
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার দিকে তাকালে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা একাধারে করুণ এবং প্রহসনমূলক। আমরা এমন এক রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করেছি, যেখানে ‘মেয়র’ পদবিটি আভিজাত্যে মোড়ানো হলেও ক্ষমতার মানদণ্ডে তা ঠুনকো কাচের মতো ভঙ্গুর। অতিকেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দেশের সিটি করপোরেশনগুলো আজ কার্যত নামমাত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা দশকের পর দশক ধরে নগর সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে গলার স্বর রুদ্ধ করেছেন, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণকুহরে সেই আওয়াজ পৌঁছায়নি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো দূরের কথা, উল্টো আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার বাঁধন দিন দিন আরও শক্ত হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজ বারবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিযচ্ছেন যে, পরিকল্পিত নগর গড়তে হলে ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো—চট্টগ্রামের মেয়র ত্রিশ লাখ মানুষের জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে মফস্বল শহরের একজন পৌর মেয়রের চেয়েও সীমিত। এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক নিদারুণ পরিহাস। বিপুল জনসংখ্যার ভারে নুব্জ এই নগরপিতা বা মেয়রের বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে সামান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতেও তাকিয়ে থাকতে হয় কেন্দ্রীয় সরকার ও আমলাতন্ত্রের বদন্যতার দিকে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া তিনি যেন এক পা-ও ফেলতে পারেন না।
যে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতা নেই, নেই সেবা সংস্থাগুলোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি বিশ্বমানের পরিকল্পিত নগর প্রত্যাশা করা আর মরুভূমিতে মরীচিকা অন্বেষণ করা একই কথা। নাগরিকরা যখন দেখেন তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধি সামান্য নর্দমা পরিষ্কার বা মশা নিধনের জন্য আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে আছেন, তখন হতাশা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিক সেবা প্রাপ্তির আশা করাটা বাস্তবিক অর্থেই আকাশকুসুম কল্পনা।
চট্টগ্রামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় বঞ্চনার এক দীর্ঘ ও করুণ উপাখ্যান। ২০০৩ সালে বেশ ঘটা করে চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ২২ বছরেরও বেশি সময় ঝরে গেলেও, বাস্তবে সেই ঘোষণার কোনো প্রতিফলন নগরবাসী দেখতে পায়নি। চট্টগ্রাম আজ কেবল নামেই বাণিজ্যিক রাজধানী, কার্যত এটি পরিণত হয়েছে নাগরিক দুর্ভোগের এক জীবন্ত কেন্দ্রে।
অথচ প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ এই জনপদ। ভৌগোলিক অবস্থান, খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী এবং প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বন্দরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম হতে পারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক ‘হাব’ বা কেন্দ্র। কেবল বাণিজ্যিক লেনদেনই নয়, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে ঘিরে পর্যটনশিল্পের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ধুঁকছে। নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার অভাব এবং সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় অমিত সম্ভাবনাময় এই শহরটি আজ জরাজীর্ণ দশায় পতিত হয়েছে। একটি শহরকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা দিয়েই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? নাকি এর জন্য প্রয়োজন অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র্য?
নগর ব্যবস্থাপনায় দ্বৈত শাসনের কুফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার ধ্রুপদি উদাহরণ হলো চট্টগ্রাম। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এই সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি নগর সরকার ছাড়া কোনো শহরকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করার অসম্ভবতা নিয়ে কথা বলেছেন এবং সিটি করপোরেশন বনাম চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মধ্যকার টানাপোড়েনকে সামনে এনেছেন।
একটি নগরের খাল সংস্কারের দায়িত্ব যখন সিটি করপোরেশনের হাত থেকে সরিয়ে সিডিএর মতো উন্নয়ন সংস্থার হাতে ন্যস্ত করা হয় এবং সংস্কার শেষে রক্ষণাবেক্ষণের বোঝা পুনরায় সিটি করপোরেশনের কাঁধে চাপানো হয়, তখন কাজের মান ও জবাবদিহিতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? ৬ হাজার ১৪ কোটি টাকার বিশাল অংকের অর্থ ব্যয়ের পরও চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
সিডিএকে সিটি করপোরেশনের সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে, সেটিকে দাঁড় করানো হয়েছে একটি সমান্তরাল বা বিকল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এই প্রাতিষ্ঠানিক রেষারেষিতে অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে, আর এর মাসুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ করদাতা নাগরিকদের।
সমাধান কোথায়?
একটি আধুনিক নগরের প্রাণ হলো তার পরিষেবাগুলোর সুশৃঙ্খল বিন্যাস। কিন্তু আমাদের এখানে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। ওয়াসা রাস্তা খুঁড়ছে তো সিটি করপোরেশন জানে না; আবার সিটি করপোরেশন রাস্তা বানাচ্ছে তো পিডিবি খুঁটি বসাচ্ছে। ওয়াসা, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিদ্যুৎ বিভাগ—নগরীর এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবা সংস্থাগুলোর ওপর সিটি করপোরেশনের কোনো কর্তৃত্ব নেই।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যথার্থই ইঙ্গিত করেছেন যে, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার কোনো আইনি ক্ষমতা মেয়রের হাতে নেই। ফলে যখন বড় কোনো দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা আঘাত হানে, তখন মেয়রদের অসহায়তা ও ক্ষমতাহীনতা প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়। তাঁরা ঘটনাস্থলে যান, সমবেদনা জানান, কিন্তু কার্যকরী কোনো সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নিতে পারেন না কারণ চাবি থাকে অন্য কারও হাতে।
বিশ্বের উন্নত শহরগুলো—তা লন্ডন, নিউইয়র্ক কিংবা টোকিও হোক—সেখানে ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ বা নগর সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্ত সেবা সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনা হয়েছে। সেখানে পুলিশ প্রধান থেকে শুরু করে নগর পরিকল্পনাবিদ, সবাই মেয়রের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারগুলোর মধ্যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার এক আদিম প্রবণতা বা অনীহা সব সময়ই দেখা গেছে। এই অনীহার কারণেই আমাদের নগরগুলো বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।
এছাড়া নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা ও ঢাকাকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে বাংলাদেশ আজ একটি অতিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা—জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনে মানুষকে আজ ঢাকামুখী হতে হয়। এর ফলাফল হলো, ঢাকা আজ প্রায় তিন কোটি মানুষের ভারে ন্যুব্জ এক অসুস্থ নগরী। ঢাকার ওপর এই অসহনীয় চাপ কমাতে হলে চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় বাধ্যবাধকতা। চট্টগ্রাম যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, যদি সেখানে অর্থনৈতিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে ঢাকামুখী জনস্রোত স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য।
আমরা কী প্রত্যাশা করতে পারি?
সামনেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলো এখন তাদের ইশতেহার সাজাতে ব্যস্ত হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, এবার গতানুগতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এসে কাঠামোগত সংস্কারের কথা ভাবতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের অনুধাবন করতে হবে যে, তালি দিয়ে আর নগর ব্যবস্থাপনা চালানো সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামকে যদি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃতপক্ষেই বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তর করতে হয়, তবে বাস্তবসম্মত ও সাহসিকতাপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শহরটাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হলে সিটি করপোরেশন ও মেয়রের ক্ষমতা এবং দায়িত্বের পরিধি বাড়ানো ছাড়া গত্যন্তর নেই।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকল ভেঙে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সবচেয়ে টেকসই সমাধান। নগর সরকার প্রতিষ্ঠা কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি আধুনিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হতে পারে। নীতিনির্ধারকরা কি দেওয়ালের লিখন পড়তে পারছেন?
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।