অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে বজ্রপাত, কারণ ও প্রতিকার


ঢাকা: বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক হারে বজ্রপাত বেড়ে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে সারাদেশে বজ্রপাতে ৭৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে এপ্রিল মাসে। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের বেশিরভাগই দুর্ঘটনাকালে মাঠে কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলেন।

আজ সকালে এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম এওয়ারনেস ফোরাম নামক একটি বেসরকারি সংগঠন (এনজিও)।

বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টালসহ টেলিভিশনের স্ক্রল থেকে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি জানায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বিভাগ ওয়ারি হিসেবে বজ্রপাতে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

প্রকৃতির খামখেয়ালির কথা উল্লেখ করে সংগঠনের নির্বাহী প্রধান মোল্লা আব্দুল আলীম সংবাদ সম্মেলনে জানান, সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে শীতের সময় বজ্রপাত ঘটেনা। তবে এবার জানুয়ারির কন কনে শীতের মধ্যেও বজ্রপাতে নিহত হয়েছে তিন জন পুরুষ। ফেব্রুয়ারি মাসে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও মার্চ মাসে ছয় জন এবং এপ্রিল মাসে ৭০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

বিভাগওয়ারী হিসেবে এ বছর প্রথম চারমাসে ঢাকা বিভাগে ১৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১১ জন, ময়মনসিংহে নয় জন, খুলনায় সাত জন, রংপুর ছয় জন এবং রাজশাহী বিভাগে চার জন বজ্রপাতে মারা গেছে। ২০১৯ সালে সারাদেশে বজ্রপাতে নিহত হয়েছে ২৪৬ জন।

এ প্রসঙ্গে ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’ বা পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বজ্রপাতের দুর্যোগ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত আবহাওয়া ও ঋতু বৈচিত্রের ধরণ পরিবর্তন হওয়া, বজ্রনিরোধক উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া- এসবকে দায়ী করেছেন।

এ প্রসঙ্গে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এ, হাসিব চৌধুরী রেডিও তেহরানকে বলেন, বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের নিয়মিত বুলেটিনে কোন এলাকায় কখন বজ্রসহ বৃষ্টিপাত ঘটবে তার একটা পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। সেটা অনুসরন করে এরকম ঝড়-বৃষ্টির সময় মাঠে বা খোলা স্থানে অবস্থান না করে ঝুঁকি কমানো যায়। তাছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহর করে আরো সুনির্দিষ্টভাবে বজ্রমেঘের অবস্থান চিহ্নিত করা এবং আগেই নির্দিষ্ট এলাকার মানুষদের সতর্ক করে দেয়া সম্ভব।

গত বছর (২০১৯) জানুয়ারি মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, এ ঘনবসতিপূর্ণ দেশটিতে বজ্রপাত একটি বড় দূর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিগত তিন দশকের তথ্য পর্যালাচনা করে দেখানো হয়েছে, নব্বইয়ের দশকে যেখানে বজ্রপাতে মৃত্যু ছিল গড়ে প্রতিবছর ৩০ জন সেখানের পরবর্তী দশকে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে বছরে ১১৬ জন। আর বিগত দশকে (২০১০ থেকে ২০১৮) মৃত্যুর হার আরো বৃদ্ধি পেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে গড়ে বছরে ২৪৯ জন।

এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকলাপনা হিসেবে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যাপকহারে তাল গাছ রোপন করা হোক। কারণ অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে বজ্রপাত সরাসরি ভূমিতে আঘাত হানার আগেই উঁচু তালগাছটি একে আটকে দিতে পারে। তবে তাল গাছ লাগানো এবং গাছ উঁচু হওয়া পর্য্ন্ত কয়েক দশক লেগে যাবে। তাছাড়া এ গাছটি সবরকম মাটিতে টিকে থাকতে পারে না। তাই জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে উন্মুক্ত স্থানগুলোতে বজ্রনিরোধক (ফ্রাংকলিন’স লাইটনিং রড) যুক্ত উঁচু টাওয়ার স্থাপন করার পরামর্শ দেয়া হয়।

বাংলাদেশ বজ্রপাতের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের মে মাসে একে একটি দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে সময় বজ্রপাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে সারাদেশের বিদ্যুতের খুঁটিগুলোতে লাইটনিং অ্যারেস্টার লাগানোর এবং হাওর বা খোলা এলাকায় সেল্টার নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম হিসেবে ৩১ লাখ তালগাছ রোপণ করার কথা জানা গেলেও পরিকল্পনার বাকী কার্যক্রমের কোন কোন অগ্রগতি জানা যায়নি।