’মৃত্যু’ এখন শোকের নয়, অপরাধের!

চট্টগ্রাম : আলমগীর হোসেন। বয়স ৬০। থাকেন নগরের গনি বেকারি এলাকায়। অত্যন্ত সজ্জন, সরল, সাদামাটা মানুষ হিসেবে পরিচিতি আছে তার। সুস্থ, সবল সেই মানুষটি শুক্রবার রাতে খেলেন, আড্ডা দিলেন সবার সাথে। শনিবার (৯ মে) ভোরে সেহেরিও খেলেন। নামাজের আগে আচমকা পড়ে গেলেন মেঝেতে। দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো নগরের বেসরকারি ক্লিনিক সিএসসিআর এ।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, তিনি স্ট্রোক করেছেন। সে অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টাও হলো। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার সন্ধ্যায় ইফতার-মুহূর্তে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন আলমগীর হোসেন। সেহেরিতে সুস্থ, ইফতারে মৃত। আহা মৃত্যু!

পরিবারের  সদস্যরা শোকে যখন মুহ্যমান, ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই যখন মৃতের মতো; তখন হাসপাতাল থেকে জানানো হলো আলমগীর হোসেনের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে, দেখতে হবে তার শরীরে করোনার সংক্রমণ আছে কিনা। জ্বর, সর্দি, কাশি- করোনার কোনো উপসর্গই নেই মৃত আলমগীরের। এরপরও করোনা-পরী্ক্ষা করবে সিএসসিআর কর্তৃপক্ষ। করলে করুক, কী সমস্যা তাতে!

কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মাথায় বাজ পড়লো, যখন বলা হলো করোনা রোগীর মতোই তাকে দাফন করতে হবে। পিপিই পরে তিনজন দাফনে নিয়োজিত থাকবেন, আর সর্বোচ্চ ৮-১০ জন অংশ নেবেন জানাজায়। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট পুলিশের কাছে আলমগীরের লাশ হস্তান্তর করা হবে, তারাই করোনায় মৃত ব্যক্তি যেভাবে দাফন করে ঠিক সেই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্টদের দিয়ে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করবেন।

হায় আল্লাহ! সুস্থ সবল মানুষের এ কেমন মৃত্যু? যে মৃত্যুকে ’অপরাধ’ ভাবা হচ্ছে, মৃত্য ব্যক্তিকে অপরাধী করা হচ্ছে- এমন নানা ভাবনা-চিন্তা, ক্ষোভ-কষ্ট সঙ্গী করে আলমগীরের স্বজনরা টেলিফোনে দ্বারস্থ হলেন তাদের পূর্ব পরিচিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীরের।

তিনি জানালেন, শনিবার সকাল থেকে রোগীটার ব্যাপারে তিনি ওয়াকিবহাল। স্ট্রোক করার পর রক্তক্ষরণে তিনি মারা গেছেন। নিয়মানুযায়ী তার নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।যদিও করোনা শনাক্ত হয়নি, তথাপি করোনা রোগীর মতোই দাফন করতে হবে আলমগীরকে। ডা. শাহরিয়ারও বললেন এমন কথা। তবে নানাজনের অনুরোধে পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করে দাফনের জন্য স্বজনদের কাছেই মৃত আলমগীরের লাশ দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলে দেন তিনি।

এরপর লাশ গ্রহণ করতে গিয়ে স্বজনরা রীতিমতো হতবাক। তারা দেখলেন ঘৃণা, ধিক্কার, অবহেলা আর অপরাধীর ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে মৃতদেহে। ডেথ সার্টিফিকেটে সিএসসিআর কর্তৃপক্ষ লিখে দিলো করোনা-আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন আলমগীর। কেন এতবড় অপবাদ-জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরিস্কার জবাব-করোনাকালে যে-ই মারা যাবেন ডেথ সার্টিফিকেট এমনই হবে।

স্ট্রোকে মৃত বাবার ভাগ্যে করোনার ’লিখিত অপবাদ’ এবং এই অপবাদ কাঁধে নিয়ে বাবার নির্মম, নিষ্ঠুর বিদায় কোনোভাবেই মানতে পারছিলেন না সন্তানেরা। তাদের বক্তব্য, এমনিতেই মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে আশপাশের করোনা-সন্দেহে অমানবিক পরিস্থিতি, সেখানে করোনায় মৃত্যুর সার্টিফিকেট নিয়ে তারা কোথায় যাবেন বাবার মৃতদেহ নিয়ে। এগিয়ে আসা দূরের কথা, বিষয়টা জানলে সামাজিক কবরস্থানে লাশটাও দাফন করতে দেবে না প্রতিবেশিরা।

এই পরিস্থিতিতে আবারও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের শরণাপন্ন হন তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন ভূমিকায় হতবাক স্বয়ং স্বাস্থ্য পরিচালকও। তিনি বললেন, করোনা পজিটিভ কি শনাক্ত হয়ে গেছে? কী করে করোনা রোগ বলে ডেথ সার্টিফিকেট দিলো তারা! ফোনটা রেখে দুই মিনিটি পরই তিনি ফিরতি ফোনে জানালেন, আমি তাদের বলে দিয়েছি, করোনা লেখা ডেথ সার্টিফিকেট ছিড়ে ফেলে নতুন একটা সার্টিফিকেট দিতে। এরপরও কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।- বলেন হাসান শাহরিয়ার কবীর।

শেষপর্য়ন্ত স্বাস্থ্য পরিচালকের হস্তক্ষেপে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ লেখা সম্বলিত ডেথ সার্টিফিকেটে আলমগীর হোসেনকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করলেন্ স্বজনরা। হোক করোনা রোগীর মতোই দাফন, তবুও নিজেরা উপস্থিত থেকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতে পেরেছেন, তাতে তৃপ্ত, আনন্দিত স্বজনেরা। এভাবেই তাদের স্বজনহারানোর কষ্ট মিলিয়ে গেলো ’করোনার বদনাম’ ছাড়া দাফনের আনন্দে।

এরপরও কদম মোবারক এতিমখানা মসজিদের কবরস্থানে দাফন করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে মৃতের স্বজনদের। শনিবার রাত থেকে চেষ্টা করে রোববার দুপুর ১২ টায় বহু ভোগান্তির পর লাশ দাফনের অনুমতি দেয় মসজিদ কমিটি।

জানা যায়, এর আগে সিএসসিআর প্রথমে করোনা রোগী মর্মে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার বিষয়টি মসজিদ কমিটি কীভাবে যেন জানতে পারে। এ কারণে তারা মৃত আলমগীরের লাশ কবরস্থ এমনকি গোসলেও অনীহা প্রকাশ করে। তাদের বক্তব্য, করোনায় মারা যাওয়া সত্ত্বেও স্বজনরা স্ট্রোকে মারা গেছে মর্মে সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছে। কাজেই এই লাশ দাফনে তাদের আপত্তি আছে। শেষপর্য়ন্ত লালখানবাজার থেকে মোর্দা গোসলকারী টিম এনে মৃত আলমগীরের গোসল ও দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেন মৃতের স্বজনেরা।

প্রিয় পাঠক, রোববার (১০ মে) রাতে নমুনা পরীক্ষায় মৃত আলমগীর হোসেনের নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। অথচ সিএসসিআর এর অমানবিক ভূমিকায় কী নির্মম, নিষ্ঠুরভাবেই না বিদায় নিতে হলো সজ্জন মানুষ আলমগীরকে। করোনাকালের কোনো মৃত্যুই যেন আজ শোকের নয়, বরং পাপ এবং অপরাধের। আলগীরের মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থিতি তাই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে রোববার রাতে একাধিকবার চেষ্টা করেও সিএসসিআর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। হাসপাতালটির পিএবিএক্স নাম্বারে ফোনটি ঢুকলেও কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি কিংবা রিসেপশনে পাস হয় না।

এ ব্যাপারে ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। যেখানেই মানবিক বোধের সঙ্কট তৈরি হবে, মানবতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে হবে সেখানে আমি ছুটে যাবো। পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।