
চট্টগ্রাম : ‘ছেলে এসে জানাল, বাবা করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটা হাসপাতাল হচ্ছে। আমি সেখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে বললাম-যাও, মানবসেবা আগে। যদি ফিরে আসো তবে তুমি বীর, না এলে শহীদ। আমি আমার ছেলেকে করোনা রোগীদের সেবার জন্য এই হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দিয়ে দিলাম।’
প্রিয় পাঠক, করোনা-আক্রান্তরাই যেন এখন জগতে সবচেয়ে অবহেলিত, অচ্ছুৎ জনগোষ্ঠী। তাদের ছুঁলেই বিপদ, সংক্রমণের ভয়। কী প্রিয়জন, কী স্বজন, কী বন্ধু, কী প্রতিবেশি কেউ নেই করোনা-আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে। সেবাব্রতী দেবতা বলা হয় যাদের, মানবতাই যাদের ধর্ম; সেই চিকিৎসক সমাজেরও ভূমিকা যখন তটস্থ, প্রশ্নবিদ্ধ তখনই করোনা-রোগীদের জন্য নিজের ছেলেকে সঁপে দিয়ে উপরের কথাগুলো বললেন এই সমাজেরই এক মানবিক বাবা, সময়ের সাহসী বাবা।
বলছিলাম নগরের আকবর শাহ থানার লতিফপুর এলাকার আবদুস সালামের বীর-বীরত্বের কথা; হ্যাঁ চট্টগ্রাম কলেজে বিএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া ছেলে ওমর ফারুককে সোমবার (১৩ এপ্রিল) নির্মিয়মাণ করোনা ফিল্ড হাসপাতালে দেখতে এসেছিলেন বাবা সালাম। সাথে নিয়ে এসেছিলেন রান্না করা খাবার, যে খাবার ছেলের মুখে তুলে দিয়েছেন, তুলে খাইয়েছেন অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের, এমনকি উপস্থিত হাসপাতালের স্বপ্নদ্রষ্টাকেও।
আবদুস সালামের অভিমত, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবাইকে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসা উচিত। বিশেষ করে যারা যুবক, তাদেরকেই আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে হবে। জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে, যারা আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসে আল্লাহ তাদেরই পক্ষে থাকেন।- বলেন আবদুস সালাম।
এর আগে রোববার (১২ এপ্রিল) ওমর ফারুক তারেক ফেসবুক গ্রুপে খবর পেয়ে ফিল্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব শর্ত মেনে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন।
এ প্রসঙ্গে ওমর ফারুক বলেন, আমার খুব স্বপ্ন ছিলো দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করবো। করোনা মহামারির এই বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাবে এটাই সুযোগ মানবসেবায় নিজেকে কাজে লাগানো। তাই আমি চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ফারুক বলেন, বিশ্বে এখন মানবতার সংকট চলছে। এই সংকটময় মুহূর্তে সবার উচিত সাধ্যমত মানবসেবায় এগিয়ে আসা। আমার বিশ্বাস সবার সম্মিলিত মানবিক চেষ্টা করোনা ভাইরাসকে নির্মূল করতে পারবে।
চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সিইও ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে জানান, হাসপাতালের জন্য কিছু স্বেচ্ছাসেবক চেয়ে ফেসবুক গ্রুপে একটা স্ট্যাটাস দিই। সেই সূত্রে বেশ কয়েকজন আমার সাথে যোগাযোগ করে। তাদের আমি ঝুঁকির বিষয়টিও জানাই। ঝুঁকি আছে জেনেও তারা সানন্দে রাজি হয়েছে। আসলে ফারুকের মতো এমন সাহসী আর মানবিক যুবকরা আছে বলেই এই হাসপাতাল আলোর মুখ দেখছে। ফারুকরাই এই হাসপাতালের প্রাণশক্তি।
প্রসঙ্গত, জীবন-সঙ্কট, মানবিক-সঙ্কটের এক চরম যুগসন্ধিক্ষণে ঘৃণা, ভয় সর্বোপরি মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে করোনা রোগীর চিকিৎসার লক্ষ্যে মানবিক শক্তিতে বলীয়ান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুত বড়ুয়ার দুর্নিবার ইচ্ছায় গড়ে উঠছে নগরের আকবর শাহ থানাধীন পাক্কা রাস্তার মাথা এলাকায় চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল।
সবকিছু ঠিকটাক থাকলে আগামি ২০ এপ্রিল উদ্বোধন হবে ৬০ শয্যার এই হাসপাতালটি। এখানেই পরম মমতা, যত্ন-আত্তি, গানে-সুরে, অপত্য সেবায় সুস্থ করে তোলার এক মানবিক যুদ্ধ চলবে করোনামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ না হওয়া পর্য়ন্ত।
এদিকে, মানবিক এই যুদ্ধক্ষেত্র তথা হাসপাতালটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে মানবিক-খড়ার মাঝেও চিকিৎসক, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক মিলিয়ে এগিয়ে এসেছেন অন্তত ১৭০ জন। ইতোমধ্যে চূড়ান্তভাবে বাছাই হয়েছেন ২০ জন মানবিক কর্মী। আর তাদের একজন ওমর ফারুক তারেক, যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন কর্মীও।
