তথ্যমন্ত্রীর পাগলপ্রীতি!


চট্টগ্রাম : তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদকে জড়িয়ে ধরেছেন রাঙ্গুনিয়ার মুছা পাগলা। বুকে রেখেছেন মাথা। দিলেন মিলিয়ন ডলারের এক হাসি, যে হাসি নির্ভরতার, আস্থার। সেরকম একটি ছবি তথ্যমন্ত্রী নিজেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে আপ দিয়েছেন তার ফেসবুকে।

কেবল মুছা পাগলা নয়, নির্বাচনী এলাকা রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ানজী পুকুর পাড়স্থ বাসভবনের আশপাশে এমনকি ঢাকা শহরেরও অনেক পাগল তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের ভক্ত। মন্ত্রীর আগমন টের পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। কখনো কখনো চলন্ত গাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে যায়। তথ্যমন্ত্রী ন্যূনতম বিরক্ত হন না তাতে, বরং মমতায় কাছে টেনে নেন, জড়িয়ে ধরেন। হাতে তুলে দেন নতুন টাকা।

এদিকে, মন্ত্রীর এই পাগলপ্রীতিতে পোয়াবারো অবস্থা পাগল সম্প্রদায়ের। রাঙ্গুনিয়ার মুছা পাগলা তো একবার মোবাইল ফোনই চেয়ে বসে তথ্যমন্ত্রীর কাছে। গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বিশাল নির্বাচনী সমাবেশ রাঙ্গুনিয়া মডেল হাই স্কুল মাঠে। প্রধান অতিথির বক্তৃতা করছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ড. হাছান মাহমুদ।

এমন সময় হাজারো মানুষের ভিড় ঠেলে অলক্ষ্যে সোজা মঞ্চে উঠে পড়েন মুছা পাগলা। পরনে স্যাঁতস্যাতে পুঁতিগন্ধময় কাপড়। মঞ্চে বসা কোনো কোনো নেতা মুছা পাগলার এমন আগমনে বেজায় বিরক্ত – ‘হায় হায়, এ কী করলো মুছা পাগলা! সর্বনাশ করলো’- বলেই মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিতে চান কেউ কেউ। না, কিছুতেই নামবে না মুছা। তার আত্মবিশ্বাসের জায়গা হাছান মাহমুদ; তার নজরে এলে তাকে নামতে তো বলবেনই না, উল্টো খাতিরযত্ন করবেন।

শেষমেষ তাই হলো-বক্তৃতার ফাঁক গলে হাছান মাহমুদের নজর পড়লো মুছার দিকে। থাক থাক বলে মঞ্চে উপবিষ্টদের নিবৃত্ত করলেন আর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘এই মুছা বয় বয়।’ পরক্ষণে আবার বললেন, ‘স্লোগান ধর্।’

সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্লোগান ধরলেন মুছা পাগলা- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, তোমার আমার মার্কা কী, নৌকা নৌকা, আমার নেতা তোমার নেতা, হাছান ভাই হাছান ভাই।’ মুহূর্তে পাল্টে গেলো সমাবেশের চিত্র – মুছা পাগলার সাথে সমস্বরে স্লোগান ধরলেন সমাবেশের লক্ষাধিক মানুষ। সবার যোগে গগনবিদারি স্লোগান, যে স্লোগানে ছন্দ পেলো সেদিনের সমাবেশ, সৃষ্টি হলো অন্যরকম এক মাদকতা।

জানা গেলো, রাঙ্গুনিয়ায় আগে পাগল, ভবঘুরের সংখ্যা ছিল মাত্র দুই থেকে তিন জন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০ জনের বেশি। যাদের খবর আর কেউ না জানলেও জানেন তথ্যমন্ত্রী। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, সেই পাগলদের সবার নামও মুখস্ত তাঁর।

সপ্তাহান্তে নির্বাচনী এলাকা সফরে যান তথ্যমন্ত্রী। তখন তাদের অবস্থা হয় পোয়াবারো। দলের নেতাকর্মীদের চেয়ে কোনো অংশে কদর কম নয় পাগলদের। সেটা তারা উপলব্ধি করেন গভীরভাবে। তাই মন্ত্রী গেলে পথে পথে এইসব পাগলরা বসে থাকেন, ব্যারিকেড বসান, অপেক্ষা করেন মন্ত্রীর জন্য। যতই ব্যস্ততা থাকুক-মন্ত্রী তাদের দেখলে বুকে টেনে নেন। পাগলদের এত কদর দেখে কেউ কেউ ঈর্ষাকাতর হন-‘ইস্ আমি যদি পাগল হতাম!’

সম্প্রতি নগরের বায়েজিদ এলাকায় এক স্কুলশিক্ষকের বাসায় যাচ্ছিলেন হাছান মাহমুদ। রাজপথ হাঁকিয়ে চলছে মন্ত্রীর পতাকাবাহি গাড়ি। সাথে পুলিশের হুঁইসেল। গাড়ি ইউটার্ন নিয়ে লালখানবাজার পার হতেই স্থানীয় এক পাগল দাঁড়িয়ে গেলেন মন্ত্রীর গাড়ির সামনেই। এমন দৃশ্যে সহকর্মীদের কেউ কেউ ভড়কে গেলেন, হায় এ কী! কিন্তু হাছান মাহমুদ ঠিকই বুঝলেন- আগন্তুকটি আর কেউ নয়, পাগলদলের সদস্য। ব্যস্ততম সড়কে অমনই গাড়ি থামালেন মন্ত্রী। সেই পাগলকে কাছে টেনে নিলেন। দিলেন নগদ অর্থ-সাহায্য।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ কখন কোথায় যান, কোন রাস্তা ধরে চলেন এসব খবর কেমন করে যেন চলে যায় পাগলদের কাছে। ধানমন্ডির বাসা থেকে বেরিয়ে ঢাকার পথ ধরে চলতে গিয়ে হরহামেশা পাগল, ভবঘুরেদের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। শুনতে হয় তাদের আবদার। অর্থ সাহায্যের সাথে ছবির আবদারও পূরণ করেন কারো কারো।

এই পাগলপ্রীতি বা পাগলপ্রশ্রয় কেন- টেলিফোনে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ হু হু করে হেসে ওঠেন। বলেন, কেন এই প্রশ্ন হঠাৎ! মুছা পাগলার সাথে ছবি পোস্ট দেওয়ার বিষয়টি সামনে এলো তখন।

তথমন্ত্রী বললেন, পাগলরা অনেক ভালো। তাদের সঙ্গ, তাদের আবদার আমার ভালো লাগে। তাই যত ব্যস্ততা থাকুক, এমনকি চলন্ত গাড়ি থামিয়েও আমি তাদের সাথে কথা বলি। নতুন টাকা হাতে দিই। প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাদের কথা মনে করে আলাদা টাকা নিয়ে বের হই।

বলা হচ্ছে, আপনার এই পাগলপ্রীতির কারণে রাঙ্গুনিয়ায় পাগলের সংখ্যা বাড়ছে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় আগে ২-৩ জন পাগল ছিল, এখন সেই সংখ্যা ১০-১২ জন হয়েছে। পাগলদের ভালোবাসেন বলে আপনার সহমর্মিতা লাভের আশায় কেউ পাগলের ভান করে কিনা- এমন প্রশ্নে তথ্যমন্ত্রীর জবাব – না, না তা নয়। তারা আগে থেকেই ছিল। তাদের প্রতি আমার ‍দৃষ্টিভঙ্গির কথা শুনে হয়তো বাকি পাগলগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। কেবল পাগল-ভবঘুরে নয়, অনাথ-অসহায়, ভিক্ষুক যেই হোক আমি কাউকেই ফিরাই না। চট্টগ্রামসহ দেশের যে প্রান্তে আমি সড়ক পথে চলাচল করি তখন এ ধরনের কাউকে দেখলে থেমে যাই, কাছে ডেকে নিই।

আর এই মানবিক দীক্ষাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পেয়েছেন বলে জানান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন বিমানে চলাফেরা করছেন। যখন বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন, সড়কপথে রাজনৈতিক কারণে সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। তখন কাছ থেকেই দেখেছি, পাগল-ভবঘুরে, ভিক্ষুক দেখলে ৩০-৪০টি গাড়ির বহরেই থেমে যেতেন প্রধানমন্ত্রী। পরম মমতায় তাদের আগলে ধরতেন। জড়িয়ে নিতেন।