
চট্টগ্রাম : বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ বেড়ে গেছে দুর্গন্ধময় মৌসুমি মাছ (হোয়াইট স্পটেড র্যাবিটফিস)। গত কয়েক মাস ধরে বাণিজ্যিক মৎস্যশিকারী জাহাজগুলোতে ধরা পড়া মাছের ৪০ শতাংশই এ ধরনের মাছ। অন্যান্য মাছের সঙ্গে আহরিত হওয়া দুর্গন্ধময় মৌসুমি মাছগুলো খাওয়া যায় না। ফলে বাণিজ্যিক মূল্য না থাকায় লাভের পরিবর্তে লোকসান গুণছেন মৎস্য শিকারীরা। বিষয়টি চিন্তায় ফেলেছে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতরকেও।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মাছটির নাম মৌসুমি ফিস বলা হলেও এটির বৈজ্ঞানিক নাম হোয়াইট স্পটেড র্যাবিটফিস। র্যাবিটফিসের গায়ে সাদা স্পট বা ফোঁটা ফোঁটা দাগ রয়েছে। এটি লম্বায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয় এবং ওজন গড়ে ১২০ গ্রাম পর্যন্ত। পার্সিফরমেস পর্বের মাছটি সিগানিডা ফ্যামিলির অন্তর্ভূক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম সিগানাস কানালিকালাটাস। মূলত এই প্রজাতির মাছের গায়ে অর্থাৎ উপরের দিকে তেলাপিয়া মাছের মতো কাঁটা থাকায় বঙ্গোপসাগরে অন্যান্য মাছের পরিমাণ কমে গেছে।
মাছটি থেকে এক ধরনের দূর্গন্ধ বের হয় এবং এটি খেতে বিস্বাদ। রক্তের রঙ ধূসর। ৮টা ১০টি মাছে এক কেজি। জালে ঝাঁকে ঝাঁকে এই মাছ ধরা পড়লেও এর বাণিজ্যিক মূল্য নেই বললেই চলে। এ কারণে একটি ১৫ থেকে ২৫ দিনের ভয়েজ শেষ করে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ অবাণিজ্যিক এই মাছ আহরণ করায় লোকসানে পড়েছেন বাণিজ্যিক ট্রলার ও জাহাজগুলো। আর এতে দেশে সামুদ্রিক মাছের সংকটও তৈরি হয়েছে বাজারে।
কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজের ভয়েস রেকর্ডের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এফবি (ফিশিং ভ্যাসেল) জাহাজ ২৪ দিনের ভয়েজ (সমুদ্রে মৎস্য শিকারে যেতে অনুমতির সময়সীমা) শেষে মাছ আহরণ করে কর্ণফুলীতে ফিরে আসে ২৬ জানুয়ারি। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতরের ৮ নং ভয়েজে ২২ দিনের ভয়েজ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। জাহাজটি ৩টি জাল নিয়ে ৪৫ জন নাবিক ছিল। এই সময়ে বাণিজ্যিক মৎস্য শিকারী জাহাজটি সর্বমোট এক লাখ ২৪ হাজার ৭৪০ টন মাছ আহরণ করে ফিরে আসে। ২৭ জানুয়ারি সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে নিট মাছ খালাস করে এক লাখ ২২ হাজার ৯৪৯ টন। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭৪৫ টনই মৌসুমী মাছ বা হোয়াইট স্পট র্যাবিট ফিস। যা খালাসকৃত মাছের ২১ শতাংশ।
অপরদিকে ট্যাকনো ফিশিং গ্রুপের এফবি সী পাওয়ার-৪ জাহাজের চিত্র আরও করুণ। প্রায় ২২ দিনের ভয়েজ শেষে গত ৭ মার্চ কর্ণফুলীতে ফিরে আসা জাহাজটির সিংহভাগ আহরিত মাছই ছিল রাবিট ফিস। গত ৮ মার্চ জাহাজটি থেকে আহরিত মাছ খালাস করা হয়। জাহাজটি সর্বমোট এক লাখ ১৬ হাজার ৫৪০ টন মাছ শিকার করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ওই ভয়েজে জাহাজটির আহরিত মাছের ৫১ হাজার ৫২০ টন ছিল মৌসুমি মাছ। যা আহরিত মাছের ৪৪ দশমিক ২১ শতাংশই মৌসুমি মাছ। নামমাত্র মূল্যে মাছগুলো বিক্রি হওয়ায় ভয়েসের খরচের টাকাও ওঠেনি বলে জানিয়েছে জাহাজটির কর্মীরা।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতর বলছে, গত ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে দুর্গন্ধময় মাছটি এভাবে দেখা যায়নি। মৌসুমি মাছের কারণে সার্ডিন, বঙ্গোপসাগরে মেকারেল ও অন্যান্য মাইগ্রেটরি মাছের পরিমাণ কমে গেছে। গত নভেম্বর মাস থেকে মৌসুমি মাছ বঙ্গোপসাগরের ৪টি ফিশিং গ্রাউন্ডের ২টিই দখল করে আছে। মিড ওয়াটার ট্রলারগুলো জাল ফেললেই উঠে আসছে প্রচুর পরিমাণ মৌসুমি মাছ। প্রায় সব ট্রলার বা জাহাজেই মৌসুমি মাছের আহরণ মোট মাছের ১৫-২০ শতাংশ। তবে এক তৃতীয়াংশ জাহাজেই মৌসুমী মাছ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশেরও বেশি।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশে সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়েছে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭৬ টন। কিন্তু পরবর্তী বছর ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮৭ টন। বঙ্গোপসাগরের ৪টি ফিশিং গ্রাউন্ড রয়েছে। এর মধ্যে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড ছাড়া প্রায় প্রতিটি গ্রাউন্ডেই র্যাবিট ফিসের আধিক্যের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের শীর্ষ একটি বাণিজ্যিক মৎস্য শিকারী প্রতিষ্ঠানের এক ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা বলেন, চলতি বছরের শুরুতে তাদের এক ভয়েজে প্রায় ১৮০ টন মাছ আহরণ হয়। যার মধ্যে প্রায় ৯০ টন মাছই ছিল র্যাবিট ফিস। নিয়মিত ভয়েজে আহরিত মাছের কেজিপ্রতি গড় দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকা হলেও বর্তমানে মাছের গড় দাম ৪০ টাকায় নেমে এসেছে। এতে প্রায় প্রতিটি ভয়েজে লোকসান দিয়ে মাছ আহরণ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ হোয়াইট ফিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব তাজুদ্দিন তাজু একুশে পত্রিকাকে বলেন, সাগরে ধরা পড়া মাছের একটি বড় অংশের বাণিজ্যিক মূল্য নেই। এতে প্রতিনিয়ত লোকসান হচ্ছে। এখন আবার করোনার কারণে মৎস্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে ও মাছের চাহিদা কমে গেছে। সবমিলিয়ে ক্ষতির উপর ক্ষতি। এই দূরবস্থা আদৌ কাটিয়ে উঠতে পারবো কিনা জানি না।
জানতে চাইলে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতরের পরিচালক মো. লতিফুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, গত ডিসেম্বর থেকে হোয়াইট স্পটেড র্যাবিটফিস বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে শুনছি। এই মাছ বেশি পাওয়ার কারণ হতে পারে, যে মাছগুলো তাদের খায় তাদের সংখ্যা কমে গেছে। আবার অন্য কোন কারণও থাকতে পারে। কয়েকমাসের হিসাব নিয়ে আসলে কিছু বলা কঠিন। আমরা বছরখানেক পর্যবেক্ষণ করবো। এরমধ্যে করণীয় নির্ধারণ করবো।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। এই মাছের ক্ষেত্রেও আলাদা করে সুনির্দিষ্ট কৌশল পরিকল্পনা করতে সময় দরকার। তবে হোয়াইট স্পটেড র্যাবিটফিসের আধিক্যের বিষয়টি অবশ্যই দুশ্চিন্তার।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিস সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, বনে যখন হরিণ বেড়ে যাবে, তখন ধরে নিতে হবে বাঘ কমে গেছে। তেমনি সাগরে র্যাবিটফিসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে তাদের যে মাছগুলো খায় তাদের সংখ্যা কমে গেছে। আমাদের সমুদ্রের সার্বিক মজুদ ঠিক থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু মাছের মনে হচ্ছে অতিরিক্ত আহরণ হয়েছে। যার কারণে এমনটা হতে পারে।
তিনি বলেন, এই ঘটনা বঙ্গোপসাগরের ইকোসিস্টেমের বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। তবে এক বছরের তথ্য দিয়ে র্যাবিটফিসের আধিক্য বেড়ে যাওয়ার কারণ নির্ধারণ করা যাবে না। আরো বছর দুয়েক দেখতে হবে। এরপর কারণ নির্ণয় ও প্রতিকার নিয়ে কাজ করা যাবে।
