
ইফতেখার সৈকত : প্রায় দু’বছর পর ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শাখা ছাত্রলীগের দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এই কমিটির অনুমোদন দেন।
এতে সভাপতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের (২০০৬-০৭) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. রেজাউল হক রুবেলকে এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মার্কেটিং বিভাগের (২০১০-১১) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইকবাল হোসেন টিপুর নাম উল্লেখ করা হয়। এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে কমিটি গঠনের ছয় মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ফলে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ। গত ১৯ নভেম্বর কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার দাবিতে মানববন্ধন ও ৭দিনের আল্টিমেটাম দেয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তবে এর পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির কোন দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি।
পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ বিরাজ করছে তেমনি দেখা দিয়েছে হতাশা। অনেক নেতা-কর্মী পৌঁছে গিয়েছেন ছাত্রজীবনের শেষ প্রান্তে। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে ছাত্রজীবনের শেষে একটি পরিচয় পেতে মরিয়া তারা। তাই তো তাদের চাওয়া অতি শিঘ্রই কমিটি পূর্ণাঙ্গ হোক।
এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা। পান থেকে চুন খসলে কিংবা কোন অজুহাত পেলেই তারা লিপ্ত হন সংঘাত সংঘর্ষে। যার জন্য ভুগতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। অবরোধ কিংবা মারামারি চলাকালীন সবার আগে বন্ধ করে দেওয়া হয় শাটল ট্রেন। ফলে ক্যাম্পাস থেকে শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় ক্লাশ। ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।
এদিকে ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ‘সেশন জট’। পূর্ণাঙ্গ কমিটির আগে নেতা-কর্মীদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে নতুন ভাবনা। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নতুনরা কতটুকু জায়গা পাবেন? বয়স্ক ও ছাত্রত্বহীন কেউ পদ পাচ্ছে কিনা। যদি বয়স্কদের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে পদবঞ্চিত হবে নতুনরা। আর যদি নতুনদের সুযোগ করে না দিয়ে পুরাতনদের আবার কমিটিতে আনা হয় তাহলে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির সম্ভাবনাও হারিয়ে যাবে।
কেমন নেতৃত্ব চায় কর্মীরা
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। এখানকার রাজনীতির উপর যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নির্ভর করে, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতাদের অধিকাংশই এখান থেকে জন্ম নেয়। তাই ছাত্রলীগের এই অংশের নেতৃত্বে যোগ্য, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবানদের প্রত্যাশা করছেন শাখা ছাত্রলীগের কর্মীরা।
পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কেমন নেতৃত্ব চান এমন প্রশ্নের জবাবে ছাত্রলীগের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের (১৪-১৫) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ জিসান গাজী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে চাইবো যারা সৎ, যোগ্য, ত্যাগী ও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারাই যেন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ পায়।
এমন কথার সাথে একমত পোষণ করে আরেক কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের (১৫-১৬) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ সাব্বিরুল ইসলাম বলেন, মেয়াদের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেছে কিন্তু এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। পূর্ণাঙ্গ কমিটির দাবিতে আমরা নভেম্বরে মানববন্ধন ও করেছিলাম। কিন্তু কোন ফল দেখা যায়নি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ার পেছনে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সদিচ্ছার অভাবকেই দায়ী করেন ছাত্রলীগের এই কর্মী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের (১৪-১৫) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রলীগের কর্মী প্রশান্ত পাল বলেন, প্রথমবর্ষ থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আছি। এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘ ৫ বছর রাজনীতি করে যদি ছাত্রলীগের একটা পরিচয় না পাই তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই চাইবো অতি তাড়াতাড়ি ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হোক এবং সেই সাথে নতুনদের কমিটিতে নিয়ে আসার দাবিও জানান তিনি।
যা বলছেন সভাপতি-সম্পাদক
এ বিষয়ে চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি আমাদের প্রস্তুত আছে, আমরা দিয়ে দিবো। কিন্তু তার আগে আমরা কিছু কাজ করছি। ক্যাম্পাসে বর্তমানে কোন প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নেই। এখন সবাই প্রগতিশীল চক্র। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আমাদের মধ্যে ডুকে গেছে। তাদের খুঁজে বের করার জন্য আমরা কিছু কাজ করছি। গোয়েন্দা সংস্থার সাথে আমরা যোগাযোগ করছি।
তিনি আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে দ্বিতীয় যে সমস্যাটি হচ্ছে সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর এখনও সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সেখানে ছাত্রলীগের অসংখ্য কর্মীরা থাকে। একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে গেলে সব ছাত্রলীগ কর্মীকে কমিটির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার ভেতরে যদি পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেই তাহলে পদবঞ্চিতরা সমস্যার সৃষ্টি করবে। যা আমাদের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
রেজাউল হক রুবেল বলেন, যদি হলের আসন বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ শিক্ষার্থীদের পাবো।তাদের নিয়ে আমরা কমিটি করবো। কেন্দ্র থেকে আমাদের নির্দেশনা আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা বৈধ শিক্ষার্থী আছে তাদের নিয়ে কমিটি করার জন্য। হল কমিটি হয়ে গেলে কোনো হলে সমস্যা হলে তা সেই হলের নেতৃবৃন্দের দ্বারা সমাধান করা সম্ভব হবে।
পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব কতটুকু জায়গা পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাঝখানে চবি ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় জ্যেষ্ঠ অনেকে পদ-পদবী পায়নি। কেন্দ্র যে বিবেচনায় আমাকে সভাপতি মনোনীত করেছে সেই প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। সেক্ষেত্রে দক্ষ, ত্যাগী ও নতুনদেরও সুযোগ দেওয়া হবে।
রেজাউল হক রুবেল আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটির ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি নয় বরং যোগ্যদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।সম্ভাব্য সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কমিটি প্রস্তুত। যদি হলগুলোতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয় তার ১০-১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া যাবে। তার আগে হল ও ফ্যাকাল্টি কমিটি দেওয়া হবে। এ সময় তিনি চবি ছাত্রলীগের সকল নেতা-কর্মীকে বগিভিত্তিক রাজনীতি বাদ দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে এক হওয়ারও আহ্বান জানান।
চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা যাচাই বাচাই করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবো। সেক্ষেত্রে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা আগ্রহীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাচাই ও সত্যিকারের ছাত্রলীগ কি না তা যাচাই করবো।
