খেলাটি নাছির ও ছালামের, গোলটি রেজাউলের


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন-দৌড়ের খেলাটি মূলত সীমাবদ্ধ ছিল বর্তমান মেয়র, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন ও সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান, নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের মাঝে।

এই দুই মনোনয়ন-প্রত্যাশীর পক্ষ-বিপক্ষ চেষ্টা-তদবিরের মাঝেই একদিন প্রধানমন্ত্রী বললেন বিকল্প খুঁজুন। আর এই বিকল্প অনুসন্ধানে উঠে আসে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী, জহুর আহমেদ চৌধুরীর সন্তান হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান ও ব্যবসায়ী নেতা, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলমের নাম। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতার যৌক্তিক অবস্থান রেজাউল করিমকে অনেকেটাই এগিয়ে দেয়। এই ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র মতে, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সিটি করপোরেশন পরিচালনায় আ জ ম নাছির উদ্দীনকে নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন খোদ প্রধানমন্ত্রীরও নেই। কিন্তু নানা কারণে মেয়র নাছিরের প্রতি নাখোশ প্রধানমন্ত্রী। এই নাখোশের মাঝেও মাস তিনেক আগে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাদের সঙ্গে অনির্ধারিত এক আলোচনায় বলেছেন, নাছিরকে ফের মেয়র মনোনয়ন দিলেও পার্টির সেক্রেটারি রাখবেন না। অর্থাৎ তিন মাস আগেও মেয়র-মনোনয়ন ইস্যুতে আ জ ম নাছিরের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব ছিল ইতিবাচক।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার মতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরো আওয়ামী পরিবারের অভিভাবক। আমরা সেই পরিবারের সদস্য। আমরা ভুল বা অন্যায় করলে তিনি আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হবেন, শাসন করবেন এটাই স্বাভাবিক। আমরা যখন বুঝতে পারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের কোনো আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন, তখনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে সেই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করি, প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাই। তিনি আমাদের ক্ষমা করেন, শোধরানোর সুযোগ দেন। কিন্তু কোনো না কোনো কারণে আ জ ম নাছির উদ্দীনকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভুল বোঝার বিষয়টি ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। উপরন্তু মেয়র নাছিরও সেই ভুল ভাঙানোর উদ্যোগ নেননি বা নিতে পারেননি।

সূত্রগুলোর মতে, আ জ ম নাছির উদ্দীন চট্টগ্রামের যেমন মেয়র, তেমনি আওয়ামী লীগের বৃহত্তম একটি ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক। গণভবনে বা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে তার অবাধ যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু গত ৫ বছরে আ জ ম নাছির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খুব বেশি দেখা করেননি। অথচ চট্টগ্রামের উন্নয়ন, সাংগঠনিক নানা উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আ জ ম নাছির প্রতিমাসেই দেখা করতে পারতেন, নিতে পারতেন দিকনির্দেশনা। দল ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আ জ ম নাছিরের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও এই সুযোগ কেন তিনি কাজে লাগাননি সেটা তিনিই ভালো বলতে পারেন বলে সূত্রগুলো মনে করছে।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সামনে চলে আসে মনোনয়ন ইস্যু। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মতে, মনোনয়ন ইস্যুতে আ জ ম নাছিরের পক্ষে দলের অন্যতম দুই শীর্ষ নেতার (একজন চট্টগ্রামের) দৃঢ় অবস্থান ছিল শুরু থেকে। অন্যদিকে প্রভাবশালী সাবেক এক মন্ত্রী ও বর্তমান কেবিনেটের এক জুনিয়র মন্ত্রী মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন আবদুচ ছালামই পাক মেয়র মনোনয়ন।

এর মধ্যেই চলতি মাসের শুরুর দিকে সংসদ ভবনে অনির্ধারিত এক আলোচনায় চট্টগ্রামে ১৫ টি পাহাড় কেটে ৬ কিলোমিটার রাস্তা তৈরির ঘটনায় সিডিএ’কে পরিবেশ অধিদপ্তরের ১০ কোটি টাকা জরিমানা প্রসঙ্গটি উঠে আসে। চট্টগ্রামের তিন মন্ত্রী, এক সাবেক মন্ত্রীর সামনেই প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিতে ছালামের প্রতি উষ্মা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, পরিবেশ ধ্বংস করে রাস্তা নির্মাণের কাজটি খুব খারাপ হয়েছে। পাহাড় সুরক্ষা করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদলে পাহাড়ের উপর দিয়ে রাস্তাটি করা যেতো।

এসময় সাবেক এক পরিবেশমন্ত্রী পাহাড়কাটার স্থানটি পরিদর্শন করেছেন জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী ভূমিমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ৬ বছর ধরে তুমি ভূমিমন্ত্রী, তুমি কেন একবারও গেলে না। এ পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতা, জুনিয়র মন্ত্রীসহ বাকিরা ছালামের পক্ষে মনোনয়ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়েও সাহস করতে পারেননি বলে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে।

এরপর সংসদ ভবনে রংপুরের এক মন্ত্রী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে জানতে চান মনোনয়ন কে পেলে ভালো হবে? দলের শীর্ষ এক নেতা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, যিনি (নাছির) আছেন, তিনিই থাকবেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আরেক নেতা বললেন, ইয়েস- তাকে আরেকবার সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু ওখানেই প্রেসিডিয়ামের এক মেম্বার বললেন, ছালামের কথা। তার সঙ্গে যোগ দিলেন এক জুনিয়র মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের এক সদস্য ইঙ্গিত করলেন নাছিরকেই।

এরপর ১১ আগস্ট একনেক মিটিংয়ে অনির্ধারিত এক আলোচনায় দলের শীর্ষ এক নেতাসহ সিনিয়র এক নেতা সরাসরি আ জ ম নাছিরের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে আরেকবার সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। আরেকপক্ষ অনুরোধ করলেন ছালামের জন্য। এর দুইদিন আগে গ্রেনেড হামলায় আহত মহিলা লীগ কর্মীদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের তহবিলে মোটা অংকের অর্থ অনুদান দেন আবদুচ ছালাম। বিষয়টিও উঠে আসে ওই আলোচনায়। এসময় নাছির-ছালাম দুজনের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে উপস্থিত নেতাদের বিকল্পজনের নাম বলতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। তখনই শীর্ষ এক নেতা, যিনি শুরু থেকেই নাছিরকে চেয়েছিলেন, তিনিই ঘটনার আকস্মিকতায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে রেজাউল করিম চৌধুরীর নাম নিয়ে আসলেন। এসময় নাছিরকে চাওয়া আরেক নেতা (মন্ত্রীসভার প্রভাবশালী সদস্য) রেজাউল করিমের নাম এগিয়ে দিয়ে তার রাজনৈতিক অবদান, ত্যাগ-তিতিক্ষার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রীর সামনে।

প্রধানমন্ত্রী রেজাউলের ব্যাপারে কিছুটা আগ্রহ দেখালেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করলেন না। নামটি বিবেচনার পাশাপাশি সার্চ করতে লাগলেন অন্য নামও। পরদিন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে ফোন পেয়ে আ জ ম নাছিরের জন্য মনোনয়ন চাওয়া হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান (বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভার সদস্য জহুর আহমদ চৌধুরীর সন্তান) ধানমন্ডি পার্টি অফিসে গিয়ে মনোনয়ন ফরম কিনেন।

এদিকে, নাছির-ছালামকে নাকচ করে বিকল্প মানুষ খুঁজতে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-আগ্রহের খবর চাউর হলে চট্টগ্রামের এক এমপি এবং হুইপ চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলমকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চালান। অন্যদিকে, গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে হেলাল উদ্দিন তুফানের মনোনয়ন ফরম কেনার খবর জানতে পেরে সক্রিয় হয়ে উঠেন ছালামকে চাওয়া গ্রুপটি। তাদের সমীকরণ, জহুর আহমদ চৌধুরীর সন্তান তুফান রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের তকমা নিয়ে মেয়র হলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠবে। সেক্ষেত্রে তাকে রোখা আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সেই সমীকরণ থেকে গ্রুপটি এবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন এই বলে যে, ‘আপা, রেজাউল করিম চৌধুরীই হবে সবচেয়ে ভালো সিলেকশন।’

জানা গেছে, ১৬ ফেব্রুয়ারি মনোনয়ন বোর্ডের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বেশিরভাগ নেতাই ছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দীনের পক্ষে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কারো কথা না শুনে রাত ১০ টায় চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে আওয়ামী লীগের তৃণমূলকর্মী রেজাউল করিম চৌধুরীর নামই ঘোষণা করলেন। এর আগে রাত ৮টায় কিছু সময়ের জন্য গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ১৯ মনোনয়ন-প্রত্যাশীর মুখোমুখি হয়ে উঠে যেতে চাচ্ছিলেন। তখন রেজাউল করিম চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে চট্টগ্রামে দলের সাংগঠনিক অবস্থা তুলে ধরে দুই মিনিটের বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে সংগঠনের অবস্থা খুব খারাপ। অধিকাংশ থানা-ওয়ার্ডে কমিটি নেই। কোনো কোনো ওয়ার্ডে দুইজন করে সভাপতি-সেক্রেটারি, মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি হয়েছে প্রায় ৮ বছর। আমরা টানা ক্ষমতায় আছি বলে লোকজনের অভাব হয় না। সভা আহ্বান করলে লোকজনে ভর্তি হয়ে যায়। দুঃসময়ে কাউকে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে দলের সাংগঠনিক অবস্থা খুব খারাপ। মেয়র পদে আপনি কাকে মনোনয়ন দেবেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু দয়া করে দলটা নিয়ে একটু ভাবুন, আপনি একটু নজরপাত করুন।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই বক্তব্যটিও রেজাউল করিমের মনোনয়ন প্রাপ্তিতে প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বক্তৃতায় রেজাউল করিম একবারও মনোনয়নের কথা বলেননি বা চাননি। দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ যারা, তারা নিজের স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থটাকেই সবসময় বড় করে দেখেন। তার উদাহরণ রেজাউল করিম চৌধুরী।’