
বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের মিনি চিড়িয়াখানা যেন এক নীরব মৃত্যুপুরী। সম্প্রতি “Save The Nature of Bangladesh” নামক একটি সংগঠনের ফেসবুক পেজে পোস্ট করা ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও নাড়িয়ে দিয়েছে বিবেকবান মানুষের হৃদয়।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি মুমূর্ষু ভাল্লুক খাঁচার ভেতর অসহায়ভাবে কাতরাচ্ছে, তীব্র গরমে শুকিয়ে যাওয়া পানির পাত্রের পাশে তার নিথর দেহ এলিয়ে আছে। দর্শনার্থী দেখলেই যেন শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে ভাঙা শরীরটা টেনে নিয়ে জানায় বাঁচার আকুতি।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া স্থিরচিত্রে ভাল্লুকটির পেছনের অংশের ভয়াবহ ক্ষত এবং তার অসহায় চাহনি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, যা এর অবর্ণনীয় কষ্টের জীবন্ত প্রমাণ। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে প্রাণীটির অবর্ণনীয় কষ্ট আর কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা।
গত ৯ এপ্রিল পোস্ট করা ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে ও মিনি চিড়িয়াখানা নামক নরকে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মুমূর্ষ ভাল্লুকসহ ২৬টি বন্যপ্রাণী…প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণার্ত মুমুর্ষ পঙ্গু ভালুকের আর্তনাদ শুনতে পান না বান্দরবান জেলা প্রশাসক।” এই অভিযোগ যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন্তব্যে।
ভিডিওটি দেখে মৌমিতা জামান নামে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “দয়া করে, এই নিষ্ঠুর খাঁচায় প্রাণীগুলোকে বন্দী রাখা বন্ধ করুন…তারাও আমাদের মতোই ভয়, ব্যথা এবং একাকীত্ব অনুভব করে।” তার মন্তব্যের উত্তরে “Save The Nature of Bangladesh” পেজ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘ পাঁচ বছরের চেষ্টার পর জেলা প্রশাসক অবশেষে প্রাণীগুলোকে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে হস্তান্তরে সম্মত হয়েছেন, যার ফলে তাদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সম্ভব হবে।
কিন্তু এই আশ্বাসবাণী কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে “Anti Zoo Movement Bangladesh” নামক একটি পেজ। তাদের মন্তব্যে উঠে এসেছে এক তিক্ত বাস্তবতা – অসুস্থ ভাল্লুকটির দায় নিতে কেউ রাজি নয়, যখন সুস্থ প্রাণীগুলোকে অন্যত্র সরানোর জন্য ভাগাভাগি চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভাল্লুকটির এই করুণ দশা আজকের নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘পাহাড় সমুদ্র’-এ প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ভাল্লুকটির দেহের পেছনের অংশে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি নড়াচড়ার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। বান্দরবান জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডক্টর জুলহাস আহমেদ তখন জানিয়েছিলেন, প্রাণীটিকে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাস পেরিয়ে গেলেও ভাল্লুকটির অবস্থার উন্নতি তো হয়ইনি, বরং তা আরও অবনতির দিকে। বান্দরবান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক তাহিদুল ইসলাম মাসুম ভিডিওটি দেখে বুধবার মন্তব্য করেছেন, ভাল্লুকটিকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে খাঁচা বানানো হয়েছে এবং বন্য প্রাণী অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে, যা ২-১ দিনের মধ্যে সমাধানের আশা জাগাচ্ছে।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, একটি প্রাণীকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমন নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে দেওয়া হলো কেন? জুবেইর পাশা তাইফ যেমনটা লিখেছেন, “দুর্ভাগ্যবশত এই নিরীহ আত্মারা কথা বলতে পারে না এবং তাদের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না।”
অন্নপূর্ণা রানী রূপা বা জোবায়ের আহমেদ ফাহিমের মতো অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন চিড়িয়াখানার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই। তাদের মতে, এই বন্দিশালাগুলো আসলে একেকটি ‘টর্চার সেল’। প্রাণীদের স্বাধীনতা হরণ করে তাদের কষ্ট দেওয়া কোনো বিনোদন হতে পারে না।
এই মুমূর্ষু ভাল্লুকটির অসহায় আর্তনাদ আর সাধারণ মানুষের আকুতি কি বান্দরবান জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হৃদয়ে পৌঁছাবে? প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আর দীর্ঘসূত্রিতা পেরিয়ে অসহায় প্রাণীটি কি পাবে বাঁচার মতো চিকিৎসা? নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অবহেলার বেড়াজালে আটকে থেকে খাঁচার ভেতরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে এই বন্যপ্রাণ?
সময় এসেছে প্রশাসনের ঘুম ভাঙার এবং এই নিরীহ প্রাণীটির জীবন বাঁচাতে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, আর দেরি করা মানেই একটি জীবনকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।