একজন নায়েকের জন্য করোনার ঝুঁকিতে সিএমপির কয়েকশ’ পুলিশ


শরীফুল রুকন : করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় বিআইটিআইডিতে পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দামপাড়া পুলিশ লাইনের মেস ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বরত পুলিশের একজন নায়েক। তবে সেখানে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেননি তিনি, ঠিকানা দিয়েছিলেন লালখান বাজার এলাকার একটি ভবনের, যেখানে তিনি থাকেন না।

শুধু তাই নয়, নমুনা দেয়ার বিষয়টি ওই পুলিশ সদস্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অথবা সহকর্মী কাউকেই জানাননি। নমুনা দেয়ার পাঁচদিন পর গত ২২ এপ্রিল রাতে তার করোনা পজেটিভ বলে জানায় বিআইটিআইডি। এরপর তার দেয়া ঠিকানা লকডাউনের উদ্যোগ নিয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয় ও পুলিশ জানতে পারে, লালখানবাজারে যে ভবনের থাকার তথ্য পুলিশ সদস্য উল্লেখ করেছেন, সেখানে নয়, একই এলাকার আরেকটি ভবনে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।

এদিকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেয়ার তথ্য গোপনের পাশাপাশি এই পাঁচদিন ধরে মেস ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন করোনায় আক্রান্ত ওই নায়েক। এমনকি কিছু পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি দেখাও করেন তিনি।

পুলিশ সূত্র জানায়, করোনায় আক্রান্ত ওই নায়েকের তত্ত্বাবধানে দৈনিক ৩৫০-৪০০ পুলিশ সদস্যের খাবার তৈরি হয়। মেসে রান্নার দায়িত্বে থাকা বাবুর্চি, বন্টন ম্যানেজার, সহকারী, মেস বয় সবাই করোনা রোগী মেস ম্যানেজারের সংস্পর্শে ছিলেন অন্তত পাঁচদিন। এছাড়া একই সময়ে মেসের বাজারও করেছিলেন ওই নায়েক।

এদিকে করোনায় আক্রান্তের সংস্পর্শে থাকা মেস বয়রা তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যকে খাবার প্যাকেট দিয়ে আসেন প্রতিদিন। ফলে এক নায়েকের জন্য সিএমপির বিপুল সংখ্যক সদস্য এখন করোনার ঝুঁকিতে পড়ে গেলেন।

একজন পুলিশ সদস্য একুশে পত্রিকাকে বলেন, তথ্য গোপন করায় একজন নায়েক অনেকজনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন। করোনা আক্রান্ত অবস্থায় তিনি বাজারে গিয়ে বাজার করেছেন। নিজের বাসায় পরিবারের সংস্পর্শে গিয়েছেন। নানান অফিসে গিয়েছেন, অফিসারদের সংস্পর্শে এসেছেন। এ অবস্থায় দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের সব পুলিশ সদস্যকে পরীক্ষার আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) আবু বকর সিদ্দিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, মেস ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকায় সে প্রায় সময় রান্না তদারকি নিয়ে থাকতো। বেশি পুলিশ সদস্যের সংস্পর্শে তার যাওয়ার কথা না। তবে তার সংস্পর্শে আসা পুলিশ সদস্যদের করোনা পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করোনার উপসর্গ দেখা দিলে সবার উচিত নিজে থেকে কোয়ারেন্টিনে চলে যাওয়া, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে জিইসি কনভেনশনসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা তিনশতাধিক পুলিশ সদস্যের জন্য খাবার যেত দামপাড়ার মেস থেকে। মেস ম্যানেজারের কারণে দামপাড়ায় এখন মহাবিপদ। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ সে কিভাবে করতে পারলো বুঝতে পারছি না।

এর আগে গত ১৩ এপ্রিল প্রথমবারের মত একজন ট্রাফিক কনস্টেবলের করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর তার বাসস্থান দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের ট্রাফিক ব্যারাক লকডাউন করা হয়। এই ব্যারাকে অন্তত ২০০ জন ট্রাফিক সদস্য থাকেন। আক্রান্ত কনস্টেবলের রুমে ১২ জন থাকতেন। তাদের সবাইকে এবং তাকে চিকিৎসা দেওয়া পুলিশ হাসপাতালের তিনজন চিকিৎসক, তিনজন নার্স এবং সাতজন চিকিৎসা সহকারীসহ ২৫ জনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।

এরপর ১৬ এপ্রিল নতুন করে দুই ট্রাফিক সদস্যের করোনা রোগ শনাক্ত হয়। তারা করোনায় আক্রান্ত প্রথমজনের সঙ্গে একই রুমে থাকতেন। ১৯ এপ্রিল দামপাড়া পুলিশ লাইনের ট্রাফিক ব্যারাকের বাসিন্দা আরেকজন কনস্টেবলের দেহে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। এ পুলিশ সদস্য ব্যারাকে আগের তিনজনের কাছাকাছি থাকতেন বলে জানান নগর পুলিশের উপকমিশনার (বিশেষ শাখা) মো. আব্দুল ওয়ারিশ খান।

এরপর ২২ এপ্রিল পুলিশ লাইন্সের মেস ম্যানেজার নায়েকের করোনা ধরা পড়ে। তবে তথ্য গোপনের কারণে সংশ্লিষ্ট সব মহলে বিষয়টি জানাজানি হয় ২৩ এপ্রিল সকালে।

সর্বশেষ আজ শুক্রবার ট্রাফিক পুলিশের একজন এটিএসআইয়ের করোনা শনাক্ত হয়। তিনিও দামপাড়া পুলিশ লাইনের ট্রাফিক ব্যারাকের বাসিন্দা এবং প্রথম আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের কাছাকাছি থাকতেন বলে একুশে পত্রিকাকে জানান অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) আবু বকর সিদ্দিক।