শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

ছেলের কিল-ঘুষি-লাথির বিচার চেয়ে পুলিশের দুয়ারে বৃদ্ধা

প্রকাশিতঃ সোমবার, জুন ১, ২০২০, ৩:৫০ অপরাহ্ণ


এ. কে. আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) : গুনী বড়ুয়া (৭০)। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার কলাউজান ইউনিয়নের পূর্ব কলাউজান জয়নগরের বড়ুয়া পাড়ার বাসিন্দা তিনি। দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জননী গুনী। স্বামী বিপুতি বড়ুয়া আজ থেকে প্রায় ২০ বছর পূর্বে রোগ-শোকে মারা যান। দুই মেয়ে মায়া রাণী ও শিল্পী এবং একমাত্র ছেলে দিলীপকে অনেক কষ্টে আদর-যত্নে বড় করেন মা গুনী বড়ুয়া। বড় মেয়ে মায়া রাণী বড়ুয়াকে ৩০ বছর আগে বিয়ে দেন সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের বাকর আলী বিল পাড়ার এক ছেলের সাথে।

ছোট মেয়ে শিল্পী বড়ুয়া ২০-২১ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরীর একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকুরিকালীন সময়ে প্রেমের সম্পর্কের সুবাধে রাঙ্গুনিয়ার তপন বড়ুয়া নামের এক ছেলেকে পরিবারের অগোচরে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাদের কোলজোড়ে আসে এক ছেলে সন্তান। তার নাম রাখা হয় জীবন বড়ুয়া। বিয়ের ২ বছরের মাথায় তাদের সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিরূপায় শিল্পী শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে তার সন্তানকে নিয়ে মা গুনী বড়ুয়ার কাছেই চলে আসেন। এমন সময় মারা যান গুনীর স্বামী বিপুতি বড়ুয়া।

গুনীর বড়ই আশা ছিল অনেক আদর-যত্নে মানুষ করা তাঁর একমাত্র ছেলে দিলীপের আশ্রয়েই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করবেন। কিন্তু সেই আদরের ছেলে দিলীপের কাছে ঠাঁই হলো না তার গর্ভধারণী অভাগা মা গুনীর। ছেলে দিলীপও ২৬ বছর আগে বিয়ে করার ৪/৫ বছরের মাথায় মা-বাবাকে ছেড়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদা হয়ে বসবাস করতে থাকলেন। একদিকে একমাত্র ছেলের বরণ-পোষণ থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে স্বামীহারা গুনী বড়ই অসহায় হয়ে পড়লেন। কী করবেন কোনো দিশা পাচ্ছিলেন না। তারপরও মেয়ে শিল্পীকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার নিরন্তর চেষ্টা গুনীর। শুরু করলেন মেয়ে শিল্পীকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমের পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রির কাজ। সময় পেলে ঝি-য়ের কাজ করেন মানুষের বাড়ীতে। এভাবেই চলতে থাকে মেয়ে শিল্পী ও নাতী জীবনকে নিয়ে গুনীর সংসার। নাতি জীবন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলে চোখ পড়ে যায় দিলীপ ও তার স্ত্রী জুতিকা বড়ুয়ার।

স্বামী-স্ত্রী মিলে ফন্দি আঁটেন কিভাবে মা গুনী ও বোন শিল্পীকে তাড়িয়ে তাদের বসবাসরত বসতঘরটি দখল করা যায়। এর অংশ হিসেবে মা গুনী ও বোন শিল্পী পাহাড়ে কাঠ সংগ্রহে কিংবা ঝি’য়ের কাজে গেলে বসতঘরের দরজার সামনে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখে দিলীপের স্ত্রী জুতিকা। কাজ শেষে ফিরে এসে প্রতিবাদ করা মাত্রই শুরু হয় মা-বোনের ওপর ঝগড়া-বিবাদ ও নির্যাতন। এ নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে অনেক নালিশ-সালিশ দরবার হলে কিছুদিন শান্ত থাকে। পরে আবার শুরু হয় এসব নির্যাতন। লক্ষ্য একটাই যেভাবেই হউক মা-বোনকে উচ্ছেদ করে বসতঘরটি দখল চাই।

সর্বশেষ গত ২৬ মে দুপুর ২টার দিকে মা গুনী বড়ুয়ার রান্নাঘরের সামনেই টয়লেট নির্মাণ করতে থাকেন ছেলে দিলীপ, তার স্ত্রী জুতিকা ও দুই নাতি রানা ও তারজেন। এসময় রান্নাঘরের সামনে টয়লেট নির্মাণ করতে নিষেধ করা মাত্রই সত্তোর্ধ মা গুনীকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে মারতে মাটিতে ফেলে দেয় ছেলে দিলীপ, তার স্ত্রী জুতিকা, নাতী রানা ও তারজেন। এমন সময় মায়ের আত্নচিৎকারে ছোট বোন শিল্পী এগিয়ে আসলে তাকেও একইভাবে মারধর করে গলাচেপে ধরে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে আশ-পাশের লোকজন এগিয়ে আসলে তাদেরকে ইট-পাটকেল মেরে ধাওয়া করে। অনেকক্ষণ পরে পাড়ার স্থানীয় কয়েকজন লোক এসে মা-মেয়েকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়।

৩১ মে (রোববার) সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকার কাছে কেঁদে কেঁদে ছেলের এমন নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা গুনী বড়ুয়া। আশপাশের প্রতিবেশিরাও এসব ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ সময় গুনী বড়ুয়া আরো বলেন, এ ঘটনায় তিনি ঘটনার পরদিন রাতে ছেলে দিলীপ বড়ুয়া, তার স্ত্রী জুতিকা বড়ুয়া, নাতি রানা বড়ুয়া ও তারজেন বড়ুয়া ডুনেলকে আসামি করে লোহাগাড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর থানা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছে। অথচ পুলিশ এখনো অভিযুক্তদের আটক করেনি। কিংবা অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ডও করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে দিলীপ বড়ুয়াকে তার বাড়িতে পাওয়া যায়নি।

বৃদ্ধা গুনী বড়ুয়ার প্রতিবেশী স্থানীয় সবুজ বড়ুয়া বলেন, বসতঘর দখলে নেয়ার লোভে গর্ভধারিণী মাকে এভাবে মারধর করে উচ্ছেদ করার হীন মানসিকতা কোনভাবেই কাম্য নয়। দিলীপ ও তার ছেলেরা স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্বার সন্তোষ বড়ুয়ার আশ্রয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমরা এলাকাবাসী এ ঘটনার সুষ্টু বিচার চাই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় কলাউজান ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার জামাল উদ্দিন বলেন, ঘটনার বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। ছেলে দিলীপ কর্তৃক মাকে মারধরের বিষয়টি শনিবার রাতে স্থানীয় এক লোক থেকে শুনেছি। তবে আগে থেকেই মা-ছেলের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ রয়েছে। একবার আমি সালিশ করতেও গিয়েছিলাম তাদের বাড়ীতে। যা শুনলাম এ ঘটনা নিয়ে বড়ুয়া পাড়ায় দুটি গ্রুপ হয়ে গেছে। তারপরও থানা পুলিশের মাধ্যমে এ বিষয়টির সমাধান কামনা করছি।

এ ব্যাপারে লোহাগাড়া থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক আব্দুল হালিম বলেন, আসলে অভিযোগটি ছিল এসআই মাহফুজ স্যারের হাতে। তিনি হোম কোয়ারান্টাইনে থাকাতে আমি গত শুক্রবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। পরিদর্শনে গিয়ে দেখি ঘটনার বিষয়ে মা গুনী বড়ুয়ার পক্ষে কোন লোক সাক্ষী দিচ্ছে না। জানতে পারলাম সেখানকার স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্বার সন্তোষ বড়ুয়ার শেল্টারে থাকে দিলীপ বড়ুয়া। সন্তোষ বড়ুয়া খুব খারাপ লোক। তাই ভয়ে দিলীপের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দিতে রাজী হয়নি। তবে, মা গুনীকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে যে ফেলে দিয়েছে দিলীপরা এটা সঠিক।

জানতে চাইলে লোহাগাড়া থানার ওসি জাকের হোসাইন মাহমুদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। সংশ্লিষ্ট অফিসার হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। তবে তদন্ত সাপেক্ষ দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।