ঢাকা : সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিছুই নয়। বেশ কয়েকদিন ধরে জ্বর কমছে, বাড়ছে। এ অবস্থায় গিয়েছিলেন বাসা থেকে হাঁটা দূরত্বের শমরিতা হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জ্বরের রোগীক বলে ভর্তি দূরের কথা, বহির্বিভাগ চিকিৎসাও দিলো না। এরপর ছুটলো ঢামেক হাসপাতালে। অনেক আকুতি অনুনয়-বিনয়ের পর সরকারি হাসপাতালটি ভর্তি নিলো বটে, কিন্তু করোনার ভয়ে চিকিৎসা দিচ্ছিল না, পাশে যেতে দিচ্ছিল না স্ত্রী, বোনকেও।
ঢামেক চিকিৎসক নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষাগারে পাঠালেন। রিপোর্ট পাওয়া সাপেক্ষে হবে চিকিৎসা। অনেক আকুতির পরও চিকিৎসা জোটেনি তুষারের ভাগ্যে। বিনা চিকিৎসার ফল যা হবার তাই হলো। শেষপর্য়ন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তুষার বাগচী (৪৫)।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে তুষার বাগচীর মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার ভাতিজা বাংলা একাডেমির উপ পরিচালক তুষার তপন বাগচী। সেই স্ট্যাটাসে তিনি বিনা চিকিৎসায় তার ভাতিজা মৃত্যুবরণ করেছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি জানান, জ্বর হয়েছিল তুষারের। হটলাইনে কল করে বাসায় বসেই চিকিৎসা নিচ্ছিল। কিন্তু জ্বর না কমায় বাসার পাশে হাঁটাপথের দূরত্বে যায় শমরিতা হাসপাতালে। জ্বরের রোগী বলে তারা কেনো চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সাধারণ মাসুষের আশ্রয়স্থল সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিতে চাইলে এম্বুলেন্স সুবিধা দেয়নি। হট লাইনে এম্বুলেন্স যোগাড় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও নানান টালবাহানা শেষে ভর্তি নেয়। তবে করোনা সন্দেহ করে তার স্ত্রী ও বোন উপস্থিত থাকার পরেও রোগীর সঙ্গে যেতে দেয়নি। ১৫ মিনিট পরে জানানো হয় রোগী মারা গেছে। চিকিৎসা পেল না ছেলেটি। তখন মরদেহ দিচ্ছে না করোনা রিপোর্ট পাওয়ার আগে। দুই দিন পরে রিপোর্ট এলো, করোনা নেই রোগীর দেহে। সুখবর বটে! কিন্তু আমার ভাইপোকে কি আর ফেরৎ পাবো? সাধারণ জ্বরেই সে মারা গেল! করোনার ভয়ে শমরিতা ফিরিয়ে দিল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তাঁকে বাঁচাতে পারল না! কার কাছে অভিযোগ করব? এই যে আমার ভাইপো জ্বরের চিকিৎসা পেল না, এর দায় কে নেবে?
জাতির কাছে এভাবেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন হতভাগ্য তুষার বাগচীর ভাতিজা সাংবাদিক, সাহিত্যিক তপন বাগচী।
তুষারের স্মৃতিচারণ করে তার তপন বাগচী লিখেন, তুষার আসলে আমার কাকা হয়। বয়সে ছোট বলে সে-ই আমাকে কাকু বলে ডাকত। তাই ভাইপো বলে পরিচয় দিতাম। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁকে অংক ও বিজ্ঞান পড়িয়েছি কয়েকদিন। এসএসসিতে ৬ বিষয়ে লেটারমার্কস নিয়ে পাস করেছে। গণিতে এমএসসি পাস করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। তুষারের এক বোন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে চাকরি করে, আরকে বোন আইনজীবী। তার বাবা-মা এখনো জীবিত। তার বাবা গোকুল বাগচী মাদারীপুর রাজৈর এলাকায় সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত মানুষ হিসেবে সম্মানিত। আমার খাতির বেশি ওই গোকুল বাগচীর সঙ্গে। প্রখর বুদ্ধি আর পাণ্ডিত্যের জন্য গ্রাম্য শালিসিতে তাঁর সামনে কথা বলার সাহস খুব মানুষেরই হতো। তুষার আমাকে ভালবাসত। ঢাকায় আসার পরে দেখাসাক্ষাৎ কম হলেও খোঁজ খবর রাখতাম। তাকে অকালে হারাতে হলো। এটা মেনে নেওয়া কঠিন।
তুষার, তোমাকে ভালবাসতাম কাকু। ক্ষমা করো আমাদের যাবতীয় অক্ষমতাকে।- যোগ করেন তপন বাগচী।
