৬ হাজার মানুষকে চাকরি দিতে চান আছিরন

asironশরীফুল রুকন : মোছাম্মৎ আছিরন নেছা একসময় ছিলেন পাটপণ্যের শ্রমিক। সেখান থেকে হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা। গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান। ৬০০ জন বেকারের (বেশির ভাগই নারী) কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন তিনি। এখন নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মীর সংখ্যা ৬ হাজারে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখছেন আত্মপ্রত্যয়ী এই নারী।
পারিবারিক সিদ্ধান্তে মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে বিয়ে হয়ে যায় আছিরন নেছার। স্বামী খলিলুর রহমান ছিলেন দিনমজুর। এই দম্পতির দুটি কন্যাসন্তান হয়। নাম রাখা হয় কোহিনুর বেগম ও গোলেনুর বেগম। ১৯৭৭ সালের দিকে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সে সময়ের স্মৃতিচারণ করেন আছিরন, ‘খড়ের ঘর ছিল। তাও আবার ভাঙা। বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ত। মাটিতে পাটি বিছিয়ে ঘুমাতাম। অসুস্থ স্বামীর জন্য খরচ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। শাশুড়ি খোদেজা বেগম নিজের একখ- জমি বন্ধক রেখে ঋণের সব টাকা পরিশোধ করলেন। একটি সেলাই মেশিনও কিনে দিলেন। এই সেলাই মেশিন দিয়ে কাজ শুরু করি। দিনে ৪০-৫০ টাকা আয় হত।’
আছিরন জানালেন, ওই সময় গ্রামে কম দামে অনেক পাট পাওয়া যেত। এই পাট দিয়ে পণ্য তৈরি করতে থাকেন পাপোস, ছোট ব্যাগ, খেলনা পুতুলসহ নানা কিছু। এসব পণ্য নিয়ে যেতেন গ্রামের বিভিন্ন মেলায়। এতে পণ্যের প্রচারের পাশাপাশি চাহিদাও বাড়তে থাকে। দুই মেয়েকেও কাজ শেখান। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে পাঁচবছর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে চাকরি করেন, পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষক হিসেবে। এরপর ২০০৭ সালে গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘অনেক আশা’।

চমৎকার এই নামের পেছনেও রয়েছে সুন্দর এক গল্প! আছিরন বলেন, ‘২০০৭ সালে বগুড়ার নুনগোলার একটা বড় মেলায় অংশ নিই। কিন্তু দোকানের কোনো নাম দিতে পারিনি। মেলার একজন আমার দোকানের নাম দিয়েছে ‘অনেক আশা কুটির শিল্প’। সেটে পণ্য বিক্রি খুব ভালো হয়েছে সেবার। ১২ হাজার টাকা লাভ হয়।’
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের জয়রামপুর গ্রামে নিজের বাড়ির পাশেই স্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের শো-রুম ও কারখানা। ২০০৮ সালের দিকে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মী বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ জনে। সে সময়গুলোর কথা উঠতেই আছিরনের চেহারায় দৃঢ়তা। বললেন, ‘নিজেকে শ্রমিক মনে করে কাজ করতাম। প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েও আমি তেমন বিশ্রাম নিতাম না। অন্য শ্রমিকদের চেয়েও বেশি পরিশ্রম করতাম।’
নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে সফল উদ্যোক্তাদের একজন হয়েছেন আছিরন নেছা। তার অধীনেই এখন কাজ করছেন প্রায় ৬০০ কর্মী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাটপণ্য রপ্তানি করছে তার প্রতিষ্ঠান।
আলাপচারিতায় আছিরন নেছা বলেন, ‘আমি শ্রমিক ছিলাম। এখন ৬০০ জন শ্রমিক আমার এখানে কাজ করছে। দেশে-বিদেশে আমার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ৬ হাজার মানুষের কাজের ব্যবস্থা আমি যাতে করতে পারি, সেজন্য দোয়া করবেন। আপনাদের দোয়া-সহযোগিতা থাকলে আমি আরো অনেকদূর যেতে পারবো।’
সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের উঠে আসার পেছনে বেসরকারি সংস্থা ‘কেয়ার বাংলাদেশ’কে কৃতিত্ব দিয়েছেন আছিরন নেছা- ‘দীর্ঘদিন একা একা কাজ করে আমি এগোতে পারিনি। কেয়ার বাংলাদেশ জুট ভ্যালু চেইনের মাধ্যমে আমি পরিচিতি পেলাম। তাদের ট্রেনিং, সহযোগিতা, মেলা অনেককিছু মিলে অনেকদূর আমি এগিয়ে এসেছি।’
আছিরন নেছার দুই মেয়েই বিবাহিত। ৮ শতাংশ জমির ওপর তার বসতভিটা। উপার্জনের টাকা দিয়ে ২০ শতাংশের একটি পুকুর কিনেছেন। তাতে মাছ চাষ হচ্ছে। ছোট মেয়ে গোলেনুর বেগমকে ৮ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করে দিয়েছেন। দুই মেয়েই আছেন মায়ের পাশে, কাজকর্মে-জীবনযাপনে। বড় মেয়ের ছেলে নুর মোহাম্মদ খানমকে সাথে নিয়ে চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে পাটপণ্য মেলায় এসেছেন আছিরন নেছা।
সোমবার (১২ আগস্ট) দুপুরে মেলার স্টলে দাঁড়িয়ে নানির কাজে সহযোগিতা করছিলেন কলেজশিক্ষার্থী নুর মোহাম্মদ খানম। এসময় কথা হয় তার সাথে, ‘পরিবারের সবাই পাটপণ্য তৈরিতে যুক্ত আছেন। এলাকার অনেক মহিলাকে আমার নানি কাজ শিখিয়েছেন। তাদেরকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ দেন। পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ, ট্র্যাভেল-ব্যাগ, ফ্লোরমেট, স্যান্ডেল, পাপোস, শো-পিচ ইত্যাদি তৈরি করি আমরা।’
কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া-জুট ভ্যালু চেইন প্রজেক্টের টেকনিক্যাল ম্যানেজার (লার্নিং অ্যান্ড এডভোকেসী) আরশাদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘আছিরুন নেছার সাফল্য আমাদের উৎসাহিত করে, উজ্জীবিত করে, অনুপ্রাণিত করে। আছিরন নেছারা যাতে ক্ষমতায়নের শীর্ষে যেতে পারেন, সেই প্রত্যাশা করি। আমাদের প্রকল্পের লক্ষ্য নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং একই সাথে নারীর ক্ষমতায়ন।’
নগরের হোটেল আগ্রাবাদে সোমবার শুরু হওয়া পাটপণ্য মেলা চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। বেসরকারি সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া-জুট ভ্যালু চেইন প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনায় ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই মেলায় দেশের ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। মেলাটি সবার জন্য উন্মুক্ত।

*** ব্যাংকগুলো ‘খেয়ে ফেলছে’ পুরুষরা
*** পাটশিল্পের পুনর্জাগরণে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ : রেহানা বেগম রানু