একুশে পত্রিকায় সংবাদের পর ভাল্লুকের কষ্ট লাঘবে আদেশ দিলেন বিচারক


যে আর্তনাদ এতদিন বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল, যে কষ্ট প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের হৃদয়ে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল, সেই নীরব কান্না অবশেষে পৌঁছালো বিচারকের কানে। বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের মিনি চিড়িয়াখানায় খাঁচাবন্দী, ক্ষতবিক্ষত এক মুমূর্ষু ভাল্লুকের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা নিয়ে একুশে পত্রিকায় আজ বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল) সকালে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে বিচার বিভাগে।

বান্দরবানের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ.এস.এম. এমরান প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (Suo Motu) যে আদেশ দিয়েছেন, তা যেন দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর হতাশার মাঝে এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি। যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর গাফিলতির অভিযোগ উঠছিল, যখন অসুস্থ প্রাণীটির দায় নিতে গড়িমসির খবর আসছিল, ঠিক তখনই একজন বিচারকের এই মানবিক ও দ্রুত পদক্ষেপ হাজারো প্রাণীপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়েছে।

সকালে একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত “মেঘলার খাঁচায় ভাল্লুকের নীরব আর্তনাদ: ক্ষত দেখিয়ে বাঁচার করুণ আকুতি” শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছিল এক হৃদয়বিদারক চিত্র। তীব্র গরমে খাঁচায় কাতরাতে থাকা, পেছনের অংশে ভয়াবহ ক্ষত নিয়ে বাঁচার আকুতি জানানো ভাল্লুকটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে বিবেকবান মানুষদের নাড়া দিয়েছিল। প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল “সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ” এবং “এন্টি জু মুভমেন্ট বাংলাদেশ” এর মতো সংগঠনগুলোর উদ্বেগ, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর প্রাণীটির চিকিৎসার বিষয়ে পূর্বের ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির কথা। অনেকেই যখন ভাবছিলেন এই নিরীহ প্রাণীটির ভাগ্যে হয়তো খাঁচার ভেতরে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুই লেখা আছে, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন আদালত।

বান্দরবান আদালত সূত্রে জানা যায়, একুশে পত্রিকার প্রতিবেদনটি প্রথমে বান্দরবানের আরেক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌফিকুল ইসলামের নজরে আসে। ভাল্লুকটির অবর্ণনীয় কষ্টের বিবরণে তিনি ভীষণভাবে মর্মাহত ও ব্যথিত হন। বিবেকের তাড়নায় তিনি কালবিলম্ব না করে বিষয়টি তাঁর সহকর্মী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ.এস.এম. এমরানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যিনি এই ঘটনার বিচারিক এখতিয়ার সম্পন্ন।

এরপর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ.এস.এম. এমরান কেবল বিষয়টি জেনেই থেমে থাকেননি। তিনি সংবিধান, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এবং প্রাণীকল্যাণ আইন, ২০১৯ এর ধারাগুলো উল্লেখ করে একটি বোবা প্রাণের প্রতি ঘটে চলা সম্ভাব্য নিষ্ঠুরতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর আদেশে স্পষ্টতই বোঝা যায়, তিনি ঘটনাটির গভীরতা ও সংবেদনশীলতা পুরোপুরি অনুধাবন করেছেন। তিনি কালবিলম্ব না করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বান্দরবান সদর সার্কেলকে ব্যক্তিগতভাবে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিতকরণ এবং অবহেলার দায় নিরূপণসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। এই দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া প্রমাণ করে, সংবেদনশীলতা কেবল একজন নয়, বরং বিচার বিভাগের মাঝেই প্রবাহিত।

বিচারকের এই স্বতঃপ্রণোদিত আদেশটি শুধুমাত্র একটি রুটিন প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং এটি বিচার বিভাগের সংবেদনশীলতা, সময়োপযোগীতা এবং প্রাণী অধিকার রক্ষায় তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যখন একটি অসহায় প্রাণীর জীবন সংকটাপন্ন, তখন বিচারকদের এই সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, আইন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ নয়, তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য বিচার বিভাগ সর্বদা সজাগ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং প্রাণী অধিকার কর্মীদের মধ্যে বিচারকদের এই পদক্ষেপের পর প্রশংসার ঝড় উঠেছে। এখন সকলের আশা, এই বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে মেঘলার মিনি চিড়িয়াখানার করুণ অবস্থার অবসান ঘটবে, অসুস্থ ভাল্লুকটি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয় পাবে এবং এই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।

সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ.এস.এম. এমরানের এই মানবিক ও সাহসী আদেশ, যা তাঁর সহকর্মীর সংবেদনশীলতায় গতি পেয়েছে, নিঃসন্দেহে বান্দরবানের তথা দেশের প্রাণী কল্যাণের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। একুশে পত্রিকার প্রতিবেদন এবং বিচারকদের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ প্রমাণ করলো, গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগ একসাথে সক্রিয় হলে যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব।