সমস্যায় জর্জরিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো


ইফতেখার সৈকত, চবি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে ১০টি আবাসিক হল। এরমধ্যে ছেলেদের ৭টি ও মেয়েদের জন্য রয়েছে ৩টি হল। ১৯৭৩’র বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে চবি পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেলেও কেবল ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পেয়ে থাকেন আবাসিক সুবিধা। বাকি ৮৩ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী অনাবাসিক।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের বাজেট বই অনুযায়ী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৫ হাজার ৪৯৬ জন। এর মধ্যে ১০টি হল ও একটি হোস্টেল মিলিয়ে মোট আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন ৪ হাজার ২৮০ জন শিক্ষার্থী। আলাওল হলে ২৬০টি, এ এফ রহমান হলে ২৫৮টি, শাহজালাল হলে ৪৭৫টি, শাহ আমানত হলে ৬৩২টি, সোহরাওয়ার্দী হলে ৩৭৫টি, আবদুর রব হলে ৫০৯টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ২৪৫টি, মেয়েদের জন্য শামসুন নাহার হলে ৪৮১টি, প্রীতিলতা হলে ৫৩১টি, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া হলে ৫০৮টি এবং শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলে রয়েছে ২৭টি সিট।

ফলে ১৬ হাজার ৩১৭ জন ছাত্রের মধ্যে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন ২ হাজার ৭৬০ জন এবং ৯ হাজার ১৭৯ জন ছাত্রীর মধ্যে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ১ হাজার ৫২০ জন। এছাড়া উদ্বোধনের চার বছর পর গত ১২ নভেম্বর মেয়েদের জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা হলে ৭৫০টি সিট চালু করা হয়।

তছাড়া ছেলেদের জন্য ৭৫০টি সিট বিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও ৩১২ সিট বিশিষ্ট অতিশ দিপংকর হল এবং মেয়েদের জন্য ৩১২ আসন বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের এখনও কাজ চলছে। হলগুলো চালু হলে প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থী বঞ্চিত হচ্ছেন আবাসিক সুবিধা থেকে। আর যারা হলে থাকছেন তাদেরও প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানান সমস্যার।

খাবারের সমস্যাই প্রধান, ভেঙ্গে পড়ছে পলেস্তারা:

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর প্রধান সমস্যা খাবার নিয়ে। হল ডাইনিংয়ের কর্মচারীদের বেতন ও তৈজসপত্রের খরচ বহন করে বিশ্ববিদ্যালয়। খাবারে কোনো রকম ভর্তুকি দেওয়া হয় না। আবাসিক হলগুলোতে ২০ টাকা মূল্যে খাবার বিক্রি করা হয়। খাবারের তালিকায় থাকে নামমাত্র মাছ, মাংস। তার সাথে ভর্তা বা সবজি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে খাবারের স্বাদ নিয়ে। আবাসিক হলের খাবারের মান হয় নিম্নমানের ও স্বাদহীন। খাবারগুলো খেয়ে শিক্ষার্থীরা ভুগছেন পুষ্টিহীনতায়। তাছাড়া হলের পাশে ক্যান্টিন ও দোকান থাকলেও সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চড়া দামে খাবার বিক্রি হয়। ফলে হল ডাইনিং ছাড়া আহারের আর কোনো ব্যবস্থা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর আরেকটি সমস্যা হচ্ছে আসন সংকট। হলগুলোতে আসন সংকট থাকায় এক বেডে গাদাগাদি করে থাকতে হয় একাধিক শিক্ষার্থীকে। আবার অনেকে শুধুমাত্র হলে একটি সিট পেতে ঘুরছেন রাজনৈতিক বড়ভাইদের পেছনে। তাছাড়া ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে অবৈধভাবে দখল করে থাকছেন বিভিন্ন রুমে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর মধ্যে শাহজালাল, আলাওল ও এ এফ রহমান হল বেশ পুরনো। এই হলগুলোর অবকাঠামো নাজুক। হল ভবনের প্রত্যেকটি তলায় ধরে আছে ফাটল। ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে পলেস্তারা। পানি ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে ওয়াশরুমের পাশে কোনো কোনো রুম পড়ে আছে পরিত্যক্ত হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল ও শাহ আমানত হলের রয়েছে বর্ধিত অংশ। সেখানে অনেক রুমেই বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। কিছু রুম সংষ্কার করা হলেও আমানত হলের বর্ধিত অংশে কিছু রুম ঢলে পড়ে আছে। তবুও করা হচ্ছেনা কোন সংষ্কারের কাজ।

তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে রয়েছে লাইব্রেরী। আর সেখানে নিযুক্ত আছেন একজন কর্মকর্তা। তবে লাইব্রেরীতে নতুন বই না থাকায় পড়ে থাকে শিক্ষার্থীশূণ্য হয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে এসব সমস্যা ছাড়াও রয়েছে পানি সংকট, অপরিষ্কার, খেলাধুলার সামগ্রীর স্বল্পতাসহ নানান সমস্যা।

তাছাড়া বিগত প্রশাসনের মেয়াদের শেষ দিকে হলে আসন বরাদ্ধের জন্য আবেদন ফর্ম বিক্রি করে হল কর্তৃপক্ষ। দফায় দফায় নোটিশ দিয়েও সম্পূর্ণ হয়নি আসন বরাদ্দের কাজ। এদিকে গত ২৯ জানুয়ারি সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে চবি ভিসি ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অছাত্রদের হল ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন, তবে এ নিয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে থাকছেন ছাত্রত্বহীন শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে আসন সংকটের কারণে সিট পাচ্ছেন না নতুন শিক্ষার্থীরা।

উপাচার্যের হল পরিদর্শনের পর পরিবর্তন কতটুকু?

গত বছরের অক্টোবর মাসে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় সারা দেশজুড়ে যখন চলছিলো আলোচনা-সমালোচনা, তখন দায়িত্বগ্রহণের পর ১২ ও ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো পরিদর্শন করেন চবি উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার। ওই সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা শুনেন এবং সমাধানের আশ্বাস দেন। উপাচার্যের হল পরিদর্শনের পর কয়েকটি হলে টয়লেটের নতুন দরজা লাগানো ও নিরাপদ পানির ফিল্টার লাগানোর কাজ করা হয়। তবে উপাচার্যের হল পরিদর্শনের পরেও দূর হয়নি খাবার ও অবকাঠামো নিয়ে সমস্যাগুলো। বরাদ্দ দেওয়া হয়নি আসন।

এদিকে এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে বিভিন্ন সময় হলের গেইটে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও তা আর বাস্তবায়ন হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও আলাওল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক হোসেন শামীম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমাদের হলগুলোর একটি বড় সমস্যা হচ্ছে খাবারের সমস্যা।খাবারগুলো একদম বিস্বাদ ও নিম্নমানের।তাছাড়া হলে রয়েছে পানির সংকট।বিশেষকরে শুক্রবারে পানি একদমই পাওয়া যায় না।বিভিন্ন সময় আমরা এসব নিয়ে আওয়াজ তুলেছি কিন্তু প্রশাসন আশ্বাস দিয়েও তা সমাধান করেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী তাসমীম তুবা একুশে পত্রিকাকে বলেন, আবাসিক হলে আসন সংকটের কারণে এক আসনে দু’জন করে থাকতে হয়। কোনো রুমে চার-পাঁচজনও থাকছেন। এতে করে পড়ালেখা করতে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত হলের বিষয়গুলো নিয়ে জোর পদক্ষেপ নেওয়া। তবেই বিষয়গুলোর সমাধান হবে।

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এস এম মনিরুল হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা হলের সমস্যা নিয়ে কিছু কাজ করছি। হলে আরও সমস্যা আছে। আমরা একটু সময় নিচ্ছি। ধীরে ধীরে হলের সব সমস্যা নিয়ে কাজ করা হবে।