
চট্টগ্রাম : ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা বিএনপির শ্রম বিষয়ক সম্পাদক। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পাশাপাশি বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি।
বলাবাহুল্য, পটিয়া উপজেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় সেই নেতা এখন মস্তবড় আওয়ামী লীগার। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর পটিয়া থেকে নির্বাচিত সরকার দলীয় সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীর হাত ধরে আওয়ামী লীগ যোগ দেন তিনি।
আওয়ামী লীগের তরিতে উঠেই রাজনৈতিক বিবেচনায় সার চোরাচালান ও জায়গা দখলের দুটি মামলা থেকে অব্যাহতি পান রাতারাতি। শুধু তা নয়, পেযে যান আওয়ামী লীগের পদপদবী। জন্ম থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শিক নেতাকর্মীদের ঘাম-শ্রম-ত্যাগ পদপিষ্ট করে বনে যান বড়লিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব মুঠোবন্দির পর এবার তিনি ছিনিয়ে নিতে চান বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ‘নৌকা’। হতে চান বড়লিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এজন্য কোমড় বেধে নেমেছেন তিনি। যেভাবেই হোক নৌকা প্রতীক তার চাই-ই। নৌকা পেলেই হবেন চেয়ারম্যান- এ বিশ্বাস তার!
প্রিয় পাঠক, দল বদলের আগে এবং পরে সুবিধাভোগী রাজনীতির খেলায় দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখানো এই ব্যক্তির নাম ইউনুচ তালুকদার। তিনি নিজেই সবার সাথে দলবদলের গল্প করেন রাখঢাক ছাড়া। গর্বের সাথে বলে বেড়ান বিএনপির ও আওয়ামী লীগে কোন কোন পর্যায়ে খেলেছেন।
সম্প্রতি ইউনুচ তালুকদারের এ ধরনের সংক্ষিপ্ত দুটি ভিডিও আসে একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে। একটি ভিডিওতে ঘরোয়া আড্ডা্য় ইউনুচকে বলতে শোনা যায়, তিনি ১৯৯৬ সালে পটিয়া উপজেলা বিএনপির শ্রম সম্পাদক, ২০০১ সালে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
অপর ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার একটি টক শো স্মার্ট ফোনে দেখছেন ইউনুচ তালুকদার। খালেদা জিয়ার মুক্তি-প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানার জ্বালাময়ী বক্তব্য বিশ্লেষণ মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন তিনি। মাথা নেড়ে তার বক্তব্যে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি সামনে বসা একজনের সাথে এ সংক্রান্ত আলোচনায় খালেদা জিয়ার প্রশংসা করতেও দেখা যায় তাকে। একপর্যায়ে খালেদা জিয়াকে আপোসহীন নেত্রী বলতেও শোনা যায়।
ভিডিও’র এই কথোপকথন সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পটিযা বড়লিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ইউনুচ তালুকদার ১৯৯৬ সালে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের পদ-পদবিতে থাকার কথা স্বীকার করেন।
তবে তার দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে চাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিএনপি দলীয় সাংসদ গাজী শাহজাহান জুয়েলের ভগ্নিপতি সাইফুদ্দিন খালেদ বাবুলের রোষানলে পড়েন তিনি।
তিনি বলেন, পটিয়া থানায় দায়িত্ব পালন শেষে পাঁচলাইশ থানায় বদলি হওয়া এসআই আবুল কালামকে দিয়ে বাবুলই আমার বিরুদ্ধে শহরের খতিবের হাট এলাকায় জমিদখল মামলা এবং পরবর্তীতে ওই এসআই টেকনাফ থানায় বদলি হওয়ার পর সেখানেও একটি সার চোরাচালানের মামলায় আমাকে চার্জশীটভুক্ত আসামি করা হয়।
আমার বাড়িতে বারবার পুলিশ পাঠিয়ে হয়রানি করা হয়। ওইসময় আমার একটি শেল্টার দরকার ছিল। তাই বিএনপি সরকারের শেষ দিকে আজকের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর শেল্টার গ্রহণ করি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে সামশুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগ দিই এবং তিনিই রাজনৈতিক বিবেচনায় আমার মামলা দুটি প্রত্যাহার করিয়ে নেন।
হুইপ সামশুল হকই আমাকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন এবং আগামি বছরের জুন মাসে অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। যোগ করেন ইউনুচ।
আজীবন বিএনপি করে আওয়ামী লীগে এলেন, আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চেপে মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নিলেন। আওয়ামী লীগের পদ-পদবি, ব্যবসা-বানিজ্যসহ নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এরপরও আপনার কাছ থেকে বিএনপিপ্রীতি যায়নি, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, খালেদা জিয়ার প্রশংসা করছেন-ব্যাপারটা কেমন না – এরপর ইউনুচ তালূকদার বললেন, না, না আমি খালেদা জিয়ার পক্ষে বলিনি। আওয়ামী লীগ আমার অনেক উপকার করেছে। যার নুন খাই, তার গুণ তো গাইতে হয়। বিএনপি বা খালেদা জিয়ার পক্ষে বলার প্রশ্নই আসে না। যোগ করেন ইউনুচ তালুকদার।
এদিকে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বিদেশ থেকে নোয়াপাড়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের আনা ৫শ’ মেট্রিক টন টিএসপি সার নোঙর করার সময় জাহাজে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট সারগুলো জাহাজ থেকে অপসারণের জন্য ঠিকাদারির দাযিত্ব পায় ইউনুচ তালূকদারের মালিকানাধীন শাহ আমানত ট্রেডিং।
এরপর নষ্ট সারগুলো রোদে শুকিয়ে পুনরায় প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করার অপরাধে গত বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেলুল কাদের হাতেনাতে একজনকে আটক করে ইউনুচ তালুকদারের গুদামটি সিলগালা করে দেন।
জানা যায়, আটক ব্যক্তির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ইউনুচ তালুকদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিলে উপর মহলের নির্দেশে বাধাগ্রস্ত হন তৎকালীন ইউএনও। সার বিক্রির পথ নির্বিঘ্ন রাখতে গুদামে অন্যায়ভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ তুলে উল্টো ইউএনও’র বিরুদ্ধে আদালতে মামলা টুকে দেন ইউনুচ তালুকদার। এরপর দ্বিগুন শক্তিতে নষ্ট সারগুলো বিক্রি করে কোটি টাকার মালিক হয়ে যান তিনি।
বিষয়টি অস্বীকার করে ইউনুচ তালুকদার বলেন, আমার ব্যবসাটাই হচ্ছে সারের। সার বেচে আমি খাই। পরীক্ষা করে দেখা গেলো, ভেজা সারগুলোর ৩৩ শতাংশ কার্যকারিতা আছে। যা চা-বাগান এবং মৎস্যখামারে অনায়াসেই ব্যবহার করা যায়। তাই সারগুলো আমি কিনে নিয়ে শুকিয়ে প্যাকেটজাত করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চা-বাগান ও মৎস্যখামারিদের কাছে বিক্রির চেষ্টা করতে গেলে ইউএনও সাহ্বে বাধা হয়ে দাঁড়ান। তিনি আমার লোককে গ্রেফতার করে নিয়ে যান। এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত কাগজপত্র নিয়ে আদালতে গেলে আদালত মামলাটি গ্রহণ করে ইউএনও এবং ওসিকে সমন ইস্যু করে। মামলাটি বর্তমানে চলমান আছে।- বলেন ইউনুচ তালুকদার।
এদিকে ইউনুচের আওয়ামী লীগে উড়ে আসা জুড়ে বসাকে মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানও অসন্তুষ্ট বিষয়টি নিয়ে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাতে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে আমরা জানতে চাই। তারা বললেন, তাকে এমপি সাহেব (হুইপ সামশুল হক চৌধুরী) সেক্রেটারি বানিয়েছেন। আমাদের করার কিছু নেই।’
মফিজুর রহমান বলেন, ‘পটিয়া আওয়ামী লীগে শুধু এই একজন নয়, অসংখ্য অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ অবস্থাটা কেটে যাক। আমরা তাদের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যার দলে প্রকৃত আওয়ামী লীগ যারা, তারাই থাকবে। কোনো অনুপ্রবেশকারী থাকুক আমরা চাই না।’
