্রী হওয়ার খবরটিও প্রথম আমি দিয়েছিলাম। রাতে জানানোর পর শপথ গ্রহণের দিন সকালবেলা ফোন করে জানতে চাইলাম মন্ত্রীপরিষদ সচিব তাকে ফোন করেছেন কিনা। বললেন, এই মাত্র ফোনটা পেয়েছি। দোয়া করো আমার জন্য। যেনো তোমাদের মান রাখতে পারি।

মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকতার সুবাদে এভাবেই সাক্ষী হয়েছিলাম স্কুলশিক্ষক, কাস্টমস কর্মকর্তা, শিল্পপতি এবং রাজনীতিক থেকে একজন নুরুল ইসলাম বি.এসসির এমপি-মন্ত্রী হওয়ার মুহূর্তগুলোর।