
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌরসভাসহ পার্শ্ববর্তী ৮-১০টি গ্রামের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম ‘নৌকাঘাট’ খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে। জেলা পরিষদের মালিকানাধীন এই খালটি এক সনা (এক বছর মেয়াদি) ইজারা নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা ও আধাপাকা শতাধিক দোকানপাট। ইজারার শর্ত উপেক্ষা করে খালের জমি সাব-লিজ দেওয়া এবং হাতবদলের মাধ্যমে কোটি টাকার বাণিজ্য করার অভিযোগ উঠেছে। খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা এবং শ্রেণি পরিবর্তনের ফলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ইজারার শর্ত অনুযায়ী জমিতে কোনো পাকা স্থাপনা নির্মাণ, শ্রেণি পরিবর্তন বা সাব-লিজ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইজারা শুধুমাত্র এক বছরের জন্য কার্যকর এবং পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে তাৎক্ষণিকভাবে ইজারা বাতিলের বিধান রয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাইমুড়ী হাইস্কুল রোডের টেস্টি ট্রিটের গলি থেকে আলিয়া মাদ্রাসার পূর্ব পাশ পর্যন্ত খালের বিশাল অংশ এখন কংক্রিটের দখলে। এর মধ্যে সোনাইমুড়ী আলিয়া মাদ্রাসার নামে পাঁচটি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির নামে আরও ৬০টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সোনাইমুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ২০০৪ সালে বিদ্যালয়টি জেলা পরিষদের কাছে খালের ওপর ছাত্রাবাস ও শিক্ষক নিবাস তৈরির জন্য বাঁশ ও কাঠ ব্যবহারের শর্তে জমি বন্দোবস্ত নেয়। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মো. এমদাদুল হক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হাশেমের সুপারিশে ৩১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৬ ফুট প্রস্থের জায়গা বরাদ্দ পায় স্কুলটি।
কিন্তু শিক্ষক নিবাসের পরিবর্তে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে ২৯টি পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এসব দোকান বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে সাব-লিজ দিয়ে এককালীন প্রায় ৫০ লাখ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করেছে। ইউসুফ হেলাল, নুরুন নবী, মারজাহান ইসলামসহ ২৯ জন ভাড়াটিয়া প্রতিটি দোকানের জন্য ১ থেকে ৩ লাখ টাকা অগ্রিম এবং মাসিক ২ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছেন। এমনকি স্কুলের সাব-লিজ নেওয়া দোকানগুলো তৃতীয় পক্ষের কাছে হাতবদল করেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিক উল্লাহ দাবি করেন, ২০০৪ সালে বন্দোবস্ত নেওয়ার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না এবং তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষক বিষয়টি পরিচালনা করেছেন। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না বলে মন্তব্য করেন।
শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তিমালিকানাতেও খালের জমি নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। সোনাইমুড়ী বাজারের সততা মেডিকেল হল থেকে মেডিসিন অ্যান্ড সার্জিক্যাল সেন্টার পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার বর্গফুট খালের ওপর ৬৫টি পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ থেকে বর্গফুট প্রতি মাত্র ১৫ টাকা হারে ইজারা নেওয়া এসব জমি হাতবদল হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায়।
সততা মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী রাকিবুল ইসলাম জানান, তিনি জাকির হোসেনের কাছ থেকে দোকানটি নিয়ে ১০ লাখ টাকা অগ্রিম ও মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছেন। একইভাবে মা লাইব্রেরির সাখাওয়াত হোসেন মিন্টু, ইশরাত মেডিকেল হলের মো. মিজানুর রহমান, মালঞ্চ পুষ্প বিতানের শিবলু আহমেদ এবং মালতী ফুল বিতানের মো. শামীম লাখ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে খালের ওপর ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
শেখ জহির নামের এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি মূল ইজারাদার ফজলুল হকের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকায় দোকানটি কিনেছেন। আরেক ব্যবসায়ী ওমর ফারুক জানান, তার ভাই নিজের অংশের দোকান ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন।
জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার ইমরান হোসেন ২০০৯ সাল থেকে দায়িত্বে থাকলেও অবৈধ স্থাপনার বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরে স্বীকার করেন যে খালের ওপর পাকা স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তবে ইজারা বাতিলের ক্ষমতা তার নেই বলে তিনি দাবি করেন।
নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদ জানান, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সকল ইজারার মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং জেলায় কোথাও ইজারা নবায়ন করা হয়নি। খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে জেলা পরিষদ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে জরিপের সময় খালের শ্রেণি পরিবর্তন করে ‘দোকান’ বা ‘ভিটা’ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করায় আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
এ নিয়ে আদালতে ৩২টি মামলা চলমান রয়েছে এবং সোনাইমুড়ী মৌজার খালের শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন মামলার অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, দখলদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে নৌকাঘাট খাল, আর সোনাইমুড়ীবাসী পড়বে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে।