শরীফুল রুকন: আসামি হাজির করার জন্য আদালত জারি করে গ্রেফতারি পরোয়ানা। এরপরও আসামি গ্রেফতার না হলে জারি করা হয় মালামাল জব্দের (ক্রোকি) পরোয়ানা। এই পরোয়ানা মূলে আসামির ঘরের সব অস্থাবর সম্পদ জব্দ করতে পারে পুলিশ। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আদালতের এই পরোয়ানাকে অবৈধ আয়ের সুযোগ হিসেবে নিয়েছে কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা। ফলে ক্রোকি পরোয়ানা জারি হলেও মোট অংকের টাকা নিয়ে মামামাল জব্দ করছে না পুলিশ।
চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সিআর মামলার ১৯৫টি ক্রোকি পরোয়ানা তামিল বিহীন রয়েছে। তবে সিএমএম আদালতে জিআর মামলার কতটি পরোয়ানা তামিল বিহীন রয়েছে তার হিসেব পাওয়া যায়নি নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনারের (প্রসিকিউশন) কার্যালয় থেকে। এদিকে চট্টগ্রামের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৬ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানায় পুলিশ ফাইলে মোট ১ হাজার ৩৬১ টি ক্রোকি পরোয়ানা তামিল বিহীন অবস্থায় ছিল।
জানা গেছে, ২০১০ সালে চেক প্রতারণার অভিযোগে পটিয়ার ভান্ডারগাঁও এলাকার মাওলানা সেলিম উদ্দিন জেহাদীর বিরুদ্ধে একটি মামলা (সিআর ১২০১) করেন আবু জাফর। এরপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও আসামি হাজির না হওয়ায় ২০১১ সালে ক্রোকি পরোয়ানা জারি করে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালত-২ এর বিচারক। কিন্তু পরোয়ানা জারির ৫ বছর পার হলেও এখনো ওই আসামির মালামাল জব্দ করতে পারেনি পটিয়া থানার পুলিশ।
বাদি পক্ষের আইনজীবি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আসামিকে আদালতে হাজিরে বাধ্য করার জন্য ক্রোকি পরোয়ানা জারি করা হয়। এখন এই পরোয়ানা তামিল না হওয়ায় মামলার কার্যক্রম থমকে আছে। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরী হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আসামির ঘরে যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ থাকায় তা জব্দ করা যাচ্ছে না বলে পুলিশ বাদিপক্ষকে জানাচ্ছে। সদিচ্ছা থাকলে, আদালতের আদেশ মেনে পুলিশ মালামাল জব্দ করতে পারতো। এক্ষেত্রে আদালতে প্রমাণ দিয়ে অন্যরা তাদের মালামাল নিয়ে যেতে পারতেন। এছাড়া এক্ষেত্রে কোন জটিলতা থাকলে পুলিশের দায়িত্ব হচ্ছে, বিষয়টি উল্লেখ করে আদালতকে জানানো। এর ফলে আমরা মামলার পরবর্তী ধাপ- একতরফা বিচারের দিকে যেতে পারতাম। এখন পরোয়ানা একটা নিয়ে পুলিশ বসে আছে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পটিয়া থানার ওসি নেয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’
এদিকে যৌতুক দাবির অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর স্বামী হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন বোয়ালখালী থানার পূর্ব গোমদন্ডী এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা জান্নাত। এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় গত ২৮ নভেম্বর ক্রোকি পরোয়ানা জারি করে চট্টগ্রামের একটি আদালত।
ভুক্তভোগী তাহমিনা জান্নাত বলেন, ‘২ ডিসেম্বর ক্রোকি পরোয়ানাটি থানায় পৌছলে তা তামিল করার জন্য এসআই খায়রুল হককে দায়িত্ব দেন বোয়ালখালী থানার ওসি। এরপর এসআই খায়রুল আমাকে বলেন যে, ক্রোকি পরোয়ানার আদেশ হয়েছে তা আসামি পক্ষ জানলে সকল সম্পদ সরিয়ে ফেলতে পারে। তাই ৩ ডিসেম্বর সাক্ষীদের নিয়ে মালামাল জব্দের জন্য অভিযানে যাব। কিন্তু ৩ ডিসেম্বর ব্যস্ত আছেন বলে তিনি অভিযানে যাননি। এরপর ৪ ডিসেম্বরও থানায় সারাদিন আমাদেরকে বসিয়ে রেখে অভিযানে যাননি এসআই খায়রুল।’
তিনি বলেন, ‘৫ ডিসেম্বর সকালে স্বাক্ষীদের নিয়ে থানায় গেলে এসআই খায়রুল আমাদেরকে বলেন, ‘কোন অভিযান পরিচালনা করা যাবে না, আমি গতকাল রাতে আসামির বাড়িতে গিয়েছি। আসামির মা ও ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। ঘরের প্রতিটি রুমে ঢুকে দেখেছি। সেখানে আসামির কোন ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তি নেই। যা আছে সব যৌথ সম্পত্তি। যৌথ সম্পত্তি বিধায় কোন কিছু ক্রোক করা যাবে না। আপনারা চাইলে আমি আসামির পরিবারকে থানায় ডেকে এনে সুরাহা করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারি। এর চেয়ে বেশী কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।’
মামলার বাদি তাহমিনা জান্নাত বলেন, ‘যৌতুক হিসেবে দেওয়া বিভিন্ন পদের ফার্নিচার ও মুল্যবান আসবাবপত্র সমুহ আসামীর একক অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে জব্দ করার জন্য বললেও পুলিশ তা জব্দ করছে না। আমি জানতে পেরেছি, আসামির বাড়িতে গিয়ে ক্রোকি পরোয়ানা আদেশ তামিল না করার শর্তে মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন এসআই খায়রুল হক।’
এসব বিষয় জানিয়ে সুবিচার চেয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জানিয়ে তাহমিনা জান্নাত বলেন, ‘ক্রোকি পরোয়ানার বিষয়টি আসামি পক্ষ জেনে তাদের ঘর থেকে সকল অস্থাবর সম্পত্তি সরিয়ে ফেলেছে। তাই উক্ত ক্রোকি পরোয়ানা তামিলের জন্য অভিযান চালালেও এখন কোন লাভ হবে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালখালী থানার এসআই খায়রুল হক বলেন, ‘আসামির নামে কোন অস্থাবর সম্পত্তি না থাকায় তা জব্দ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আসামিপক্ষ থেকে কোন অবৈধ সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই।’
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রোকি পরোয়ানাগুলো পুলিশ দ্রুত তামিল করে না। এক্ষেত্রে মালামাল জব্দ করতে না পারলে, কেন পারছে না- তা জানিয়ে আদালতে দ্রুত প্রতিবেদনও দেয় না পুলিশ। ক্রোকি পরোয়ানাগুলো দীর্ঘসময় ফেলে রাখে। ফলে অনেক মামলার বিচারকাজ বছরের পর বছর থমকে আছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়না। তাই পুলিশ সদস্যরা এক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা করে। এ বিষয়ে সুফল পাওয়ার জন্য বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল থেকে ক্রোকি পরোয়ানাগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। এছাড়া ন্যায়বিচারের স্বার্থে ক্রোকি পরোয়ানা তামিলের জন্য পুলিশকে নির্দিষ্ট সময় বেধে দেওয়া যেতে পারে।
