শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬

আজ চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জানুয়ারি ২৪, ২০২০, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ


চট্টগ্রাম: আজ চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি- পুলিশ লালদীঘি এলাকার প্রায় এ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চালায় তাদের পরিকল্পিত তাণ্ডব। চারদিক হয়ে উঠে অন্ধকার। জনতার দিকবিদিক ছুটোছুটিতে তৈরি হয় ভীতিকর পরিবেশ।

লালদীঘি ময়দানে সেদিন ছিল স্বৈরাচারবিরোধী সমাবেশ। সেখানে অংশ নিতে সেদিন চট্টগ্রামে আসেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লালদীঘি ময়দানে যাওয়ার পথে কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনের পথ যখন নেত্রীকে বহনকারী গাড়ি অতিক্রম করে ঠিক তখন শুরু হয় গাড়ির বহর ও জনতার উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ। শেখ হাসিনার গাড়ি বহর ও জনতার উপর নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ওই হামলায় ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। আহত হয় শতশত ছাত্র, শ্রমিক ও পেজাজীবী জনতা।

সেদিনের হামলায় অংশ নেয়া এক পুলিশ সদস্যের রাইফেলের কানেকশন বেল্ট খুলে যাওয়ায় শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। এসময় আইনজীবীরা শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে আইনজীবী সমিতি অফিসে নিয়ে রক্ষা করেন। সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে আদালত প্রাঙ্গণের প্রধান ফটকে নির্মিত ছোট্ট স্মৃতিফলকে প্রতি বছর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন।

ওইদিন গণহত্যায় নিহতরা হলেন মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দীন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথেলবাট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি-কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আবদুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হেসেন, পংকজ বৈদ্য, বাহার উদ্দীন, হাশেম মিয়া, মো. কাশেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাস, শাহাদাত, বিকে দাস, চান্দ মিয়া ও সমর দত্ত।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে প্রয়াত আইনজীবী শহীদুল হুদা বাদী হয়ে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় হত্যাকাণ্ডের সময় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের দায়িত্বে থাকা মীর্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করা হয়। এতে রকিবুল হুদাকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বহুল আলোচিত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। আদালতের নির্দেশে সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি সিএমপির তত্কালীন কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাকে এবং পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে মীর্জা রকিবুল হুদাসহ আট পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।

অভিযুক্ত অন্যরা হলেন—কোতোয়ালি জোনের সাবেক প্যাট্রল ইন্সপেক্টর (পিআই) জে সি মণ্ডল, পুলিশ কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো. আব্দুল্লাহ এবং মমতাজ উদ্দিন। আসামিদের মধ্যে রকিবুল হুদা, বশির উদ্দিন ও আব্দুস সালাম মারা গেছেন। জে সি মণ্ডল পলাতক আর বাকি চার জন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছিলেন। আদালতে দুই দফায় আলোচিত এ মামলার চার্জ গঠন (দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত আকারে) করা হয়। প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ৫ আগস্ট এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০০ সালের ৯ মে আট আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১, ১০৯, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ১৯৯৭ সালের ২২ অক্টোবর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলার মোট সাক্ষী ১৬৭ জন। গত ১৪ জানুয়ারি ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য কার্যক্রম শেষ হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. অনুপম সেন, সাংবাদিক অঞ্জন কুমার সেন ও হেলাল উদ্দিন চৌধুরীসহ বেশ কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মামলায় সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত রবিবার রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন।

অবশেষে ৩২ বছর পর গত ২০ জানুয়ারি পাঁচ পুলিশকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—কোতোয়ালি জোনের সাবেক প্যাট্রল ইন্সপেক্টর গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল (মামলার বিচার শুরুর পর থেকে পলাতক), সাবেক পুলিশ কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, মো. আব্দুলাহ এবং মমতাজ উদ্দিন।