বাঙালির শাশ্বত উৎসব-আকাশে কালো মেঘ

রিপন বড়ুয়া রিক : ভোরের আলো ফোটার আগেই ফুল (বিউফুল) সংগ্রহ করতে যাওয়া, বুদ্ধমূর্তির আসন (প্রতীকী) কীভাবে বানানো হবে, কোন কোন এলাকায় গিয়ে বুদ্ধমূর্তি স্নান করানো হবে, সাউন্ড সিস্টেম দিয়ে এলাকার যুবকদের খুশী, নানান রঙের ফুল দিয়ে এক টুকরো কলাপাতায় সাজিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া, এরপরে নদীতে স্নান করে পরিশুদ্ধ হয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে নতুন কাপড় পড়ে বের হওয়ার কোনো কিছুরই পরিকল্পনা ও কার্যক্রম নেই এই সময়।

পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাস নামক মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে সকল কিছু বন্ধ করে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে মানুষ এখন ঘরবন্দি।সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল প্রকার সামাজিক অনুষ্ঠানসহ এইসব বন্ধের জন্য প্রতিটা এলাকায় ও বিহারে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু পক্ষে এই নির্দেশ পালন করতে বলা হয়। যার ফলে সকল প্রকার উৎসবসহ চৈত্র সংক্রান্তি, বৈসাবির সকল কার্যক্রম এবার করা হচ্ছে না।

বৈশাখের আগে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন যেমন বাঙালির উৎসব, তেমনি প্রাচীন প্রথানুসারে বসন্তের বিদায়ও হয় উৎসব করে। বসন্তের শেষ মাস চৈত্র, আর চৈত্রের শেষ দিন সংক্রান্তি।

বাংলাদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধাণ ৩টি আদিবাসী সমাজের প্রধাণ সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর একটি “চৈত্র সংক্রান্তি” ও “বৈসাবি”। বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু এই তিন নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে বৈসাবি নামের উৎপত্তি। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করে বাংলা নববর্ষ। পুরোনো বছরের কালিমা আর জীর্ণতাকে ধুয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় তারা।

অন্যন্যা বার ১২ এপ্রিল পালন করা হতো ফুলবিজু। এই দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ে ফুল সংগ্রহের জন্য। সংগৃহীত ফুলের একভাগ দিয়ে বুদ্ধকে পূজা করা হয় আর অন্যভাগ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বাকি ফুলগুলো দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়।

চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাত্‍ ১৩ এপ্রিল পালন করা হয় মূলবিজু। এইদিন সকালে গ্রামে গ্রামে, বিহার প্রাঙ্গণে বুদ্ধমূর্তি বসিয়ে “বুদ্ধস্নান” করে পূজা করা হয়। ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধ দাদা-দাদি এবংনানা-নানিকে গোসল করায় এবং আশীর্বাদ নেয়। এই দিনে ঘরে ঘরে বিরানী, সেমাই, পাজনসহ (বিভিন্ন রকমের সবজির মিশ্রণে তৈরি এক ধরনের তরকারি) অনেক ধরনের সুস্বাদু খাবার রান্না করা হয়। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসে ঘরে ঘরে এবং এসব খাবার দিয়ে তাদেরকে আপ্যায়ন করা হয়।

দিনরাত চলে ঘোরাঘুরি। বাংলা নববর্ষের ১ম দিন অর্থাত্‍ ১৪ এপ্রিল পালন করা হয় গজ্যা পজ্যা দিন (গড়িয়ে পড়ার দিন)। এই দিনেও বিজুর আমেজ থাকে। সাধারণত বছরের শেষ দুইদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন বর্ষবরণ উৎসব বৈসাবি পালিত হয়।

বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই উৎসবের গায়ে পেরেকে টুকে দিলো করোনা নামক অদৃশ্য এক অনুজীব।আমার জানা মতে, বাঙালির উৎসব-আকাশে এমন কালো মেঘ আর কখনো দেখা যায়নি।

রিপন বড়ুয়া রিক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।