বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬

সিউলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০, ১০:৪৭ অপরাহ্ণ

 

ওমর ফারুক হিমেল, দক্ষিণ কোরিয়া : কোরিয়ায় নিযুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতের মুখে বাংলাভাষার জয়গান যথাযোগ্য ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদায় বাংলাদেশ দূতাবাস সিউল কর্তৃক মহান শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২০ পালিত হয়েছে।

পূর্ণ মর্যাদায় দিবসটি পালনের জন্য দূতাবাস তিন পর্বের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান ২১ ফেব্রুয়ারি রাতের প্রথম প্রহরে দক্ষিণ কোরিয়ার আনসান সিটিতে অবস্থিত শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় তীব্র শীতে রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পনের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যবৃন্দ এবং কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন।

দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে রাষ্ট্রদূত কর্তৃক দূতাবাস প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এসময় দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের পরবর্তী অংশে ছিল পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ, মহান শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও মাননীয় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত বাণীসমূহ পাঠ, ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাত এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ মোনাজাত ইত্যাদি।

উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে দিবসটির তাৎপর্যের ওপর আলোকপাত করা হয়। ‘অমর একুশে’ বইমেলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়নের ওপর নির্মিত ভিডিও চিত্রটি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে উক্ত পর্বের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।

একই দিন বিকাল ৪টায় ঘটিকায় Korean National Commission for UNESCO (KNCU)-এর সেমিনার হলে তৃতীয় পর্বের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিকবৃন্দ, দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কেএনসিইউ (KNCU)-এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্বে ভাষা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রর্দশন করা হয় এবং মহান একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পরিবেশন করা হয়। এরপর দিবসটি উপলক্ষে প্রদত্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ইউনেস্কো-এর মহাপরিচালকের বাণী পাঠ করা হয়।

স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তিনি বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের মাতৃভাষার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রদানের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন এবং এ বছরের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘Language without borders’-এর আলোকে বিবাদ নিরসণে আন্তঃসীমানা ভাষার উপযোগিতার বিষয়ে আলোকপাত করেন।

কেএনসিইউ (KNCU)-এর মহাসচিব কঙ্গো কিম (Mr. Kwangho Kim) ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার ২১ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান।

মাতৃভাষা রক্ষার্থে বাংলাদেশের আত্মত্যাগ ও প্রচেষ্টার ইতিহাস তুলে ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া প্রশান্ত বিষয়ক ব্যুরো-এর মহাপরিচালক কিম জং হান (Mr. Kim Jung Han) বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত এইজ ই ফিলিপ টার্নার (H.E. Mr. Philip Turner) জানান, তার দেশ কয়েক দশকে অত্যন্ত বৈচিত্রপূর্ণ একটি সমাজে পরিণত হয়েছে। সে কারণে ২০০-এর অধিক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির দেশ নিউজিল্যান্ড তার আদিবাসীদের ভাষা রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

কানাডার রাষ্ট্রদূত এইচ ই মাইকেল ডেনেঘার (H.E. Mr. Micheal Danagher) জানান, তার দেশে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার পাশাপাশি ১৪০ এর অধিক প্রবাসী ভাষা ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদি ভাষা রয়েছে। ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া আদি ভাষা রক্ষার্থে তার সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। এ সময় তিনি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির উদ্যোগ গ্রহণকারী কানাডার নাগরিক সালাম ও রফিক-এর কথাও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রদূত এইচ ই ক্যাথুস জিবাও মেটাই (H.E. Mr. Kathos Jibao Mattai)  তার দেশের ১৬টি বিভিন্ন ভাষার মধ্যে বিরাজমান সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধার ওপর আলোকপাত করেন।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বে কোরিয়ান শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও ভারতের কত্থক নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনা সকলকে মোহবিষ্ট করে। সেই সাথে দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্তৃক পরিবেশিত গান সকলে উপভোগ করেন। পরিশেষে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবার পরিবেশন এবং কোরিয়ান ও বাংলা ভাষা সম্বলিত ওপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়।

একুশে/এএ