
চট্টগ্রাম : শিক্ষাক্ষেত্রে গণিত ও বিজ্ঞানভীতি দূর করতে যাত্রা করা ইডেন ইংলিশ স্কুল পার করেছে একবছর। এ উপলক্ষে শুক্রবার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে লেখাপড়ায় আতঙ্ক ও ভীতি না ছড়িয়ে আনন্দবিনোদনে শিক্ষার ফেরি করে দেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অঙ্গীকার পুনব্যক্ত করেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা।
একই সাথে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হলেও নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে দেশিয় সংস্কৃতি, দেশপ্রেম-দেশাত্মবোধ নিয়ে শিক্ষার মজবুত ভিত্তি তৈরি করে দেওয়ার শপথ উচ্চারিত হয় সমস্বরে।
শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের নিভৃত পল্লীতে গড়ে উঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বর্ষপূতি উপলক্ষে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে স্কুলকর্তৃপক্ষ।
প্রথমপর্বে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষানুরাগী মো. খালেদ মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ভিসি অধ্যাপক মো. শাহ আলম, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাশেদুল আলম।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ’জয়িতা’ নারী অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার বেগম। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) নিতাই কুমার ভট্টাচার্য, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মাহানুর তাসনিম।
সাহেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম চিশতি, একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কমিশনার ও শিক্ষা স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শামসুল আলম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউনুছ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার, লক্ষ্যে পৌঁছানোর অন্যতম ভিত্তি। কাজেই ইডেন ইংলিশ স্কুলে এমন ভিত্তি গড়ে দিতে হবে যাতে করে আজকের শিশুরা আগামীদিনের যোগ্য নাগরিক হবার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, আজকের শিশুরা ডাক্তার হবে, সরকারি বড় অফিসার হবে। কিন্তু তা হয়ে যেন তাদের দরজা গরীবের জন্য বন্ধ হয়ে না যায়, তাদের বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয় এমন শিক্ষাই দেবে ইডেন স্কুল।
স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়াবান্ধব ছিমছাম পরিবেশের প্রশংসা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নই শুধু প্রকৃত শিক্ষার মাপকাঠি নয়, স্কুলের ভেতরগত পরিবেশ, পাঠদানে মুন্সীয়ানাই হচ্ছে আসল। শিশুরা শিক্ষাকে বোঝা এবং পীড়ন যাতে মনে না করে, সেই আঙ্গিকে শিশুদের পাঠদান করে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ইডেন ইংলিশ স্কুল ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করেন মন্ত্রী।
চুয়েট ভিসি শাহ আলম বলেন, এমন একটা নিভৃত পল্লীতে, যেখানে মানুষেরও আনাগোনা ছিল না সেরকম একটি জায়গায় উন্নত শিক্ষা বিতরণের জন্য কোটি কোটি টাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, দুঃসাহস, তেমনি শিক্ষাবান্ধব উন্নত মানসিকতারও বহি:প্রকাশ। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একদিন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট কামরুন্নাহার বলেন, আমার সন্তান খালেদ যখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেয় তখন আমি এতদূরে, নিভৃত জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে কিছুটা নিরুৎসাহিত করেছিলাম। কিন্তু আজ মনে হলো খালেদের সিদ্ধান্তই ঠিক। একবছরের মধ্যে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যতিক্রমী পাঠদানের গল্প ও সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। ভালো ও যুগোপযোগী শিক্ষার জন্য দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বলে বাংলা শিক্ষা ও বাঙালি সংস্কৃতি যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যাদের টাকা আছে তারা সবসময় লাভজনক ব্যবসা করতে চায়। টাকা দিয়ে টাকা আনতে চায়। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে চায় না। এক্ষেত্রে খালেদ ব্যতিক্রম। উন্নত ও নান্দনিক মানসিকতা আছে বলেই জীবনের সমস্ত উপার্জন ঢেলে সে এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে এসেছে।
ইডেন ইংলিশ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা খালেদ মাহমুদ বলেন, দিনের বেলায়ও এই এলাকায় মানুষ আসতে ভয় পেতো, সেখানেই আমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। আজ এখানে মানুষ আসছে, তাদের সন্তানেরা পড়তে আসছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে নিভৃত এই পল্লীতে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা গতানুগতি শিক্ষা নয়, শিক্ষার মূলভিত্তি তৈরি করতে কাজ করছি। আপনার সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নিয়েছি। যদি ব্যর্থ হই তাহলে ছেড়ে চলে যাবো।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে গণিত ও বিজ্ঞানভীতি আমরা চিরতরে দূর করতে চাই। এজন্য আমাদের পাঠদানের কৌশলটাই ভিন্ন। শিক্ষা কখনোই পীড়ন বা আতঙ্ক হতে পারে না- সেটাই আমরা ব্যতিক্রমী পাঠদানের মধ্যদিয়ে প্রমাণ করছি। একই সাথে ইসলাম ধর্মের অনুসারী শিক্ষার্থীদের কোরআন শিক্ষার কাজটিও আমরা ক্লাশের মাধ্যমে রপ্ত করার ব্যবস্থা নিয়েছি, যা কোনো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রথম।
খালেদ মাহমুদ বলেন, আমি চাইলে এখানে লগ্নি করা অর্থে লাভজনক কোনো ব্যবসায় জড়াতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। বিনিয়োগের পরও এখনো প্রতিমাসে আড়াই লাখ টাকা গচ্ছা দিয়ে যাচ্ছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। যেহেতু আপনার সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছি, তাদের জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার ভিত্তিটা গড়ে দিতে পারলেই আমার শান্তি।
অধ্যক্ষ মাহানুর তাসনিম স্থানীয়দের উদ্দেশে বলেন, আমরা থাকবো না। কিন্তু এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে। তখন এই প্রতিষ্ঠানকেই আপনারাই এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আপনারাই এর মালিক, কর্ণধার।
একুশে/এটি
