শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এক জেনারেলের হাতেই যেভাবে রচিত হয়েছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি

জহিরুল ইসলাম (জহির) | প্রকাশিতঃ ১৭ জানুয়ারী ২০২৬ | ৮:৩১ অপরাহ্ন


ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়জন সামরিক অফিসার দেশের জন্য দু-দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লড়াই করার গৌরব অর্জন করেছেন এবং জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক। ১৯৭১ সালের মার্চের সেই ঐতিহাসিক দুর্যোগের সময় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বর বিদ্যুৎস্পর্শের মতো সারা জাতিকে নাড়া দিয়েছিল এবং উজ্জীবিত করেছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানই সর্বপ্রথম ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনস্থ সৈন্যদের নিয়ে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও মেজর জিয়াউর রহমান অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং পরে ‘জেড ফোর্স’-এর প্রধান হিসেবে এক দুঃসাহসী সেনানায়কের স্বতন্ত্র পরিচয় অর্জন করেন জিয়াউর রহমান এবং ‘বীর উত্তম’ খেতাব লাভ করেন। এর আগে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জিয়াউর রহমান ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাব লাভ করেছিলেন।

**বংশপরিচয় ও শৈশবকাল**
দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারতের অভ্যুদয়ের এক দশক আগে, ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। এর প্রায় তিন দশকের বেশি সময় পরে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ, যে দেশের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অকুতোভয় সম্মুখযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমানের নাম। পিতা মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানরা ছিলেন পাঁচ ভাই, কোনো বোন ছিল না তাঁদের। জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল ‘কমল’। তাঁর পিতামহ মৌলভি কামালউদ্দীন মন্ডল ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। তিনি সব সময় শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন এবং সন্তানদের ডাকনামে নয়, পুরো নামে ডাকতেন। বগুড়ার মহিষাবান গ্রামের বাসিন্দা কামালউদ্দীন মণ্ডল পাশের গ্রাম বাগবাড়িতে বিয়ে করেন। অভিজাত বংশে জন্ম নেওয়া, তুলনামূলকভাবে বিত্তবান কামালউদ্দীন সব সময় সাদা পোশাক পরতেন এবং বীজগণিতে তাঁর দখল ছিল অসাধারণ।

জিয়াউর রহমান পিতামহের প্রতি আকর্ষণ বোধ করলেও তাঁরা পরস্পরের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন না। কামালউদ্দীনের সাত ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে জিয়াউর রহমানের পিতা মনসুর রহমান ছিলেন পঞ্চম।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষা জীবন

জিয়াউর রহমানের মাতামহ আবুল কাশেমের জন্ম ছিল ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা জলপাইগুড়ির বিখ্যাত ‘টি ফ্যামিলি’ বা চা পরিবারে। তাঁদের পরিবার সেই অঞ্চলে সর্বপ্রথম চা বাগানের গোড়াপত্তন করায় ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া আবুল কাশেমের পরিবারকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পদচারণা ছিল আবুল কাশেমের পরিবারের। জিয়াউর রহমানের মা জাহানারা খাতুন ওরফে রানী ছিলেন আবুল কাশেমের দ্বিতীয় মেয়ে। জাহানারা খাতুন ছিলেন রেডিও পাকিস্তান করাচি কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীত শিল্পী।

পরিবারের কারো কারো মতে, এ কারণেই সংগীতের প্রতি জিয়াউর রহমানের গভীর ভালোবাসা জন্মায়। জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, আমার নানিও এক সময় গান গাইতেন এবং ভালোই গাইতেন। আমার বড় খালা ও খুকী খালাও বেশ ভালো গান গাইতেন। নানাবাড়িতে গান-বাজনার একটি পরিবেশ সব সময়ই ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করে কলকাতায় আলীপুর টেস্টিং ল্যাবরেটরির চাকরিতে যোগ দেন জিয়াউর রহমানের পিতা মনসুর রহমান। তাঁরা থাকতেন সৈয়দ আমীর আলী অ্যাভিনিউর ভাড়া বাসায়।

মনসুর রহমানের পাঁচ ছেলেরই জন্ম কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের পরপরই মনসুর রহমান চাকরির কারণে পরিবারবর্গ নিয়ে করাচি চলে যান। জিয়াউর রহমানের মা জাহানারা খাতুন ১৯৫০ সালে অল্প বয়সে মারা যান এবং বাবা মনসুর রহমান ১৯৭০ সালে ৬৮ বছর বয়সে হৃদরোগে মারা যান। উভয়কেই করাচির পিইসিএইচ সোসাইটির কবরস্থানে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়।

পিতার মৃত্যুর সময় জিয়াউর রহমান ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুসংবাদ শোনার পর জিয়াউর রহমান একেবারে নির্বাক হয়ে যান, এমনকি কিছুদিন কাঁদতেও পারেননি।

শৈশব থেকে সামরিক জীবন

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে তাঁর মাতা-পিতা তখন আদর করে ‘কমল’ নামে ডাকতেন। জিয়াউর রহমানের ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতায়। তাঁর বাবা মনসুর রহমান তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। কলকাতার হেয়ার স্কুলে শহীদ জিয়াউর রহমান সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে শিশু জিয়াউর রহমান করাচি চলে যান। সেখানে কেটেছে জিয়াউর রহমানের স্কুল ও কলেজ জীবন। করাচির স্কুল-কলেজে অধ্যয়নকালে শহীদ জিয়াউর রহমান একজন ভালো হকি খেলোয়াড় ছিলেন। স্কুলে জিয়াউর রহমান ইংরেজিতে ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন। কৈশোরে নির্মেদ দেহের অধিকারী এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন জিয়াউর রহমান।

করাচির ডি জে কলেজে পড়ার সময় ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমান যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমান কমান্ডো ট্রেনিং লাভ করেন। ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে জিয়াউর রহমান ঢাকার অদূরে জয়দেবপুর সাব-ক্যান্টনম্যান্টে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাচে লিয়নে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগদান করেন।

একই বছর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য জিয়াউর রহমান পশ্চিম জার্মানি যান। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। তাঁর ঘাঁটি ছিল ষোলশহর বাজারে। এখান থেকেই শহীদ জিয়াউর রহমান দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন

১৯৭৫-এর নভেম্বরের উন্মাতাল রাজপথে অভিষেক ঘটে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির। তিনি একাধারে ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, যোদ্ধা এবং সুশৃঙ্খল আইন অনুগত সৈনিক। ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন জিয়াউর রহমান। আচমকা জিয়াউর রহমানের কাঁধে অর্পিত হয় এক বিশৃঙ্খল দেশের শাসনভার। তখন সামরিক বাহিনীতে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। উস্কানি ও চক্রান্তে জর্জরিত সশস্ত্র বাহিনীকে জিয়াউর রহমান কঠোর পদক্ষেপে সুশৃঙ্খল করলেন। দেশে রাজনীতি ছিল না, জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবন ঘটালেন। রাজনীতিকদের জারি করা সামরিক শাসন তুলে দিয়ে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কালজয়ী দর্শন উদ্ভাবন করে জিয়াউর রহমান জাতিকে উপহার দিলেন নতুন পরিচয় ও আদর্শের পতাকা।

সময়ের দাবি মেটাতে জিয়াউর রহমান সৃষ্টি করলেন নতুন রাজনৈতিক দল। ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ নামে এই নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে যে শূন্যতার সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা পূরণে ইতিহাসের দাবি ও দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষায় বিএনপির অভ্যুদয় ঘটে। বিএনপির ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাত কঠিন গণঐক্য, ব্যাপক জনভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদের বিভীষিকা থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই বিএনপি গঠিত হয়েছে।

উন্নয়ন ও নির্বাচনের রাজনীতি

১৯৭৮-এর ৩০ নভেম্বর তৎকালীন সরকার ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবিতে দু’দফায় পিছিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রথম সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং ৩৯টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ (মালেক) প্রধান বিরোধী দল হয়। ১৯৭৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেন, বিএনপির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা। মালয়েশিয়ার ‘বিজনেস টাইমস’ লিখেছিল, অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবনী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

এ সময় নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং স্বনির্ভরতা অর্জন ও উৎপাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে। ১৯৮০ সালেই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে স্থানান্তরিত করা হয়।

১৯৮১ সালের ২৯ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সফরে গেলে ৩০ মে ভোরে সার্কিট হাউজে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তবে নানা পদক্ষেপে ও কর্মকাণ্ডে জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের ইতিহাস হয়ে উঠেছে অভিন্ন। ব্যক্তিগত সততা, উন্নয়ন, ঐক্য এবং সুসম্পর্কের রাজনৈতিক দর্শনের কারণে রাজনীতির ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তন ও আগামীর বাংলাদেশ

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিনটি ইতিহাসে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিল এক মহানায়কের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের দিন হিসেবে। ৬ হাজার ৩শ ১৪ দিনের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার দেশের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনা তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় সাজা প্রদান, মিডিয়া ব্যবহার করে নানারকম গুজব এবং নানারকম মুখরোচক মিথ্যা কল্পকাহিনী বানিয়ে প্রচার করা হয়েছিল দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক তিন বারের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান নিজ মেধা ও মননে আজ বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। ২৫ ডিসেম্বর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের আকাশ যেন অপেক্ষার ভারে নুয়ে পড়েছিল। প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৩৬ ঘণ্টা লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর সপরিবারে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান বিএনপির শীর্ষ নেতাকর্মীরা।

বেগম খালেদা জিয়া: ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর

বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪১ বছর পার করেছেন। পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

শুধুমাত্র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই ছিল বেগম খালেদা জিয়ার অপরাধ। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন দেশ-বিদেশের ডাক্তার-নার্সদের নিরলস পরিশ্রম আর দেশবাসীসহ বিশ্বের অগণিত মানুষের দোয়া সব কিছু বিফলে ফেলে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মহান আল্লাহর ডাকে এই দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে যান বেগম খালেদা জিয়া। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অজস্র সৈনিকের রাজনৈতিক মা এবং এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

বেগম খালেদা জিয়া শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণীই নন, বরং নিজ গুণে ও নেতৃত্বে নিজেকে একজন শক্তিশালী ও শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গণতন্ত্রের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রাম, আপসহীন মনোভাব এবং দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর পর সর্ববৃহৎ জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তাঁর সহধর্মিণী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার। এদেশের জনগণের হৃদয়ে নিজ কর্মগুণে বেঁচে থাকবেন শহীদ জিয়াউর রহমান ও মরহুমা খালেদা জিয়া।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত লগ্ন

আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এদেশের জনগণ গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। মানুষ উন্মুখ হয়ে বসে আছে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য। বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে বিএনপি আজও রাজপথে সক্রিয়। শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও একজন বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলার আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। স্বাধীনতা-উত্তর দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগণ শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর যখন শুধু অনিশ্চয়তা আর হতাশা ছাড়া কিছুই চোখে দেখছিল না, ঠিক তখনই জিয়াউর রহমান জ্বালিয়েছিলেন আশার আলো, আর বাংলাদেশের জনগণ বুকে বেঁধেছিল অনেক বড় স্বপ্ন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে নিজের অক্ষয় স্থান নিশ্চিত করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, সময়োপযোগী গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ—এসব বহুমাত্রিক সাফল্যের কথা সুবিদিত এবং বহুল চর্চিত। শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন মাটি ও মানুষের নেতা। এ দেশের গরিব মেহনতি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ছিল জিয়াউর রহমানের অন্যতম জীবন সাধনা।

শেষ কথা

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তি ও মহান রাষ্ট্রনায়ক। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। জাতীয় ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে একজন পরিত্রাণকারী হিসেবে রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি শতধা বিভক্ত জাতিকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করেছেন। জিয়াউর রহমান দেশপ্রেমে উজ্জ্বল এক অনুভূতির নাম। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’—ছিল জিয়াউর রহমানের বিশ্বাস ও ধ্যান। তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার।

একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শুধু রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে জিয়াউর রহমান তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেননি, স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অবদান রেখে গেছেন। ইতিহাস থেকে কারো অবদান জোর করে মুছে দেয়া যায় না। সাময়িকভাবে আজ জিয়াউর রহমানকে হেয় করা বা তাঁর সোনালি অবদানকে অস্বীকার করার অপতৎপরতা আমরা দেখছি। কিন্তু এ অপপ্রয়াস সফল হয়নি।

জিয়াউর রহমানকে ভুলিয়ে দেয়া বা তাঁর অবদানকে মুছে ফেলার সাধ্য এ দেশে কারো হবে না। জিয়াউর রহমান থাকবেন দেশপ্রেমিক বিবেকবান প্রতিটি মানুষের অন্তরে এক জীবন্ত প্রত্যয় হিসেবে। মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ৯০তম জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।